শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

ঘরের মাঠে ধাক্কা খেলেও বিশ্বমঞ্চে দাপট অব্যাহত ট্রাম্পের

ঘরের মাঠে ধাক্কা খেলেও বিশ্বমঞ্চে দাপট অব্যাহত ট্রাম্পের

ছবি সংগৃহীত

বিজ্ঞাপন
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ফলে তাঁর নীতি ও অ্যাজেন্ডা এখন ডেমোক্র্যাটদের কঠোর নজরদারির মুখে পড়বে। তবে ঘরের মাঠে ধাক্কা খেলেও পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ক্ষমতা খুব একটা কমছে না। ফলে মেয়াদের শেষ দুই বছরেও ইরান, ইসরায়েল, ইউক্রেন ও চীন ইস্যুতে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবেন তিনি। খবর রয়টার্সের।

কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চায় ডেমোক্র্যাটরা। কিন্তু মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। ফলে আইনসভায় বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ বাড়লেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত করা কঠিন হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখন বড় প্রশ্ন হলো—নির্বাচনে পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে ট্রাম্প পররাষ্ট্রনীতিতে নমনীয় হবেন, নাকি বিশ্বমঞ্চে বন্ধু ও প্রতিপক্ষ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও কঠোর অবস্থান নেবেন?

ইরান যুদ্ধ নিয়ে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ চাপ

ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘায়িত যুদ্ধ। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে এই যুদ্ধের ভূমিকা ছিল বলে ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুশোচনা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতেই এই হামলা প্রয়োজন ছিল। যদিও ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

আট মাস ধরে চলা সংঘাতের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নির্বাচনে ভোটারদের ক্ষোভেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে।

ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, রিপাবলিকানরা যুদ্ধসংক্রান্ত সাংবিধানিক ক্ষমতা কার্যত ট্রাম্পের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। এর ফলে ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি ইউক্রেন সংকট, নতুন শুল্ক আরোপ, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার এবং লাতিন আমেরিকার উপকূলে সামরিক হামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও তিনি এককভাবে প্রভাব বিস্তার করেছেন।

সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেছেন, নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং ইরান যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে জনগণের বার্তা।

তবে বাস্তবে ট্রাম্পকে থামানো সহজ হবে না। আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ পরিচালক উইলিয়াম ওয়েচসলারের মতে, ডেমোক্র্যাটরা অভ্যন্তরীণ নীতিতে ট্রাম্পের কিছু উদ্যোগ আটকে দিতে পারলেও কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে তাঁর সামরিক ক্ষমতা সীমিত করার সুযোগ খুবই কম।

তদন্ত, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ আটকে দেওয়া এবং বৈদেশিক তহবিলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এসব উদ্যোগে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি অবশ্য জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কাজ চালিয়ে যাবেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে নেওয়া হয় না বলেও দাবি করেন তিনি।

শেষ মেয়াদে বিশ্বমঞ্চে আরও সক্রিয় হতে পারেন ট্রাম্প

নিজ দেশে রাজনৈতিক প্রভাব কমে এলে অনেক প্রেসিডেন্ট তাঁদের মেয়াদের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক বিষয়ে বেশি মনোযোগ দেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটতে পারে।

তবে তাঁর একক সিদ্ধান্তে সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রবণতা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়াতে পারে। এমনকি নতুন সংঘাতের আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে, কিউবার দিকে নজর দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। দেশটির ওপর তেল অবরোধ আরোপের পাশাপাশি ট্রাম্প একাধিকবার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক লরা ব্লুমেনফেল্ডের মতে, রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা বোধ করলে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এককভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগের পথে হাঁটতে পারেন।

ইরান ইস্যুতে তাঁর সামনে মূলত তিনটি পথ রয়েছে—নতুন করে বিমান হামলা, আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের অবসান অথবা বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখা। সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইরানের নেতারা ট্রাম্পের নির্বাচনী পরাজয়কে স্বাগত জানালেও ওয়াশিংটনের বিভিন্ন সূত্রের দাবি, তিনি এখনো নতুন সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তবে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির ইরান বিশেষজ্ঞ সিনা টুসির মতে, সংঘাত আরও বাড়ালে জয়ের কোনো সুস্পষ্ট পথ তৈরি হবে না। বরং অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে, যা নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির অন্যতম কারণ ছিল।

এ ছাড়া নতুন সামরিক অভিযানে জড়ালে ট্রাম্পের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠী ‘মাগা’র মধ্যেও অসন্তোষ বাড়তে পারে। কারণ, তাঁদের অনেকেই ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিদেশি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের ব্যয় ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে এই সংঘাতের ভূমিকা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

ইউক্রেন ও ইসরায়েল নীতিতে চাপ বাড়াবে ডেমোক্র্যাটরা

আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হলে ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম অগ্রাধিকার হবে ইউক্রেনকে মার্কিন সহায়তা পুনরায় চালু করা। রাশিয়ার দীর্ঘদিনের আক্রমণ মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি সহায়তা বন্ধ করলেও ডেমোক্র্যাটরা কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন সহায়তা তহবিল অনুমোদনের চেষ্টা করতে পারেন।

রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েও ট্রাম্প সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তাঁর দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতার অভিযোগ, তিনি ক্রমেই মস্কোর প্রতি নমনীয় অবস্থান নিচ্ছেন।

একই সঙ্গে ইউরোপীয় মিত্র ও কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইবে ডেমোক্র্যাটরা। তবে ট্রাম্পের শুল্ক ও চাপ প্রয়োগের নীতিতে সৃষ্ট কূটনৈতিক দূরত্ব কতটা কমানো সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ইসরায়েল ইস্যুতেও নতুন কংগ্রেসে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অতীতে দেশটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যে দ্বিদলীয় সমর্থন ছিল, তাতে ফাটল তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কয়েকজন রিপাবলিকান নেতাও ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থনের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাটদের অনেকেই প্রগতিশীল অবস্থানের। তাঁরা নির্বাচনী প্রচারে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া এবং ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। নতুন কংগ্রেসে তাঁরা ইসরায়েলের জন্য বার্ষিক সামরিক সহায়তা বন্ধ বা সীমিত করার উদ্যোগ নিতে পারেন।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের ঘনিষ্ঠতা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের দুই প্রধান দলের মধ্যে ইসরায়েল নীতিতে মতপার্থক্য বেড়েছে।

তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা থাকায় ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে দ্রুত বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।

ক্ষমতার শেষ অধ্যায়ে ট্রাম্পের লক্ষ্য বিশ্বমঞ্চ

বিশ্লেষকদের মতে, মেয়াদের শেষ দুই বছরে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি অনেকাংশে নির্ভর করবে ইতিহাসে নিজের অবস্থান কীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তার ওপর। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার তাঁর এই লক্ষ্য পূরণের অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক রস হ্যারিসনের মতে, বিশ্বমঞ্চে নিজের একটি বড় ছাপ রেখে যেতে অত্যন্ত আগ্রহী ট্রাম্প। সেই ছাপ ইতিবাচক হবে, নাকি নেতিবাচক—তা তাঁর কাছে মুখ্য বিষয় নয়।

অর্থাৎ কংগ্রেসে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারালেও পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ক্ষমতা এখনো উল্লেখযোগ্য। ফলে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ বদলালেও বিশ্ব রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব কতটা কমবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

ঠিকানা/এনআই

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz