বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

তাহসিফ সাউরির মৃত্যু ও ময়নাতদন্ত

তাহসিফ সাউরির মৃত্যু ও ময়নাতদন্ত

বিজ্ঞাপন
ময়নাতদন্তের সাথে ময়না পাখির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, কে জানে!
কেউ বলেন ঘন বনের মধ্যে অনেক পাখিই ডাকে। বিভিন্ন স্বরে ডাকে। পাখির ডাক অনুসন্ধান করে মানুষের মতো কথা বলা ময়না পাখির ডাক শনাক্ত করা হয়েছে বলে এই অনুসন্ধান পদ্ধতিকে ময়নাতদন্ত নাম দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ একজন মানুষের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের সাথে ময়নাতদন্তের নামটি জড়িয়ে গেছে।
আরেকটি মত হলো আরবি ‘মু’আইনা’ শব্দ থেকে ময়না শব্দটি এসে থাকতে পারে। মু’আইনা মানে সচক্ষে দেখে দেখে সত্য উদ্্ঘাটন করা। মু’আইনা শব্দের সাথে তদন্ত মিশে ময়নাতদন্ত নাম থিতু হয়েছে। কেউ কেউ এই ব্যাখ্যায় চোখ উল্টাতে পারেন এই যুক্তিতে যে, দুই দেশের দুটি শব্দ মিলে একটি শব্দ হওয়া ঠিক মানানসই নয়। আসলে এই সন্দেহ ধোপে টিকবে না, কারণ দুই দেশের দুই শব্দ মিলে এক শব্দ হওয়ার ঢের উদাহরণ আছে। ইংরেজি ও আরবি মিলে ‘পুল-সিরাত’, ফারসি ও আরবি মিলে ‘শবে বরাত’ ইত্যাদি অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে।
আবার মু’আইনা এবং তদন্ত দুটি শব্দের অর্থও যেহেতু একই, মানে অনুসন্ধান করে রহস্য উদ্্ঘাটন করা, কাজেই এটাও কেমন বেখাপ্পা লাগছে। আসলে বেখাপ্পা লাগার কিছু নেই, কারণ একই অর্থবিশিষ্ট দুই দেশের দুই শব্দ মিলিয়ে কথা বলার রেওয়াজও বাংলায় আছে। মন্ত্রি-মিনিস্টার, ভাই-বেরাদর, ফল-ফ্রুটস—এগুলো উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
ময়নাতদন্তের সাথে আবার শল্য চিকিৎসার কোথাও একটা সংযোগ আছে। শল্য কথাটা এসেছে শলাকা থেকে। শলাকা মানে তীরের শলাকা বা ফলা। প্রাচীনকালে যুদ্ধবিগ্রহে ব্যবহৃত অস্ত্র ছিল তীর, ধনুক আর তলোয়ার। তলোয়ারের আঘাতে সাথে সাথেই মৃত্যু হতো কিন্তু তীরের আঘাত ছিল দুঃসহ। এর আঘাত পাওয়া আহতদের কখনো কখনো দীর্ঘদিন ভুগতে হতো। সেই থেকে এর চিকিৎসাকে শলাকা চিকিৎসা বা শল্য চিকিৎসা বলা হয়ে আসছে। বলা হয়ে থাকে, জুলিয়াস সিজারের প্রথম শল্য চিকিৎসা ও ময়নাতদন্ত হয়েছিল। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার বছরেও শল্য চিকিৎসা ও ময়নাতদন্তের ইতিহাস রয়েছে বলেও জানা যায়।
ময়নাতদন্তের সাথে আরও একটি শব্দের যোগ আছে। তা হলো সুরতহাল রিপোর্ট। শব্দটি সুরত-হাল এভাবে উচ্চারণ করাই সমীচীন। তবে কী কারণে এর উচ্চারণ সুর-তহাল এ থিতু হয়ে আছে কে জানে!
আব ও হাওয়া—দুটি শব্দ মিলে আবহাওয়া একটি একক শব্দে পরিণত হয়েছে। সোজা কথায়, আব মানে জল আর হাওয়া মানে বায়ু। সে অর্থে আবহাওয়া আক্ষরিক অর্থেই জলবায়ু। কিন্তু না। আক্ষরিক অর্থ এক হলেও প্রায়োগিকভাবে আবহাওয়া ও জলবায়ু দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ নিয়ে দাপট দেখিয়ে বেড়াচ্ছে।
যে বিদ্যা যত প্রাচীন, ধরে নেওয়া যায় সে বিদ্যা তত নিটোল, নিখুঁত ও পরিপূর্ণ।
কিন্তু বাংলাদেশে এখনো ময়নাতদন্ত তেমন দাঁত বসাতে পারেনি।
দ্বীপান্বিতা বিশ্বাস নামে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সারা দিন অফিসের কাজ করে বাসায় ফেরার সময় ওপর থেকে একটা ইট পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা গেলেন। এটা এ বছরের গোড়ার দিকের, মানে ১০ জানুয়ারির ঘটনা। তিনি হয়তো প্রতিদিনের মতো তাঁর তিন বছরের কন্যার জন্য খেলনা, চকলেট বা জামাকাপড় নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। মনে মনে শিশুসন্তানের দু’হাত বাড়ানো খলখল করা হাসিমুখ কল্পনা করতে করতেই তিনি বাসার দিকে পা বাড়াচ্ছিলেন। কিন্তু নির্মাণাধীন কোন ভবন থেকে ইট পড়ে তিনি নিহত হলেন, সেটি আজ পর্যন্ত জানা গেল না। হয়তো কোনো দিনই জানা যাবে না। ময়নাতদন্ত চলবে। পক্ষে-বিপক্ষে কথা ও যুক্তি চালাচালি হবে কিন্তু কোন ভবন থেকে ইট পড়ল, সেটি আর জানা যাবে না। সেই ভবনের মালিক বা কন্ট্রাক্টর যদি রাঘব বোয়াল টাইপের হয়, তাহলে তো কথাই নেই।
৪ আগস্টের ঘটনায় কত মব, কত নির্যাতন, কত অরাজকতার ঘটনা ঘটেছে আর তুরাগে কত শত লাশ ভেসেছে, সেসবের কি ময়নাতদন্ত হয়েছে, কে জানে? ইদানীং তাহসিফ সাউরির লাশের ময়নাতদন্ত নিয়ে জল কতদূর গড়ায়, তাও বলা মুশকিল। কোন কেঁচোর লেজ টানলে কোন কেউটে বেরিয়ে আসে, তাও দেখার বিষয়।
সাধারণত নির্বাচনের আগে আগে সব সরকারই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের একটা চেষ্টা চালিয়ে থাকে। কিন্তু কোভিড-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতে বিশ্ব অর্থনীতি দুমড়ে-মুচড়ে পণ্য সরবরাহে চরম বিপর্যয় ঘটে মানুষের নাভিশ্বাস উঠলেও এর ওপর সিন্ডিকেট করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে মানুষকে মড়ার ওপর খাড়ার ঘা দেওয়া সিন্ডিকেটকে শনাক্ত করতে কোনো ময়নাতদন্ত হলো না। অভাজনরা অলিতে-গলিতে বলে বেড়াচ্ছেন, এই সিন্ডিকেটের সাথে ব্যবসায়ী মন্ত্রি-মিনিস্টারদের এক শক্তিশালী জোট জড়িত। তারা কোনো রাখঢাক না করেই এমনকি দশ টাকার আলুও একশ টাকায় উঠিয়ে ছেড়েছেন। এর কোনো ময়নাতদন্তের উদ্যোগ তো চোখে পড়ল না।
এক ঝাঁক মৌমাছি বিন্দু বিন্দু করে দিনরাত পরিশ্রম করে বাসায় মধু জমা করে দুর্দিনের জন্য। অথচ একদিন আচম্বিতে ভাল্লুকের এক থাবায় হাজার হাজার মৌমাছির স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়। ঠিক একই রকমভাবে সাধারণ প্রবাসীরা বিন্দু বিন্দু করে স্বদেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে রিজার্ভ গড়েন আর কোথা থেকে কারা এসে ভাল্লুকের মতো ওভার ইনভয়েস, আন্ডার ইনভয়েস ও হুন্ডির জটিল কূটকৌশলে একেক থাবায় সব রিজার্ভ পাচার করে দেয়। কোনো ময়নাতদন্ত হয় না।
তনু নামের কিশোরী মেয়েটি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় নির্যাতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করল, ময়নাতদন্ত হলো না। সাগর-রুনির খুনের কত বছর কেটে গেল। ময়নাতদন্ত হলো না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণী অধ্যাপক জলির আত্মহত্যার (!) ময়নাতদন্ত হলো না।
হাজারো নারীর অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত হয় না। উল্টো নারীটিই যে আসলে খারাপ চরিত্রের, সেটা প্রতিপন্ন করার চেষ্টাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফল হয়। সমাজে এমন একটা ধারণা জন্মে গেছে, যেনতেনভাবে কাউকে খারাপ চরিত্রের প্রতিপন্ন করতে পারলেই তাকে নির্যাতন বা হত্যা করা আর তেমন অপরাধের মধ্যে পড়ে না।
ময়না পাখির সাথে ময়নাতদন্তের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, এসব নিয়ে আমাদের মতো আদার ব্যাপারীদের অতি উৎসাহের কোনো মূল্য নেই। তার চেয়ে বরং ময়নাতদন্তের বিষয়টি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে বনের মুক্ত ও স্বাধীন ময়না পাখি কোনোভাবে জাপটে ধরে খাঁচায় ঢুকিয়ে ও কৃত্রিম কথাবার্তা শিখিয়ে শখ-আহ্লাদ পূরণ করার দিকে মনোনিবেশ করাই উত্তম।
 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz