শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

ঢাকায় নয়া বাসরুট নৈরাজ্য কমবে তো?

ঢাকায় নয়া বাসরুট নৈরাজ্য কমবে তো?

বিজ্ঞাপন
রাজধানী ঢাকার গেন্ডারিয়াবাসীর জন্য ফেসবুকে একটি গ্রুপ আছে। অক্টোবর মাসের শেষ দিকে সেখানে অনেকের প্রশ্ন ছিল, ‘মালঞ্চ বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কি?’ সূত্রাপুর-গুলিস্তান-শাহবাগ-ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর রুটে প্রায় দুই দশক যাত্রীসেবা দেওয়া এই বাস বন্ধ হয়নি। তবে এলাকাবাসীর শঙ্কাই সত্যি হয়ে দেখা দিয়েছে। নভেম্বরের পয়লা দিন থেকে সূত্রাপুর প্রান্তে আর যাচ্ছে না এই বাসগুলো। সেদিন ঢাকায় নগর পরিবহনের রুট পুনর্বিন্যাসের কার্যক্রম ঘটা করে উদ্বোধন করা হয়েছে। ‘এক রুট, এক প্রতিষ্ঠান’ নীতির আওতায় ছয়টি সাধারণ বাসরুট ঘোষণা করা হয়েছে। আরও একটি রুটে চালু হয়েছে চক্রাকার বাসসেবা।
নতুন বিন্যাসে ধূপখোলা-মোহাম্মদপুর রুটের মালঞ্চ বাসের চলাচলের দিক বদল হয়েছে। এখন চলছে ঘাটারচর থেকে ডেমরা এবং ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর রুটে। এতে বিপাকে পড়েছেন সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া ও ফরিদাবাদের যাত্রীরা। কারণ, এত দিন তারা সূত্রাপুরে এসেই বাস ধরতে পারতেন। এখন বাসে যেতে হলে আগে তাদের রিকশা বা অটোতে চড়ে দয়াগঞ্জ পৌঁছাতে হবে। এতে যাতায়াতের খরচ দুই-তিন গুণ বেড়ে যাবে বলে তাদের আশঙ্কা। এ ছাড়া সরকার যখন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোর সংখ্যা কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে, তখন সূত্রাপুর এলাকায় এসব বাহনের চলাচল আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে পুরান ঢাকার মালঞ্চ বাসের নিয়মিত যাত্রীদের অভিযোগ, নগর পরিবহনের রুট পুনর্বিন্যাসে তাদের খরচ ও ভোগান্তি—দুটোই বেড়ে গেছে।
অথচ নতুন রুট সামনে রেখে পরিবহন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত কর্তাব্যক্তিরা বলে আসছেন, বাস রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে নৈরাজ্য কমবে, বাড়বে যাত্রীসেবা। মালঞ্চ বাসের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্রের কথাই বলছেন নগরবাসী। এতে প্রশ্ন উঠতেই পারে, নগর পরিবহনের রুট পুনর্বিন্যাসের আগে যাত্রী পর্যায়ে আদৌ কোনো গবেষণা হয়েছে কি না, নাকি ঘরে বসেই বিন্যাসের কাজটি করা হয়েছে?
নতুন ব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে আজিমপুর, মিরপুর থেকে কেরানীগঞ্জ, ঘাটারচর থেকে ডেমরা, ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর, ঘাটারচর থেকে ধউর এবং টঙ্গী থেকে আজিমপুর—এই ছয়টি সাধারণ রুটে বাস চলবে। পাশাপাশি মিরপুর-১ থেকে কচুক্ষেত, সৈনিক ক্লাব, জাহাঙ্গীর গেট ও আগারগাঁও হয়ে আনসার ক্যাম্প পর্যন্ত একটি চক্রাকার রুট চালু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকার ৩২টি রুটে এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা মহানগরের জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এর পরিধিও। তাই বিভিন্ন সময়ে বাসরুট পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এবারের উদ্যোগ তাই নতুন কিছু নয়। নগর পরিবহন নিয়ে মহাপরিকল্পনাও দেখেছি আমরা। বিশেষত, ২০০৫ সালে প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুমোদন পায়। ওই বছরের ২৮ আগস্ট ২০ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এর পরপরই ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার আগের ১৩৮টি বাস ও মিনিবাসের রুট পুনর্বিন্যাস করে ৪০টি প্রধান রুট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এসব রুটের অধীনে ১৪৯টি উপ-রুটও নির্ধারণ করা হয়। বাসমালিকদের যৌথ ব্যবস্থাপনায় এনে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোই ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু সেই উদ্যোগও টেকসই হয়নি। ২০০৯ সালেই এসটিপির প্রথম পর্যায়ের বাস্তবায়ন নিয়ে হতাশার চিত্র উঠে আসে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পরিবহন বিশেষজ্ঞদের লেখা ও বক্তব্যে। যাত্রী দুর্ভোগ, ভাঙাচোরা বাস, নিয়মহীন চলাচল—এসব তো সড়কের নৈরাজ্যের প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে ছিলই।
এত সবের পরও নতুন উদ্যোগ নিয়ে কতটা আশাবাদী হওয়া যায়? একই রুটে বিভিন্ন কোম্পানির বাসের মধ্যে যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতা, আগে যাওয়ার তাড়াহুড়া, নির্ধারিত জায়গায় না থেমে যেখানে-সেখানে থামা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা—এবার এসব যদি বন্ধ হয়, তবেই কেবল উদ্যোগকে সফল বলা যাবে। যেসব প্রস্তাব রয়েছে, তার মধ্যে বাসের জন্য পৃথক রং ও রুট নম্বর নির্ধারণ, নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে পরিচালনা এবং চালক-শ্রমিকদের চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থার পরিবর্তে বেতনভিত্তিক নিয়োগের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কিছু ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আসতে পারে। তবে কোনো একটি উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন আর একটি কার্যকর গণপরিবহনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এক বিষয় নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন রুটের বাসগুলো নিয়মিত চলবে কি না, যাত্রীরা প্রয়োজনীয় সময়ে বাস পাবেন কি না এবং পুরো ব্যবস্থার তদারকি কতটা কার্যকর হবে।
নতুন রুটের কারণে মালঞ্চ বাস নিয়ে যাত্রী দুর্ভোগ বৃদ্ধির অভিযোগ সামনে আসছে। অতীতে নতুন রুট বিন্যাসে পরিবহনমালিকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ইতিহাসও আছে। এর উদাহরণ ঢাকার পরিবহনসেবার একসময়ের জনপ্রিয় ৬ নম্বর বাস। রুট পুনর্বিন্যাস ও নানা জটিলতায় এই রুটের বাসটি বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় দুই বছর হলো। এতে পরিবহনমালিকেরা যে শুধু আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তা নয়; বাসকর্মীরাও চাকরি হারিয়েছেন। এ ছাড়া একটি পরিচিত বাসসেবা বন্ধ হওয়ার পর তার বিকল্প হিসেবে যাত্রীদের জন্য কী ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা নিয়েও যেন কারও হেলদোল নেই।
বাস রুট রেশনালাইজেশনের উদ্দেশ্য যদি যাত্রীদের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়, তাহলে পুরোনো রুট বাতিল বা পরিবর্তনের আগে যাত্রীদের প্রয়োজন, বিকল্প সংযোগ এবং যাতায়াতের সময় বিবেচনা করা অপরিহার্য। শুধু মানচিত্রে রুট আঁকলেই নগরের পরিবহনব্যবস্থা যাত্রীবান্ধব হয় না।
ঢাকার যানজট কমানো ও নৈরাজ্য থামানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ আন্তজেলা বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়া। এটা সবাই স্বীকার করবেন, গুলিস্তান, মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পুরো ঢাকা শহরের যান চলাচলেই পড়ে। মহাখালী টার্মিনাল প্রায়ই তেজগাঁও, গুলশান ও বনানীর সড়কগুলোকে চাপের মুখে ফেলে। বিষয়টি অজানা নয় সরকারপ্রধানেরও। তাই তো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কয়েক মাস আগে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ঢাকার চারটি বাস টার্মিনাল দ্রুত শহরের বাইরে সরাতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এগুলো এখনো সরেনি। অন্তত গত কয়েক দশক ধরে প্রস্তাবে থাকলেও কোনো সরকারই কাজটি করতে পারেনি। পরিবহন নৈরাজ্যের সঙ্গে যুক্ত স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব যে অনেক পোক্ত, তা এই দীর্ঘসূত্রতাই প্রমাণ করে।
ক্ষমতায় আসার পর প্রায় সাড়ে আট মাসে বিএনপি সরকার নগর পরিবহন নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঢাকা-গাজীপুর বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল করে করিডরটিকে সাধারণ ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজ, ব্যয় বৃদ্ধি ও জনভোগান্তির পর প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। করিডরের বিআরটি স্টেশন ও লেন বিভাজক সরিয়ে সড়কটি সাধারণ যান চলাচলের উপযোগী করা হবে। এ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। এখন অবকাঠামো পরিবর্তন ও অপসারণেও ব্যয় হবে আরও অর্থ। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকল্পটি বাতিলের আগে কী ধরনের কারিগরি ও আর্থিক সমীক্ষা করা হয়েছে? যে অবকাঠামো নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলো, তা পরিবর্তন বা অপসারণের সিদ্ধান্তের পেছনে বিকল্প ব্যবহারের সম্ভাবনা কতটা যাচাই করা হয়েছে? বিআরটি প্রকল্পের অবকাঠামো অপসারণের জন্যও অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। তাহলে ঢাকা-গাজীপুর পথে নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুত বাস চলাচলের যে প্রয়োজন ছিল, তার সমাধান কী হবে? প্রকল্পটি আগের সরকারের নেওয়া বলে সেটি বাতিল করাই কি যথেষ্ট যুক্তি, নাকি নগর ও আঞ্চলিক পরিবহন চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন পরিকল্পনা প্রয়োজন? বিআরটি উদ্যোগ বহাল রেখে ত্রুটিগুলো দূর করার কোনো সুযোগ কি ছিল না? এখানে বলতে চাই, শুধু পরিবহন খাত নয়, নগর-সংশ্লিষ্ট সব পরিকল্পনাই হতে হবে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত কমিটির পরামর্শ ও পরিকল্পনা অনুযায়ী। নগরায়ণে রাজনৈতিক বিবেচনা কখনোই ভালো ফল বয়ে আনে না—সরকার বাহাদুরকে এ কথা মনে রাখতে হবে।
বিজ্ঞাপন

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz