মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :
• বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী • তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা কেন? • কনি আইল্যান্ডে ‘কস্ট অব লিভিং ক্ল্যাসিক’ ফুটবল টুর্নামেন্ট • নিউইয়র্ক সিটির ৩ হাজার গাড়িতে থাকবে গতি নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি • স্ন্যাপ ও মেডিকেইড সুবিধা ধরে রাখতে নিউইয়র্ক সিটির নতুন ওয়েবসাইট • ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরু হলেও ইউক্রেনে সামরিক অভিযান থামবে না : রাশিয়া • জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকে নতুন এমডি • যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের আহ্বান জাতিসংঘ মহাসচিবের • তীব্র সমালোচনার মুখে ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলো পুলিশ সদর দপ্তর • টেলিটকের ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

খুচরা দরে জীবন

খুচরা দরে জীবন

বিজ্ঞাপন
এই বিংশ শতাব্দীতে মহান সাম্রাজ্য আমেরিকার এক প্রসিদ্ধ সিটি নিউইয়র্কের কুইন্সে প্রত্যুষে বসেছে যেন মানুষ বিক্রির জমজমাট হাট। ঠিক মধ্যযুগের দাসবাজারের মতো। সারিবদ্ধ সুস্থ, সুঠাম দেহের পুরুষেরা বসে আছে গরুর হাটের পশুর মতো অপেক্ষায়। ক্রেতারা এসে দেখে-শুনে পছন্দ করবে-তারপর একজন-দুজনকে তুলে নেবে পিকআপ ভ্যানে।
 
সাজিদও তাদেরই একজন। এক দিনের জন্য বেঁচে থাকা। এক দিনের জন্য আয়ের সংস্থান।
আমেরিকায় সদ্য আগত সাজিদের এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। সে বাংলাদেশ থেকে জমি-বাড়ি বিক্রি করে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে সুখ-স্বপ্নের আশায়। অথচ এই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজেকেই প্রতিদিনের খুচরা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে নগদ টাকায়।
হাল চাষ করার জন্য যেমন বাংলাদেশের মানুষ হাট থেকে গরু কেনে, আমেরিকায় তেমনি মানুষ কিনে খুচরা দরে এক দিনের কাজের জন্য সস্তা শ্রমিক।
 
সাজিদের এই মুহূর্তে নিজেকে মনে হচ্ছে-সে একজন হাটের গরু। সারিবাঁধা গুটি কয়েক মানুষের সঙ্গে সেও হাঁটু গেড়ে বসে আছে। সামনেই মালিক ব্যক্তিদের পিকআপ ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। বিভিন্ন জন এসেছে বিভিন্ন এরিয়া থেকে। কেউ ছোট কনস্ট্রাকশনের কন্ট্রাক্টর, কেউ হোম রেনোভেশন ক্রু, কেউ ল্যান্ডস্কেপিং কোম্পানি, কেউ ক্লিন-আপ কোম্পানি, কেউ মুভিং কোম্পানি, এখান থেকে শ্রমিক বাছাই করে নিয়ে যাবে যার যা কাজ করানোর জন্য। দিন শেষে খুচরো মজুরি দিয়ে বিদায় করবে। এক দিনের জন্য খুচরা দরে নিজেকে বিক্রি করার জন্য এখানে সকলেই প্রস্তুত।
নিত্যদিনই এই বেচা-কেনার হাট চলে এই এরিয়াটায়। যতই ভোরের আলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে, ততই ভিড় ক্রমশ বাড়তেই থাকে। হঠাৎ সাজিদের নজর পড়ে-পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে একজন নারী। ভারি সুন্দর। গোলাপি টি-শার্টের সঙ্গে কালো প্যান্ট। যে কেউ একবার তাকিয়ে দ্বিতীয়বার চোখ ফেলতে বাধ্য। কিন্তু এই মেয়ে এই দলে কেন? সে-ও কি জবলেস? ভোরের আবছা আলোয় ধবধব করছে মেয়েটির গায়ের রং।
 
এখনো আঁধার ঘোচেনি, তখনো ফোটেনি পুরোপুরি ভোর। সামনে খোলা আকাশে হালকা ধূসর আলো। রাস্তার ধারে পুরোনো এক ডেলির সামনে জড়ো হয়েছে তারা। কারও হাতে কফির কাগজের কাপ, কারও কাঁধে পুরোনো ব্যাগ। সবাই অপেক্ষা করছে-আজকের দিনের কাজের জন্য। তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ধবধবে মেয়েটি।
 
একটা সাদা ভ্যান এসে থামে। জানালা নামিয়ে একজন লোক দ্রুত চোখ বুলিয়ে দেখে সবাইকে।
-হু ক্যান ডু ক্লিনিং?
কয়েকজন হাত তোলে। নারীটিও ধীরে হাত তোলে।
লোকটি প্রথমে সাজিদের দিকে তাকায়। তারপর একটু দ্বিধা করে নারীটির দিকে তাকায়।
-ইউ ওয়ার্ক বিফোর?
নারীটি ভাঙা ইংরেজিতে বলে, ইয়েস, ম্যানি টাইম।
তার কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু অপমান ছিল না। কারণ জীবন হয়তো তাকে অনেক আগেই শিখিয়ে দিয়েছে-শ্রম লজ্জার নয়।
সাজিদের ভেতরে প্রচণ্ড ধুকধুকানি শুরু হয়। সে মধ্যরাত থেকে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে, অথচ মেয়েটি খানিক আগে এসেই কাজটা বাগিয়ে নিল? এই মুহূর্তে ধবধবে সাদা সুশ্রী মেয়েটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে কুশ্রী নারী মনে হয়। যেন কোত্থেকে এক ডাইনি এসে ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে সাজিদের আজকের আয়-রোজগারের যাবতীয় অর্থ।
 
কিন্তু নাহ্!
ভ্যানের মালিক লোকটির কণ্ঠ চিরে এবার বের হয়ে আসে এক গভীর আশাপ্রদ বাণী। লোকটি মেয়েটিকে ইঙ্গিত করে বলে, লেটস বোথ গো। ইউ ক্যান ব্রিং ইউর ফ্রেন্ড।
মেয়েটি সাজিদকে ঘেঁষে এমনভাবে দাঁড়িয়েছিল, ফ্রেন্ড বলবে না তো কী বলবে?
প্রত্যুত্তরে মেয়েটি কী যেন বলতে গিয়েও থেমে গেল। হয়তো কিছু বেফাঁস বলে ফেললে শেষে কাজটাই খোয়া যায়, সেই আতঙ্কেই হয়তো শান্তভাবে ভ্যানে ঢুকে পড়ে।
সাজিদও মেয়েটিকে অনুসরণ করে।
 
মেয়েটি ভ্যানের ভেতরে উঠতে উঠতে মোবাইল বের করে কাকে যেন ছোট্ট মেসেজ পাঠাচ্ছে। হয়তো সংসারের বিশাল দায়ভার তার কাঁধের ওপর। আজকের আর্থিক সংস্থানটা তার কাছে এক বড় প্রাপ্তি।
নিউইয়র্ক তখন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। উঁচু বিল্ডিংগুলোর কাচে সূর্যের আলো পড়ছে। অথচ এই শহরের আরেকটি মুখ ছুটে চলেছে নীরবে-দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের মুখ। তাদের চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
 
প্রতিদিন ভোরে নিজের জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার যে যুদ্ধ তারা করে, এই ভোরের শ্রমবাজারে প্রতিদিন সবার ভাগ্যে কাজ জোটে না। কেউ কন্ট্রাক্টরের চোখে পড়ে, কেউ পড়ে না। কেউ শক্ত-সমর্থ বলে আগে ডাকা হয়, কেউ ভাষা না জানার কারণে পিছিয়ে থাকে। আর অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও কাজ না পেয়ে ফিরে যায়। তবু পরদিন আবার তারা আসে। কারণ তাদের জীবনে ‘আজ কাজ নেই’ মানে শুধু হতাশা নয়-ভাড়া, খাবার, সন্তানের ওষুধ, দেশে পাঠানোর টাকা-সবকিছুর অনিশ্চয়তা।
 
এইসব খুচরা দরের শ্রমিকরা হয়তো সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ক্লান্ত শরীরে রান্না করেন, পিতা-মাতা, সন্তানের দেখাশোনা করেন। তারপর রাতেই পরদিনের কাপড় গুছিয়ে রাখেন। ভোরে আবার বের হবেন এই আশায়, ‘হয়তো কাল আমাকে ডাকবে।’
ভ্যানে ওঠার পরপরই তাদের পরিচয়পর্ব নেওয়া হয় বেশ কঠিনভাবেই। বর্তমান ঠিকানাসহ আদি অঞ্চলেরও। কোন দেশ থেকে তাদের আগমন। সঙ্গে অরিজিনাল আইডি কার্ড, পাসপোর্ট। শর্ত থাকে, কাজ শেষে ফেরত দেওয়া হবে।
 
মেয়েটির নাম এনা। সে ভেনিজুয়েলা থেকে মা-বাবার সঙ্গে এসেছে ছয় মাস আগে। বেশ কিছুক্ষণ ড্রাইভ করে তাদের দুজনকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হয়, সে এক বিশাল সাম্রাজ্য যেন। লং আইল্যান্ড এরিয়ায়। ছোটখাটো রাজপ্রাসাদ। যেন আধুনিক সময়ের কোনো ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হয়-নীরব কোনো রাজপ্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে আকাশের নিচে মাথা উঁচু করে।
বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দু’পাশে সারি সারি বিদেশি ফুলের বাগান, মাঝখানে মার্বেলের ফোয়ারা, যার পানিতে বিকেলের আলো রুপোলি মাছের মতো কাঁপছিল। বাড়ির দেয়ালজুড়ে নরম সোনালি আলো, যেন প্রতিটি ইট আলাদা করে সাজানো হয়েছে সৌন্দর্যের পূজায়। মেঝেতে এমন স্বচ্ছ কাচের মতো পালিশ-সাজিদের মনে হয়, সে বুঝি মাটির ওপর নয়, আলোর ওপর হাঁটছে। ছাদের বিশাল ঝাড়বাতিগুলো নক্ষত্রের ঝাঁকের মতো ঝুলে আছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই, অথচ নিস্তব্ধতারও যেন একটা দামি গন্ধ আছে। এটি কোনো সরকারি ভবন নয়, নয় পর্যটকদের জন্য তৈরি কোনো দৃষ্টিনন্দন প্রদর্শনী। এখানে টিকিট কেটে কেউ সৌন্দর্য দেখতে আসে না। এটি নিছকই এক ধনাঢ্য মানুষের শখের বাড়ি, যেখানে অর্থ শুধু প্রয়োজন মেটায়নি, বিলাসিতাকেও শিল্পে পরিণত করেছে।
 
সাজিদ আর এনাকে পুরো বাড়ি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বলা হলো-সবকিছু ঝকঝকে পরিষ্কার রাখতে হবে। সাজিদ অবাক হয়ে চারদিকে তাকায়। এত আলো, এত পরিচ্ছন্নতা, এত নিখুঁত সৌন্দর্যের মধ্যে ময়লাটা কোথায়-সে বুঝতেই পারে না। কিন্তু সে এখন খুচরা দরের কর্মী। তার ভাবনারও দাম খুচরা। তাই সৌন্দর্যের রহস্য নিয়ে আর মাথা না ঘামিয়ে সে কাজে মন দেয়। কারণ সন্ধ্যার আগেই এই বিশাল প্রাসাদের প্রতিটি কোণ তাকে চকচকে করে তুলতে হবে।
 
বাড়িটির ভেতরে ঢুকলেই মনে হয়-এটি মানুষের বাসস্থান নয়, বরং অর্থ আর সৌন্দর্যের গোপন কোনো জাদুঘর। প্রতিটি কক্ষ যেন আলাদা আলাদা গল্পে সাজানো। কোথাও ধবধবে সাদা সোফা, যার ওপর বসতে গেলেও ভয় হয়; কোথাও দেয়ালজুড়ে বিশাল সব চিত্রকর্ম, যেন নীরবে তাকিয়ে আছে আগন্তুকদের দিকে। ড্রয়িংরুমের একপাশে কাচঘেরা বুকশেলফ। সারি সারি বিদেশি বই। কিন্তু সাজিদের মনে হয়-এই বইগুলো কেউ পড়ে না, শুধু সৌন্দর্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রান্নাঘরটিও যেন পাঁচতারকা হোটেলের মতো। স্টিলের প্রতিটি জিনিসে নিজের মুখ দেখা যায়।
ফ্রিজ খুললেই ঠান্ডা আলো বেরিয়ে আসে-ভেতরে সাজানো দামি ফল, নানা রঙের পানীয়, অচেনা নামের খাবার। অথচ এত কিছুর মাঝেও মানুষের ব্যবহারের উষ্ণতা নেই। বাড়ির পেছনে নীল পানির সুইমিংপুল। পানির ওপর বিকেলের আলো পড়ে কাঁপছিল। চারপাশে ছোট ছোট বাতি, যেন সন্ধ্যা নামলেই মাটিতে তারার মেলা বসবে। দূরে কৃত্রিম ঝরনা থেকে টুপটাপ শব্দ আসছে। সেই শব্দে সাজিদের গ্রামের বর্ষার কথা মনে পড়ে যায়।
 
কিন্তু এই সৌন্দর্যের মাঝেও তার বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা জমতে থাকে। এত বড় বাড়ি, এত আলো, এত দামি আসবাব-তবু কোথাও মানুষের গায়ের গন্ধ নেই, রান্না হওয়া ভাতের গন্ধ নেই, নেই একসঙ্গে বসে হাসাহাসির শব্দ।
সাজিদ বুঝতে পারে-ধনীরা শুধু বাড়ি বড় করে না, তারা নিঃসঙ্গতাকেও অনেক বড় করে তোলে।
এনা একসময় ইংরেজিতে ফিসফিস করে বলে, ‘এই বাড়িতে মানুষ কয়জন থাকে?’
সাজিদ চারদিকে তাকিয়ে উত্তর খুঁজে পায় না। এত বড় সাম্রাজ্যে মানুষের উপস্থিতির চেয়ে আসবাবের উপস্থিতিই বেশি মনে হয় তার কাছে।
 
সাজিদ আর এনা দুজনে কাজ ভাগ করে নেয়। ডুপ্লেক্স বাড়ির ওপরতলার রুমগুলো এনার দায়িত্বে, আর সিঁড়িসহ পুরো নিচতলা লনসহ সাজিদের দায়িত্বে।
তড়িৎগতিতে সাজিদ কাজ করতে থাকে। কারণ তাদের হাতে সময় বেঁধে দেওয়া আছে। সন্ধ্যার আগেই পুরো বাড়ি চকচকে করতে হবে। যেন এই অপার সৌন্দর্যের ভেতর এক ফোঁটা ধুলোর দাগও না থাকে।
 
কিন্তু ঝামেলাটা বাধায় এনা। মাঝদুপুরে সাজিদের কাজ শেষ হয়ে গেলেও এনার কোনো খবর নেই। অবশেষে সাজিদ উঁকি দেয় ওপরতলার রুমে। কিন্তু সাজিদ অবস্থাটা দেখে বিস্ময়ে তলিয়ে যায়।
ঝাড়া-মোছার টাওয়েল হাতে এনা মেঝেতে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় সাজিদ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে আলগোছে তাকে ঠেলা দেয়।
 
‘হাই! আর ইউ ওকে?’
এনা ধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর মিনতিপূর্ণ স্বরে বলতে থাকে, ‘আই ডিডনট সিøপ লাস্ট নাইট। মাই মাদার ইজ আ ক্যান্সার পেশেন্ট। শি হ্যাজ সিরিয়াস পেইন। শি নিডস প্রোপার থেরাপি। ইট উইল কস্ট অ্যাবাউট ফাইভ থাউজ্যান্ড ডলারস। শি হ্যাজ নো ইন্স্যুরেন্স বিকজ অব ইমিগ্রেশন ইস্যুজ। আই ডোন্ট হ্যাভ লিগ্যাল পেপারস আইদার, উই আর স্টিল ওয়েটিং ফর দেম। দ্যাটস হোয়াই আই হ্যাভ টু ওয়ার্ক ভেরি হার্ড ফর দিস, সো আই অ্যাম অলওয়েজ টায়ার্ড।’
এনার কথা শুনে সাজিদের হঠাৎ মেয়েটার প্রতি অদ্ভুত এক মায়া জাগে। তার মায়ের ক্যান্সার। প্রচণ্ড ব্যথা। ইন্স্যুরেন্সের জন্য সঠিকভাবে চিকিৎসা করাতে পারছে না। এনা প্রচুর পরিশ্রম করে, তাই সব সময় টায়ার্ড থাকে। কী অবলীলায় স্বীকার করে নিল এনা।
 
সাজিদকে আপন ভেবেই হয়তো ভেতরের কথাগুলো বলে দিল। এই মুহূর্তে সাজিদেরও তাকে বড় আপন মানুষ মনে হলো। বড় কাছের মানুষ। যার সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়া যায়।
খানিকক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবে সাজিদ। তারপর এক কাণ্ড করে বসে। সে এনাকে আবার দেয়ালে হেলান দিয়ে বসিয়ে দেয়।
 
-ওকে, ইউ টেক সাম রেস্ট। আই কান্ট হেল্প ইউ উইথ মানি, বাট আই ক্যান হেল্প উইথ ইউর ওয়ার্ক।
কথা শেষ করে সাজিদ নিজেই ঝাড়ু, মপ আর ক্লিনিং সাপ্লাইস হাতে তুলে নেয়। তারপর দ্রুত এনার বাকি সব ক্লিনিং ওয়ার্ক শেষ করে ফেলে।
দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকা এনা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে। এই শহরে সবাই নিজের দুঃখ নিয়ে ব্যস্ত। সেখানে এক অচেনা মানুষ তার কষ্টটুকু ভাগ করে নিল।
সাজিদ সব কাজ শেষ করে স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায় নিজের কাজে। এরই মধ্যে এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে।
 
শর্ট প্যান্ট পরা মালিক লোকটি হঠাৎ সাজিদকে এসে ইঙ্গিত করে তাকে অনুসরণ করতে। সাজিদ তাকে অনুসরণ করে যেখানে থামে, চোখের সামনে দৃশ্য দেখে তার বিস্ময়ের সীমা থাকে না।
এনাকেও ইতিমধ্যে আনা হয়েছে। কর্মহীন মেয়েটি চুপচাপ চেয়ারে বসে আছে। প্রথমে সাজিদের বুক ধক করে কেঁপে ওঠে। মেয়েটি কোনো চুরিটুরি করেনি তো যে এখন বিচার বসবে। সঙ্গে সাজিদেরও বিচার হবে। কারণ শুরুতেই মালিক লোকটি সন্দেহ করেছিল মেয়েটির সাথে সাজিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।
 
কিন্তু সাজিদকে ইঙ্গিত করে বলা হয় এনার পাশে বসতে। আর সারিবদ্ধ চেয়ারের বেষ্টনীতে ডাইনিংয়ে সোনালি ডিশে প্রমকপ্রদ খাবার।
সাজিদ হকচকিয়ে যায়। ব্যাপারটা বুঝতে পারে না। সোনালি ডিশের খাবারের পাশে সোনালি প্লেট সাজিদ আর এনার সামনে টেনে দেয় স্বয়ং মালিক। পাশের সোনালি কলের বেসিনের দিকে ইঙ্গিত করে হাত ধোয়ার জন্য। তারপর বলে, ‘এনজয় ইউর মিল।’
সাজিদ হতভম্ব।
 
হঠাৎ এনা একটা ডিশের ঢাকনা খুলতেই গরুর মাংস ভুনার গন্ধ সাজিদের নাকে ছড়িয়ে পড়ে। আর এক নিঃশ্বাসে দম টানে সাজিদ।
-আহা! কত দিন এই গন্ধ উপভোগ করেনি। জিভে জল এসে যায় ক্রমে তার। ভীষণ রকমের চমকে ওঠে একরকম অভিভূত হয়ে যায় সাজিদ। তাহলে এটা কি কোনো বাঙালি পরিবার? এরপর সে উভ্রান্তের মতো একে একে ডিশগুলো ওপেন করতে থাকে।
 
সাজিদ একটা একটা ডিশ ওপেন করে আর একবার খাবারের দিকে আর পরক্ষণেই সঙ্গে দাঁড়ানো মালিকের দিকে তাকায়। বুঝতে বাকি থাকে না। মুচকি মুচকি হাসছে মালিক।
এ এক বাঙালি পরিবার। জিভের সামনে লোভনীয় খাবার, ম্যাক্সিমাম বাংলাদেশি ডিশ। গরম গরম পোলাও, গরুর মাংস, খাসির মাংসের রেজালা। ঘিয়ে ভাজা রোস্ট। মাটন বিরিয়ানি। দুধ সেমাই। নানা রকম ডেজার্ট। নানা রকম ফল।
গতদিন এ বাসায় জাঁকজমকে কোরবানি ঈদের পার্টি সম্পন্ন হয়েছে। মালিক লোকটা নির্দ্বিধায় অকপটে স্বীকার করেছে। আর এইগুলো অবশিষ্ট রয়ে গেছে। সে জন্যই হয়তো আজ সাজিদের ভাগ্য প্রসন্ন হলো।
 
আহা-কত দিন এমন পেট পুরে খায়নি। জ্যাকসন হাইটসে এক প্লেট মাটন বিরিয়ানি ষোলো-সতেরো ডলার।
সাজিদ কোনো একদিন সব সংকোচ ঝেড়ে ফেলে খুব শখ করে চাপা গলায় চেয়েছিলÑহাফ দেওয়া যায় না। -না, মাটন বিরিয়ানি হাফ হয় না। আপনি চিকেন নিতে পারেন।
সাজিদের মুখ ম্লান হয়ে গিয়েছিল।
আজ তার সামনে ধোঁয়া-ওঠা গরুর মাংস, খাসির মাংস। কোনটা রেখে কোনটা খাবে? কিন্তু প্লেটে গরুর মাংসের এক টুকরো তুলে নিতে গেলে পরক্ষণেই মনে হয়, এই যে মধ্যদুপুর পর্যন্ত কাজ করল, বাকি কাজ শেষ করতে সারাটা দিন পার হবে। পেমেন্ট দেবে তো? নাকি বেঁচে যাওয়া উচ্ছিষ্ট খাবার খাইয়েই বিদায় করবে?
সাজিদ এ-ও শুনেছে, এভাবে ভোরবেলা শ্রমিক বাছাই করে নিয়ে গিয়ে সারা দিন কাজ করিয়ে টাকা না দিয়েই বিদায় করে দেয় অনেকে। তখন বিক্ষুব্ধ শ্রমিককে সরকারি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দ্বারস্থ হতে হয়।
 
সাজিদ জানে সবকিছু। এখানে বিভিন্ন সংস্থা আছে, যেমন নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব ল’ শ্রমিকের বেতন, ওভারটাইম ও কাজের শর্ত নিয়ে প্রধান সংস্থা, নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব লেবার অফিস, নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস, যেখানে বড় ধরনের প্রতারণা ও শ্রমিক শোষণের বিরুদ্ধে মামলা ও তদন্ত করে। এনওয়াইসি কম্পট্রোলার অফিসে, যেখানে শহরের ভেতরের ওয়েজ বেতন চুরি ও শ্রম অধিকার হরণের অভিযোগ দায়ের করা যায়।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব লেবার ওয়েজ অ্যান্ড আওয়ার ডিভিশন ফেডারেল পর্যায়ে শ্রম আইন প্রয়োগের জন্য সাজিদের বেলায় তা হবে না তো? অনেক শ্রমিকের লিগ্যাল স্ট্যাটাস থাকে না। অনেকে জানেও না নিজের অধিকার সম্পর্কে। কেবল সারা দিন শ্রম বিকিয়ে কেউ কেউ নীরব আর্তনাদে ঘরে ফিরে আসে। কোনো প্রতিবাদ করতে পারে না।
 
মহা চিন্তায় পড়ে সাজিদ। গত দুদিন মধ্যরাতে বাসা থেকে বের হয়ে এই এরিয়ায় মধ্যদুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরও কাজ জোটেনি তার। আজ কি তাহলে পেটে ভাতে কাজ?
আজ ছয় মাস ধরে তার বন্ধুর রুমে ফ্লোর শেয়ারিং করে যাপিত জীবন তার। আজকে অন্তত একশটি ডলার যদি বন্ধুর হাতে তুলে দিতে না পারে, তাহলে এই আশ্রয়টুকুও হারাতে হতে পারে তার।
 
কী করবে? খাবে নাকি না খেয়েই উঠে পড়বে। পেটে ভাতে খাওয়ায়ে পেমেন্ট না পাওয়ার ফন্দি আঁটবে? ভেতরটা মিইয়ে আসে তার।
এনা গপাগপ খাচ্ছে নির্বিঘ্নে। মালিক লোকটি তখন অন্যত্র সরে গেছে। সে চাপা কণ্ঠে এনাকে জিজ্ঞেস করে, ‘হি উইল পে, রাইট?’
-অব কোর্স, ইট ইউর ফিল অ্যান্ড ডোন্ট ওয়ারি।
কথাটা যে স্বয়ং মালিকের কানে পৌঁছে যাবে কল্পনাও করতে পারেনি সাজিদ। হঠাৎ পেছনে পিঠে কারও স্পর্শে চমকে পেছনে তাকায় সাজিদ।
 
মালিক স্বয়ং বলল, ‘ডোন্ট ওয়ারি মাই বয়। তোমাদের শুধু পেমেন্ট কেন, বোনাসও দেওয়া হবে।’
তারপর স্বগতোক্তির মতো বলতে থাকে মালিক লোকটি, ‘আমিও একদিন তোমাদের মতোই ছিলাম। যখন প্রথম আমেরিকায় এসেছিলাম, ভোরবেলায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতামÑএকটা কাজের আশায়। আজ যেখানে তুমি দাঁড়িয়ে আছ, একদিন আমি ঠিক সেখানেই ছিলাম। এভাবেই জীবন শুরু করতে হয়। এখানে প্রতিটা সিঁড়ি একে একে টপকাতে হয়-ধাপে ধাপে, ঘাম আর ধৈর্যের ভেতর দিয়ে আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টা করতে হয়। লোভ, দুর্নীতি বা কাউকে ঠকিয়ে বড় হওয়া যায় না। টিকে থাকে সেই মানুষ, যে নিজের পরিশ্রমে নিজের পথ তৈরি করে। দেখো, ইতিহাসও তা-ই বলে। প্রেসিডেন্ট জিমি কাটার ছিলেন কৃষক, জমিতে কাজ করতেন। সেখান থেকেই তিনি পৌঁছান হোয়াইট হাউসে। আব্রাহাম লিংকন বেড়ে উঠেছিলেন এক সাধারণ কাঠের ঘরে, নিজের চেষ্টায় হয়েছেন বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম মহান নেতা। বারাক ওবামা শুরু করেছিলেন খুব সাধারণ জীবন থেকে, আর শেষ করেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষের একজন হয়ে। এই দেশ এমনই-এখানে শুরুটা ছোট হতে পারে, কিন্তু পথটা যদি সৎ আর ধৈর্যের হয়, তাহলে শেষটা বিশাল হতে পারে। আমার শুরুটাও একদিন তোমাদের মতো ছিল।’
 
তারপর সম্মুখে দেয়ালে লাগানো কাচঘেরা একটা দৃশ্যপটের দিকে ইঙ্গিত করে বলে, ‘দেখো, এই যে আমার অ্যাপ্রন। তিরিশ বছর আগের। এটা পরে আমি রাতদিন শ্রমিকের কাজ করেছি। তাই এটা এমনভাবে চোখের সামনে রেখেছি, আমার পরবর্তী প্রজন্ম যেন দেখে বুঝতে পারে সাফল্যকে কীভাবে অর্জন করতে হয়। আমার ছেলে-মেয়েরা রোজ সকলে ঘুম থেকে উঠেই এই দৃশ্য দেখে নিজের ভেতরে নিজেরা যেন সজাগ হয়।’
 
এরই মধ্যে ভদ্রলোকটি এক অপ্রত্যাশিত কাণ্ড করে বসলেন। টেবিলের ড্রয়ার খুলে তিনি দুটি প্যাকেট এনে সাজিদ ও এনার সামনে রাখলেন। বললেন, ‘আজ এটা তোমাদের ভাগ্য।’
ঘরে মুহূর্তের জন্য নেমে এল নিস্তব্ধতা। সাজিদ বিস্মিত চোখে প্যাকেট দুটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অস্ফুটে বলে উঠল, ‘আমাদের ভাগ্য মানে?’
ভদ্রলোকের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
-এখানে পাঁচ হাজার ডলার আছে। এই কোরবানি ঈদ উপলক্ষে কিছু অর্থ হাদিয়া হিসেবে আলাদা করে রেখেছিলাম। আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তার ভেতরে যাদের হক রয়েছে, তাদের কাছে সেই আমানত পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি মাত্র। তিনি একবার সাজিদের দিকে, একবার এনার দিকে তাকালেন।
 
-তোমাদের দুজনকে এখানে শুধু কাজের জন্য ডাকা হয়নি। আমি মানুষের মুখ পড়তে শিখেছি। তোমাদের চোখে সংগ্রাম দেখেছি, ক্লান্তি দেখেছি, দায়িত্বের ভার দেখেছি। তাই মনে হয়েছে, এই অর্থের ওপর তোমাদেরও অধিকার আছে।
কণ্ঠে একধরনের প্রশান্তি নিয়ে তিনি আবার বললেন :
-দান বলে ছোট করো না। এটাকে তোমাদের প্রাপ্য মনে করো। যারা জীবনের দৌড়ে একটু পিছিয়ে পড়ে, তাদের হাত ধরে সামনে এগিয়ে দেওয়াই তো ঈদের প্রকৃত শিক্ষা। এটি তোমাদের জন্য ঈদ উপহার। এটাই কোরবানির মর্মার্থ।
সাজিদ নির্বাক হয়ে রইল। ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পরও এনা যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না ঘটনাটা। টাকার প্যাকেটটা দু’হাতে ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল সে। হঠাৎ মাথা তুলে সাজিদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল :
-হোয়াট ইজ কোরবানি? কোরবানি কী?
সাজিদ মৃদু হেসে বলল :
-কোরবানি ইজ ওয়ান অব দ্য মোস্ট বিউটিফুল স্টোরিজ অব সেক্রিফাইজ অ্যান্ড ফেইথ ইন দ্য মুসলিম রিলিজিয়ান্স।
কোরবানি হলো ত্যাগ ও বিশ্বাসের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর একটি।
এনা কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
সাজিদ ধীরে ধীরে এভাবে ইংরেজিতে বলতে শুরু করল :
-বহু হাজার বছর আগে মরুভূমির দেশে একজন নবী ছিলেন। তাঁর নাম হজরত ইবরাহিম (আ.)। তিনি আল্লাহকে খুব ভালোবাসতেন এবং তাঁর প্রতিটি আদেশ মেনে চলতেন। একদিন আল্লাহ তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য স্বপ্নে নির্দেশ দিলেন, তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটি আল্লাহর পথে উৎসর্গ করতে।
এনা বিস্ময়ে বলে উঠল :
-হিজ মোস্ট প্রেশিয়াস থিংকস?
-ইয়েস!
সাজিদ মাথা নেড়ে বলল :
-তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছিল তাঁর পুত্র, হজরত ইসমাইল (আ.)।
এনার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
-এন্ড হোয়াট হ্যাপেন্ড দেন?
সাজিদ সবিস্তারে গল্পটি ইংরেজিতে বোঝাল এনাকে।
-যখন ইবরাহিম (আ.) তাঁর ছেলেকে বিষয়টি জানালেন, তখন ইসমাইল (আ.) ভীত হননি। বরং তিনি বাবাকে বলেছিলেন :
-বাবা, আল্লাহ আপনাকে যা আদেশ করেছেন, তা পালন করুন। ইনশা আল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের একজন হিসেবেই পাবেন।
 
এনা নিঃশব্দে শুনতে লাগল।
সাজিদ আবার শুরু করল ইংরেজিতে,
-যখন ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশ পালন করতে প্রস্তুত হলেন, তখন আল্লাহ তাঁদের আনুগত্য ও বিশ্বাস কবুল করলেন। ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি পশু কোরবানি করার নির্দেশ দিলেন।
-সো দেটস ওয়াই মুসলিম সেক্রিফাইজ অ্যানিমেল?
সাজিদ সম্মতি জানাল, সে জন্যই তখন থেকে মুসলমানরা পশু কোরবানি করে।
সাজিদ আরও বুঝিয়ে বলল,
-কোরবানির আসল শিক্ষা শুধু পশু জবাই নয়।
তাহলে আসল শিক্ষাটা হলো-নিজের স্বার্থপরতাকে ত্যাগ করা, অন্যকে সাহায্য করা এবং নিজের প্রাপ্ত নিয়ামত অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।
সাজিদ এবার টাকার প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে এটাও জানিয়ে দিল, আজ যে ভদ্রলোক আমাদের এই অর্থ দিলেন, তিনিও সেই শিক্ষাটাই অনুসরণ করেছেন।
এনা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সমর্থন করলেও অভিভূত দৃষ্টিতে পরখ করতে লাগল, যেন কেবল সাজিদকে নয় যেন সমগ্র মুসলমান সম্প্রদায়কে, সঙ্গে একখণ্ড বাংলাদেশকেও।
 
হঠাৎ সাজিদ কী মনে করে নিজের প্যাকেটটি খুলে সে ভেতর থেকে শুধু একটি একশ ডলারের নোট আলাদা করে রাখল। তারপর বাকি সব ডলার সে এগিয়ে দিল এনার দিকে। তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে ইংরেজিতে উচ্চারণ করল :
‘এই ডলারগুলো তোমার প্রাপ্য। তোমার মায়ের চিকিৎসার জন্য এগুলো দরকার। আমার জন্য আজ এই একশ ডলারই যথেষ্ট।’
কথাগুলো শেষ হতেই এনা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে তাকিয়ে রইল সাজিদের দিকে, যেন নতুন করে দেখছে সাজিদকে। যেন প্রথম বার দেখছে সে সাজিদকে। যেন জীবনে প্রথম দেখছে এমন এক অদ্ভুত মানুষকে, যে তার সমগ্র কষ্টটাকে নিজের অনুভবের মাঝে নিয়ে একান্ত পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
এনার মুখে কোনো রা নেই। সে শুধু টাকার প্যাকেটটির দিকে তাকিয়ে রইল, যেন সেটি টাকা নয়, কোনো অদৃশ্য দায়, কোনো অপার বিস্ময়।
 
ধীরে ধীরে তার হাত এগিয়ে গেল প্যাকেটটির দিকে... কিন্তু ছোঁয়ার আগেই থেমে গেল তার হাত। তার চোখে হঠাৎ বাঁধ ভেঙে গড়িয়ে পড়ল কলকলে জল। নীরবে, অঝোরে ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়তে লাগল একটা একটা করে নয়, যেন বহুদিনের জমে থাকা কষ্টগুলো অঝোরে ঝরতে লাগল।
সে কাঁপা স্বরে শুধু ফিসফিস করে বলল,
-ওয়াই-ওয়াই, ইউ আর ডুইং দিজ?
কিন্তু সাজিদ কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল, বাইরে গ্রীষ্মের রোদ ঝলমল করছে। দুজনের কাছেই বুঝি পুরাতন পৃথিবীটা এইক্ষণে খুব নতুন মনে হচ্ছে।
খাওয়া শেষ করে সাজিদ আর এনা বাইরে লনের পরিচ্ছন্নতায় নেমে পড়ে। বাগানে প্রবেশ করে প্রথমে দুজনেই কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়ায়-
সামনে যেন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। ঘাসের সবুজ গালিচার ওপর ছড়িয়ে আছে নানান রঙের এক মায়াবী উৎসব। লাল, হলুদ, বেগুনি আর সাদা ফুলগুলো বাতাসে হালকা দুলে যেন নিজেদের মধ্যেই নীরব কথোপকথন করছে।
 
সাজিদের চোখে ধরা দেয় গোলাপের গাঢ় লাল আভা, যেন কারও হৃদয়ের গভীর অনুভূতি সেখানে ফুটে উঠেছে। পাশে ডেইজি ফুলগুলো ছোট ছোট হাসির মতো ছড়িয়ে আছে, নির্ভার, নির্মল। দূরের ঝোপে বেগুনি ল্যাভেন্ডারের সারি হালকা সুগন্ধ ছড়িয়ে বাতাসকে আরও কোমল করে তুলেছে। পাখির ডাক আর পাতার মৃদু শব্দ মিলে পুরো লনটা যেন এক শান্ত সংগীতের মঞ্চ। এনা মুগ্ধ হয়ে শুধু বলে ওঠে, ‘দেটস সো নাইস!’
 
আর সেই মুহূর্তে মনে হয়, সময়টাও যেন একটু থেমে গেছে শুধু ফুল আর সবুজের ভেতর দিয়ে নীরবে বয়ে যাচ্ছে এক অদৃশ্য আনন্দ। মনে হচ্ছে সবকিছুই নতুন। নতুন এক পৃথিবীতে তাদের সদ্য আগমন। এখানে কোথাও কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, হতাশা নেই।
হঠাৎ এনা সাজিদের মুখোমুখি একান্ত কাছে এসে দাঁড়ায়। এতটাই কাছে যে নিঃশ্বাসের গন্ধ পর্যন্ত শোঁকা যায়। যেখানে হাত বাড়ালেই এনাকে স্পর্শ করা যায়। হঠাৎ সাজিদের মনে হয় সব পাখির কলতান বুঝি থেমে গেছে এনার হৃদয়ের কলতানের শব্দের কাছে।
 
সাজিদ টানা গভীর চোখে তাকায় এনার চোখে। এনাও কী এক গভীর আবেগে মায়াভরা দৃষ্টি রাখে সাজিদের চোখে। ঠিক তখন চারপাশে যত রঙিন ফুল, এই মুহূর্তে সবই বুঝি বিবর্ণ মনে হয় সাজিদের চোখে। প্রকৃতির সমস্ত রং বুঝি জমা হয় এসে এনার চোখে-মুখে-ঠোঁটে।
আমেরিকার এই যাপিত জীবনে ক্রমে সাজিদের খুচরা-খুচরা সুখ, দুঃখ, কষ্ট, হতাশা মিশেলে জীবনটা এই মুহূর্তে এক চরম প্রাপ্তিতে ভরে ওঠে তার।
এনা আরও কাছে আসে তার পরম এক আপনজন হয়ে।

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

 
© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz