বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

নষ্ট রাজনীতির ভ্রষ্ট নায়কেরা

নষ্ট রাজনীতির ভ্রষ্ট নায়কেরা

বিজ্ঞাপন
ইচ্ছা করেই চুপ করে ছিলাম। ইদানীং এত এত জঘন্য বিষয় নিয়ে দেশে তোলপাড় উঠছে—চেয়েছিলাম বিষয়গুলোকে ইগনোর করব, কিন্তু বিবেক বলে একটা ঘুমন্ত সত্ত্বা বারবার করে নাড়া দিচ্ছে, ঘুমাতেও পারছি না ঠিকমতো। কাজেই কাগজ-কলমকে আশ্রয় করেই দিনযাপনের গ্লানি উগরে দেওয়ার এই ক্ষীণ চেষ্টা। মাফ করবেন, যারা আমার এই কাজকে উপেক্ষা করতে চাইছেন, তারা সকলে। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমার যে দায়িত্ব—স্বয়ং স্রষ্টা আমাকে লেখার একটু সুযোগ দিয়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞতা সেই মহান সত্ত্বার প্রতি। দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে আছি কিন্তু তার পরও ‘নাড়ি পোঁতা’ আছে যে মাটিতে, সেই মাটির টানে একেকবার এতটাই অস্থির হয়ে উঠি যে নিজের কাছেই নিজে যেন এক অপরিচিত কেউ একজন। এই প্রবাসে বাস করা আমার এক নিকটাত্মীয় একদিন বলেছিলেন, ‘যে দেশ থেকে চলে এসেছি, সেই দেশের ভালো-মন্দ নিয়ে আমার রাতের ঘুম হারাম করতে আমি রাজি না।’ আমি অবশ্য এতটা সাহস দেখাতে পারছি না, আর পারছি না বলেই অন্য ধরনের এক কষ্টের সাথে সহবাস আমার।

অতি সম্প্রতি বাংলাদেশসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যে পালিত হলো সনাতন ধর্মের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। ওই ধর্মীয় উৎসবের সময় এগিয়ে এলেই বাংলাদেশের সচেতন মানুষের ভেতরে একধরনের উৎকণ্ঠা কাজ করে। কিছু মানুষ আছেন, যারা সময়টাকে টার্গেট করে একটা না একটা কাজের ভেতর দিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতির ওপর কালিমা লেপনের চেষ্টা করে থাকেন। এবার অবশ্য বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলেই সেই রকম নাশকতামূলক কোনো ঘটনার কথা শোনা যায়নি। সম্ভবত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করেছিলেন যারা, তাদের কারণেই এমন নির্বিঘ্নেই উৎসবে শরিক হতে পারলেন সকলে। অনেকে বলে থাকেন, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার অথবা আনন্দটা সবার।’ সম্ভবত এ কারণেই জাত-ধর্মনির্বিশেষে অনেকেই দুর্গাপূজার মতো অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে থাকেন। যেমন এবারও দিয়েছিলেন। এই দুর্গাপূজা যারা পালন করে থাকেন, তাদের মতে, ওই পূজা হচ্ছে অশুভ শক্তির ওপর শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। একসময় এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানটা পালিত হতো সমাজের বড়লোকদের ছত্রচ্ছায়ায়। কিন্তু ৪৭-এর দেশভাগের পরে কথিত জমিদার শ্রেণির প্রতাপ কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষদের ওই প্রথা পালনের ক্ষেত্রে একটা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। যার ফলে আস্তে আস্তে আমাদের উপমহাদেশে দুর্গাপূজা একটা সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়, যাকে এখন অনেকেই বাঙালির জাতীয় উৎসব বলে বিশ্বাস করা শুরু করেছেন।

বাংলাদেশে পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সারা দেশে মোট ৩৩৮৫১টি মণ্ডপ-মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হলো, গত বছরের তুলনায় ১৫০০টিরও বেশি। শুধু ঢাকা মহানগরে ২৫৮টি মন্দিরে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ছোটখাটো ঘটনা ছাড়া সবগুলো মণ্ডপেই নির্বিঘ্নে পূজা সম্পন্ন করেছেন সনাতন ধর্মের অনুসারীরা। তাদের সাথে পূজার আনন্দ উপভোগের উদ্দেশ্য নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস সস্ত্রীক ঢাকার রমনা কালীমন্দিরে গিয়েছিলেন। সেখানে মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস মন্দিরের ভেতরের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে এতটাই আপ্লুত হয়ে উঠেছিলেন যে তাকে বলতে শোনা গেল, ‘আল্লাহর অশেষ রহমতে এবার সর্বকালের সেরা পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।’ রাজনীতিবিদেরা যখন যেটা বলেন, তার পেছনে সব সময় একটা উদ্দেশ্য কাজ করে। আফরোজা আব্বাসের এই বলা কথাগুলোর পেছনেও বৃহৎ একটা ভোটব্যাংকের মনোতুষ্টির বিষয় জড়িয়ে আছে। তবে ‘পূজার সাথে আল্লাহর রহমত’ কথাটা নিয়ে সচেতন একটা গোষ্ঠীর কিছুটা আপত্তি উঠলেও তেমন কোনো বড় মাত্রার আপত্তির কথা শোনা যায়নি। এ ছাড়া মেহের আফরোজ শাওনের মতো মেয়েমানুষেরা, যারা সব সময় একটা বিতর্কের জন্ম দিয়ে লাইমলাইটে থাকার চেষ্টা করেন, সেই শাওনের পূজামণ্ডপে উপস্থিত হয়ে সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে শরীর দেখিয়ে যখন উদ্দাম নৃত্য করে বলেন, ‘ধর্ম যার যার উৎসব আমাদের সবার’, তখন একটু আপত্তি আমাদের থাকতেই পারে। কারণ ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের জন্য মূর্তিপূজাকে ‘শিরক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়—এই স্বীকারোক্তির সাথে মূর্তিপূজা চূড়ান্ত মাত্রার সাংঘর্ষিক একটা বিষয়। এই বিষয়টাকে ইসলাম ধর্ম কখনোই অনুমোদন দেয় না, বরং ‘শিরক’কে একটি কবিরা গোনাহ হিসেবে চিহ্নিত করে তাওহিদের পরিপন্থী এই উৎসবে ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাই বলে একজন মুসলমানের জন্য অন্য ধর্মের অনুসারীদের ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে বাধা প্রদানেরও কোনো অনুমতি দেয় না ইসলাম।

আল্লাহর নবী (সা.) মক্কায় অবস্থানকালে যখন বিধর্মীদের প্রবল বাধার মুখে পড়েছিলেন, তখন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রেরিত মহাপুরুষকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন ‘লাকুম দি নুকুম ওয়ালিয়াদিন’। পবিত্র কোরআনের সুরা আল কাফিরুনের সর্বশেষ আয়াত এটি, যার অর্থ হচ্ছে স্বয়ং আল্লাহ তাঁর নবীকে বলছেন, আপনি বলুন, ‘তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম, আর আমার জন্য আমার।’ তাই কোনোভাবেই অন্যের ধর্মীয় চেতনাকে আমার বলে মানতে পারি না আমি। যদিও দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত মহামান্য রাষ্ট্রপতি যখন বলেন, ‘সমগ্র পৃথিবীর অন্যায়-অনিয়ম দূর করার জন্য মা দেবীর আবির্ভাব, তখন তার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। দুর্ভাগ্য মানুষের, শুধু তিনিই একমাত্র ব্যক্তি নন, বরং তার দেখিয়ে দেওয়া পথ ধরে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আরও কয়েকজন রাজনীতিবিদ, যেমন তার মধ্যে রুহুল কবির রিজভী, ড. আব্দুল মঈন খান, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এবং কিশোরগঞ্জের রাজনীতিবিদ ফজলুর রহমান, তারা এমন সব কথা উচ্চারণ করেছেন, যা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে চূড়ান্ত মাত্রার অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার দাবি রাখে। বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভাগ্য, শুধু এক বিশেষ কারণে এসব কথা যেসব রাজনীতিবিদ তোষামোদের আদলে উগরে দেওয়ার সাহস দেখাতে পারলেন, তারা ভুলে গেলেন, নব্বই ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশের রাজনীতির শীর্ষ অবস্থানে অধিষ্ঠিত থেকে আর যা-ই হোক এমন মন্তব্য করার ধৃষ্টতা তারা দেখাতে পারেন না। আর তারা যখন এই সব তোষামোদ-জাতীয় কথাবার্তা দিয়ে নিজেদেরকে এক প্রশ্নবোধক সময়ের মুখে ফেলে দিলেন, ঠিক সেই সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশে মুসলিম নিধনের মহোৎসব চলচিল। ওই দুর্গাপূজার সময়ে গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর আসাম অঞ্চলের নগাঁও, হোজাই এবং গোলাঘাট জেলা থেকে ১২ শতাধিক মুসলিম পরিবারকে গৃহহীন করে উচ্ছেদ করা হয়েছে শুধু ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে রেখে। ওই সময় ওই অঞ্চলসমূহের ১০টিরও বেশি মসজিদ ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনিতে ৪৭-এর ভারত বিভক্তির পর থেকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক মেরুকরণের শিকারে পরিণত হয়ে দশকের পর দশক ধরে ভারতে মুসলিম নির্যাতনের কাহিনি ইতিহাসের বিষয়বস্তুতে পরিণত হলেও বিজেপি-শাসিত পুরো সময়কাল ধরে অবৈধ দখলদারিত্বের অজুহাত খাড়া করে মুসলমানদের ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং মসজিদ-মাদ্রাসা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা এতটাই বেশিভাবে সংঘটিত হয়েছে যে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘জেনোসাইড ওয়াচ’ এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা এই নিয়ে টুঁ শব্দ করার সাহস দেখাতে পারেননি। এই অবস্থায় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের নষ্ট রাজনীতির ভ্রষ্ট নায়কেরা যখন বলেন, ‘দুর্গাপূজা শুধু হিন্দুদের নয়, এটা সমগ্র বাঙালির উৎসব, কিংবা মা দুর্গা স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমে আসে আমাদের মধ্যকার অন্যায়, দুঃশাসন দূর করার জন্য’, তখন আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রই, এসব রাজনীতিবিদ আর কতটা নিচে নামতে পারে নিজেকে সেটা দেখার জন্য।

অবশ্য সবকিছুর পেছনে কিছু কার্যকারণ থাকে, এমনি এমনি কিছু ঘটে না। মূর্খেরা বলে থাকেন, ‘যা রটে তার পেছনে কিছু ঘটেও থাকে।’ এই যে আমাদের জাতীয় রাজনীতির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ ভারত তোষণের ইচ্ছা নিয়ে মূর্তিপূজাকে জায়েজ করতে চেয়েছিলেন, তার পেছনে উদ্দেশ্য অবশ্য শেষ পর্যন্ত জানা গেল। আমাদের সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকা ব্যক্তিটি যতই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বলে মুখে ফেনা তুলতে তুলতে রাজনীতির ময়দানকে গরম করতে চেয়েছিলেন, সেই ইচ্ছাকে জলাঞ্জলি দিতে গিয়ে রাজনীতিকেই নামিয়ে আনলেন তিনি স্বার্থের দুয়ারে উৎসর্গ করে। শেষ পর্যন্ত জানা গেল, ‘তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পকে নিয়ে চীনের সাথে চুক্তি হয়েছিল সেটা শুধু ভারতকে খুশি করার উদ্দেশ্য বাতিলের খাতায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ভারতের দাবি অনুযায়ী মাতারবাড়ী বন্দর হয়ে সেভেন সিস্টার্স করিডর বানানোর জন্য জাপানের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হবে। আর খরচের জোগান মেটাবে জনগণের ট্যাক্সের টাকায়।’
আসলে আমাদের নষ্ট রাজনীতির ভ্রষ্ট নায়কেরা কোনো কথাই অহেতুক বলেন না। তার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণও থাকে। আর সে জন্যই মূর্তিপূজাকে সম্বল করে ভারত তোষণের একটা খেলায় গুটি চালান দিতে দিতে তারা পেরেশান হয়ে কী বলতে গিয়ে কী বললেন, ধর্ম নিয়ে এতটা খোলামেলা বলা ঠিক হলো কি না, সেই কথাটাই ভুলে গিয়েছিলেন বেমালুম। আসলে দলীয় স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ধর্ম নিয়ে এতটা বালখিল্য আচরণ না দেখালেই পারতেন তারা। মহামতী টলস্টয় বলেছিলেন, ‘আমাকে তোমার ধর্মের কথা বলো না, তোমার কর্মের মধ্যে তোমার ধর্মকে আমাকে দেখতে দাও।’
আমরাও তাই শেষ পর্যন্ত দেখতে চাই ধর্মের নামে দলীয় কর্ম কতটা দলভারী হয়ে জাতিকে ঠেলে দেয় অন্ধকার কোনো গহ্বরে।
 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz