দৃশ্যত অগ্রাহ্য-তাচ্ছিল্য করলেও, নানা অভিযোগ রটলে-রটালেও জুলাই-আগস্ট বিপ্লবী ছাত্রদের গড়তে যাওয়া দল নিয়ে উদ্বিগ্ন মূলধারাসহ সহযাত্রী আশপাশের রাজনীতিকেরা। ছাত্ররা নতুন রাজনৈতিক দলই নয়, একটি ছাত্রসংগঠনও রাখবে। এর দিকে তীক্ষè নজর রাজনীতিকদের। আবার তাদের প্রতি প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের আশীর্বাদ নিয়েও রাখঢাক নেই। তা একেবারে প্রকাশ্যে।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলন নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তখন কোনো প্রশ্ন ছিল না। ছাত্ররা বিজয়ী হতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ-সংশয় ছিল। কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর ফ্যাসিস্ট পতনের আন্দোলন অতীতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। গুলির সামনে দাঁড়ানোই নয়, অকাতরে প্রাণ দেওয়ার দৃষ্টান্ত তারা ছাত্রদের মতো দেখাতে পারেনি। যার জেরে অবিশ্বাস্য এবং মিরাকল সাফল্য ছাত্রদের। এখন তাদের নতুন সংগঠনের ভবিষ্যৎ নিয়েও সন্দেহ। সঙ্গে বিরোধিতা-সমালোচনা-মশকরাও। ছাত্রদের সেই সময়ের ক্রেজ ও জনসমর্থন এখন নেই বলে মূল্যায়ন রাজনীতিকদের। একসময় তাদের সক্ষমতা নিয়ে যে পরিমাপ ছিল তখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের।
দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে পরীক্ষায় অনেকের অকৃতকার্যতার মাঝে ছাত্রদের ওই সাফল্যের পেছনে রাজনীতির বাইরের সুপার পাওয়ার ছাড়াও যোগ হয়েছিল কিছু বিদেশি শক্তি। যার অনেক কিছু এখনো রাজনীতিকদের অজানা। তাদের জেনারেশন গ্যাপ এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটে যাওয়া আমূল পরিবর্তনের সঙ্গে ধাতস্থ হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের অবদানের কথা ড. ইউনূস নিয়মিত কেবল স্বীকারই করছেন না, তাদেরকে একটি দল করার পরামর্শও রয়েছে তার। এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, বড়রা (রাজনৈতিক দলগুলো) চব্বিশের রক্তের অঙ্গীকার রাখবে না। সেই অঙ্গীকার ছাত্রদেরই ধরে রাখতে হবে। নতুন দল করতে হবে। আর সেই দলটি হতে যাচ্ছে মধ্যপন্থার। না ডান, না বাম। তবে প্রচণ্ড ভারতবিরোধী। ভারত যা চাইবে তার বিপরীতটা করার মানসিকতা। কারও লেজুড়বৃত্তি না করে স্বতন্ত্র-স্বাধীন থাকবে বলে অঙ্গীকার তাদের।
এ অভিযাত্রায় পুরোনো টিকিটের আর ভ্যালু থাকছে না। নতুন দল করতে যাওয়া নেতৃত্ব ফ্যাসিস্ট হটানোয় অভিজ্ঞ। তবে কখনো জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেনি, ক্ষমতায় যায়নি। এরই মধ্যে তাদের নিয়ে সমালোচনামুখর রাজনীতিকেরা। এ ছাড়া যে নতুন দল হতে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে তিন-চার বিভক্তির কথা গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারিত। কিন্তু ছাত্ররা এর কোনো জবাব দেয় না। বিভক্তি অস্বীকার করে না। স্বীকারও করে না। কথার অনেক মারপ্যাঁচ তাদের মধ্যে, যা তাদের ম্যান্টর প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের মধ্যেও। সাদামাটা ভাষায় রাজনীতিবিদদের বলেছেন, আপনারা যা কিছু বলবেন বা লিখিত দেবেন, সব ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে। সংস্কার বাধ্যতামূলক নয় মন্তব্য করে বলেছেন, কেউ সংস্কার না চাইলেও চার্টারে তা লিখে সাইন করতে হবে। জনগণ তা দেখবে এবং বিচার করবে। ড. ইউনূসের এ ভাষার মাঝে কেউ কেউ জিয়াউর রহমানের ছাপ দেখছেন। জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘ও রিষষ সধশব ঢ়ড়ষরঃরপং ফরভভরপঁষঃ.’ (আমি রাজনীতিকে কঠিন করে ফেলব)। করেছেনও তা-ই। ড্রইংরুমে বসে আয়েশি রাজনীতির যবনিকা ঘটিয়ে ফেলেছিলেন প্রায়। ড. ইউনূসের বক্তব্যের মাঝেও আগামী দিনের ডিফিকাল্ট রাজনীতির বার্তা লুকানো, যা অনেকে এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না।
এদিকে শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া বিধ্বস্ত প্রশাসনের ওপর গো-স্লোতে নিয়ন্ত্রণ আনছেন ড. ইউনূস। সংস্কার এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা অপরিহার্য। যার সূত্রপাত হয়েছে জেলা প্রশাসক সম্মেলনের মাধ্যমে। এর আগে তার সেকেন্ড ইনিংস শুরু হয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন এবং এ কশিনের সভাপতি হিসেবে ২৬-২৭টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে।
ছাত্ররা এ ক্ষেত্রে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের উদ্ধৃতি টানছে। তিনি বলেছিলেন, ‘যখন দেখবে ভারতীয়রা আমার প্রশংসা করছে, বুঝবে আমি দেশের ক্ষতি করছি। যখন দেখবে ভারতীয়রা আমার নিন্দা করছে, বুঝে নিয়ো আমি দেশের জন্য সঠিক কাজটিই করছি।’ একই মানসিকতা ড. ইউনূসেরও। তিনিসহ তার সরকারের ভারত-জুজু এরই মধ্যে শেষ প্রান্তরে। ট্রাম্প-মোদি বৈঠকের চব্বিশ ঘণ্টা না পেরোতেই দ্বিতীয় দফায় ভারতীয় অভিবাসীদের সামরিক বিমানে হাতকড়া ও শিকলে পা বেঁধে ফেরত পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রও সেই জুজু আরও কাটিয়ে দিয়েছে। ভারতের এখন অপেক্ষা কবে সরবেন ইউনূস? তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ধারেকাছেও নয় মোদির গ্রহণযোগ্যতা। চব্বিশের বিপ্লব ও ইউনূসের গ্রহণযোগ্যতা ভারতকে কাবু করে দিয়েছে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও। তাই বাংলাদেশে দ্রুত রাজনৈতিক সরকার প্রত্যাশা ভারতের। তবে সেটা আওয়ামী লীগ নয়। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিলেও বাংলাদেশের মানুষের আওয়ামী বিদ্বেষের কারণে ভারত এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চাচ্ছে না। ড. ইউনূস নির্বাচন দিয়ে সরে গেলে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক, তখন অনেক কিছু করার থাকবে বলে অপেক্ষমাণ ভারত।