বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ :

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

অন্তর্দহন

অন্তর্দহন

বিজ্ঞাপন
বাইরে থেকে দেখলে মিলির সংসারে কোনো অপূর্ণতা চোখে পড়ত না। পরিপাটি ঘর, ফুলের টব, মেয়েদের হাসিমাখা ছবি আর অতিথিদের জন্য আন্তরিক আপ্যায়ন—সবই ছিল। শুধু এই ঘরটিকে সুন্দর রাখতে রাখতে মিলির নিজের ভেতরটা কতবার ভেঙেছে, তার খবর কেউ রাখেনি।
গল্পের শুরু গত শতাব্দীর শেষ দিকে।
মামার বাসায় মিলিকে দেখতে এসেছিল তুষারের পরিবার। পারিবারিকভাবে সম্বন্ধ ঠিক হয়েছিল। প্রথম দেখার দিনই আংটি বদল হয়ে গেল। বিয়ের তারিখ নির্ধারিত হলো দুই মাস পর।
সেই দুই মাসে ফোনই হয়ে উঠল দুজনের পরিচয়ের সেতু। দিনের কাজের ফাঁকে, সন্ধ্যার অবসরে কিংবা রাতের নিরিবিলি সময়ে চলত দীর্ঘ আলাপ। পছন্দ-অপছন্দ, ভবিষ্যতের স্বপ্ন, সংসার নিয়ে কত কথা! মিলির মনে হতে লাগল, অচেনা মানুষটি বুঝি ক্রমেই তার সবচেয়ে আপন হয়ে উঠছে।
অল্প বয়সের সেই অনুভূতির গভীরতা তখন সে কতটুকুই-বা বুঝত! সবকিছু নতুন, সবকিছু রঙিন। সামনে অপেক্ষা করছে এক অজানা জীবন—সেই ভাবনাতেই তার বুকের ভেতর আনন্দ আর কৌতূহল মিশে থাকত।

তুষার সুন্দর করে কথা বলতে জানত। তার কথায় ছিল মুগ্ধ করার এক সহজ ক্ষমতা। মিলি সেই কথায় ভরসা খুঁজে পেয়েছিল। ভেবেছিল, যে মানুষ এত যত্ন নিয়ে তার কথা শোনে, তার সঙ্গে নিশ্চয়ই সুখে থাকা যাবে।
দুই মাসের আলাপ আর স্বপ্ন বোনার পর বিয়ে হলো তাদের।
কিন্তু বিয়ের পর ধীরে ধীরে মিলির পরিচিত তুষারের সঙ্গে অন্য এক তুষারের অমিল চোখে পড়তে লাগল।
প্রথমে বিষয়গুলো খুব ছোট মনে হতো। কোনো কাজ তার পছন্দমতো হয়নি, কোনো কথা ঠিকভাবে বলা হয়নি, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি—অভিযোগের যেন শেষ ছিল না। মিলি ভাবত, নতুন সংসার, দুজনের অভ্যাস আলাদা; মানিয়ে নিতে একটু সময় তো লাগবেই।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে অভিযোগগুলো বদলে গেল কটাক্ষে। ভুল ধরার সঙ্গে যুক্ত হলো ছোট করা, অপমান করা, এমন কথা বলা, যা মিলির মনে দীর্ঘক্ষণ বিঁধে থাকত।
সে নিজের কাছেই প্রশ্ন করত, ‘আমিই কি কিছু বুঝতে পারছি না? আমার আচরণেই কি কোনো ভুল হচ্ছে?’
মিলি বেড়ে উঠেছিল একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে। অঢেল অর্থ ছিল না, কিন্তু ছিল পারস্পরিক সম্মান আর শান্তির আবহ। ছোট খরচ হোক কিংবা বড় কোনো সিদ্ধান্ত—বাবা-মা আলোচনা করতেন। সিদ্ধান্তের ফল ভালো হোক বা মন্দ, তার দায়ও দুজনে ভাগ করে নিতেন।
মতভেদ যে কখনো হতো না, তা নয়। কিন্তু মিলি দেখেছিল, মতের অমিল থাকলেও একজন আরেকজনের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে পারেন।
মায়ের সংসার সামলানোর যত্ন আর বাবার সহযোগিতার মধ্যেই মিলির দাম্পত্যের ধারণা গড়ে উঠেছিল। তাই নিজের সংসারে এসে সে যেন বারবার হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছিল।
শহরে বড় হওয়া মিলি ছিল শিক্ষিত, কর্মঠ ও মিশুক। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী—সবার সঙ্গে তার সুন্দর সম্পর্ক ছিল। অথচ সবচেয়ে কাছের মানুষটির কাছে গেলেই কেন তাকে এত অযোগ্য মনে হতো?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই মিলি জানতে পারল, সে মা হতে চলেছে।
আনন্দের সঙ্গে শুরু হলো গর্ভাবস্থার শারীরিক অস্বস্তি। সকালে বমি বমি ভাব, খাবারে অরুচি, ক্লান্তি, কখনো হঠাৎ বিশেষ কিছু খেতে ইচ্ছা করা—সব মিলিয়ে শরীরের সঙ্গে মনও যেন অপরিচিত এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।
মিলি আশা করেছিল, এই সময়ে তুষার একটু কোমল হবে। তার ক্লান্ত মুখ দেখে হয়তো বলবে, ‘আজ থাক, তুমি বিশ্রাম নাও।’
কিন্তু সেই আশ্বাস খুব কমই মিলত।
অথচ নতুন সংসার সাজানোর কত শখ ছিল তার! কোথাও ছোট্ট একটি শোপিস, কোথাও ফুলের টব, পছন্দের পর্দা, রান্নাঘরের দরকারি জিনিস—একটি একটি করে গুছিয়ে তুলছিল নিজের স্বপ্নের ঘর।

ঘরের কোণগুলো সুন্দর হচ্ছিল। শুধু তাদের সম্পর্কের ভেতর জমতে থাকা অস্বস্তিটুকু সে কিছুতেই সরাতে পারছিল না।
প্রথম কন্যাসন্তানের জন্মের পর মিলি ভেবেছিল, মেয়ের মুখ দেখে হয়তো তুষারের মধ্যে পরিবর্তন আসবে। কিন্তু অভিযোগের তালিকায় এবার যুক্ত হলো সন্তানও।
‘মেয়ে হলো কেন?’
‘এতবার ডাক্তারের কাছে নিতে হয় কেন?’
‘দুধ আর ডায়াপারে এত টাকা লাগে?’
কথাগুলো শুনে মিলি নির্বাক হয়ে যেত। যে শিশুটি সম্পূর্ণভাবে তাদের ওপর নির্ভরশীল, তার প্রয়োজনও কীভাবে বিরক্তির কারণ হতে পারে!
রাতে মেয়ে জেগে উঠলে মিলি কোলে নিত, দুধ খাওয়াত, ডায়াপার বদলাত। সদ্য মা হওয়া শরীর তখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি। ঘুমের অভাবে চোখ জ্বালা করত। তবু শিশুটিকে শান্ত করতে করতে তাকে তুষারের বিরক্তিও সামলাতে হতো।
‘এতবার ওঠে কেন?’
‘এই শব্দে মানুষ ঘুমাবে কীভাবে?’
মিলি তখন আরও সাবধানে চলাফেরা করত। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ঘরের এক কোণে বসে থাকত, যেন শিশুর কান্নার সঙ্গে নিজের কান্নাটুকুও চেপে রাখা যায়।
স্ত্রী ও সন্তানের কী দরকার, কখন একটু সাহায্য প্রয়োজন, কখন একটু সহানুভূতি—এসবের প্রতি তুষারের আগ্রহ ছিল সামান্য। অথচ কোনো অসুবিধা হলেই তার দায় এসে পড়ত মিলির ওপর।
ধীরে ধীরে মিলি উত্তর দেওয়া কমিয়ে দিল। কারণ সে দেখেছিল, নিজের কষ্ট বোঝাতে গেলেও কথার মোড় ঘুরে যায়। যে আলোচনা শুরু হয়েছিল তার আঘাত পাওয়া নিয়ে, তার শেষ হয় তারই ভুলের দীর্ঘ তালিকা দিয়ে।

তার নীরবতাকে বাইরে থেকে শান্ত মনে হতে পারত। কিন্তু সেই নীরবতার পেছনে জমে ছিল ক্লান্তি।
কয়েক বছর পর তাদের দ্বিতীয় কন্যাসন্তান জন্ম নিল।
দুই মেয়েকে নিয়ে মিলির পৃথিবী পূর্ণ হলো, কিন্তু তুষারের অসন্তোষ কমল না। বরং নানা অজুহাতে তিরস্কার, নেতিবাচক মন্তব্য আর অপমানের মাত্রা বাড়তে লাগল।
একসময় মিলি ভাবল, মেয়েদের নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যাবে। অন্তত কিছুদিনের জন্য এমন কোথাও থাকবে, যেখানে প্রতিটি কথার আগে তাকে ভয় পেতে হবে না।
কিন্তু সিদ্ধান্তের সামনে এসে দাঁড়াল অনেক পুরোনো প্রশ্ন।
সে পরিবারের বড় মেয়ে। ছোট দুই বোন আর এক ভাই তখন পড়াশোনা করছে। তার ফিরে যাওয়া নিয়ে আত্মীয়স্বজন কী বলবে? বাবা-মাকে কত প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে? ছোট ভাইবোনদের বিয়েতে এর প্রভাব পড়বে না তো?
তখন মিলির মনে হতো, নিজের কষ্টের কথা বললে বুঝি প্রিয় মানুষদের জীবনে আরও কষ্ট ডেকে আনবে। আজ ভাবলে সে বোঝে, সেই ভয়ের অনেকটাই তৈরি করেছিল সমাজের চাপ। তবু সে সময় সেই চাপ পেরিয়ে যাওয়ার শক্তি তার ছিল না।
তাই যাওয়া আর হলো না।
মিলি থেকে গেল।
দিন পেরিয়ে মাস, মাস পেরিয়ে বছর। মেয়েদের বড় করা, পড়াশোনা দেখানো, অসুখে পাশে থাকা আর নিজের পেশাগত জীবন গড়ে তোলার মধ্যে সে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
কর্মজীবনে ধীরে ধীরে সাফল্য এল। নিজের দক্ষতা ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি পেল। যে মানুষটিকে ঘরে বারবার অযোগ্য বলা হতো, কর্মক্ষেত্রে তার ওপরই অনেকে আস্থা রাখত।
এই অভিজ্ঞতা মিলিকে নিজের সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখাল।
তুষারের প্রতিটি কথাকে আর নিজের পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করত না সে। কেউ তাকে ছোট করলেই যে সে ছোট হয়ে যায় না—এই বিশ্বাস একটু একটু করে গড়ে উঠল।
তবু কষ্ট পুরোপুরি মুছে যায়নি। কিছু কথা আজও মনে লাগত। শুধু সেই আঘাত নিয়ে আগের মতো সারা রাত জেগে নিজেকে দোষারোপ করত না।
মেয়েদের নিয়ে, কাজ নিয়ে, রান্না আর ঘর গোছানো নিয়ে তার দিন কাটত। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রেখেছিল। সেই ছোট ছোট যোগাযোগ তাকে মনে করিয়ে দিত, তুষারের মূল্যায়নের বাইরেও তার একটি পৃথিবী আছে।
মাঝে মাঝে বিয়ের আগের দুই মাসের কথা মনে পড়ত।
ফোনের ওপাশের সেই মানুষটি আর এক ছাদের নিচে থাকা মানুষটির মধ্যে এত দূরত্ব তৈরি হলো কীভাবে? তখনকার কথাগুলো কি সত্যিই তার মনের কথা ছিল? নাকি মিলি যতটুকু দেখেছিল, মানুষটি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল?
উত্তর পেত না সে।
তুষারের ভালো-মন্দ আচরণের পালাবদল দেখে মিলি এটা নিয়ে বেশ রিসার্চ করে, কিন্তু সে কনফিউজড থাকে, কারণ তার ব্যবহার এবং আচার-আচরণে বাইপোলার ডিসঅর্ডারের এবং নার্সেসটিক বিহেভিয়ার দোনোটাই লক্ষ করা যায়।
স্ত্রীকে ছোট করা, তার অনুভূতি উড়িয়ে দেওয়া, নিজের দায় অন্যের ওপর চাপানো, সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা—কিছু বর্ণনার সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পেল মিলি। বাইরের মানুষের কাছে তুষার অমায়িক ও আকর্ষণীয়; ঘরের ভেতরে সেই মানুষটির আচরণ যে কতটা আলাদা হতে পারে, তা বোঝানোও কঠিন ছিল।
তবু পড়াশোনা করে কারও নিশ্চিত রোগনির্ণয় করা যায় না—এ কথাও সে বুঝল। বাইপোলার ডিসঅর্ডার, আত্মমুগ্ধতার বৈশিষ্ট্য কিংবা অন্য কোনো সমস্যা—এসব নির্ধারণের জন্য পেশাদার মূল্যায়ন প্রয়োজন।
কিন্তু একটি বিষয়ে আর তার সংশয় রইল না : আচরণের নাম যা-ই হোক, বারবার অপমানিত হওয়ার কষ্ট সত্যি। সেই কষ্টকে গুরুত্ব দিতে কোনো রোগের নাম জানা জরুরি নয়।
বছরের পর বছর মিলি চেষ্টা করেছিল তুষারকে বোঝাতে। কেঁদেছে, তর্ক করেছে, শান্তভাবে বলেছে, আবার নতুন করে আশা করেছে।
একসময় বুঝল, পরিবর্তনের সমস্ত দায় সে একা বহন করতে পারে না। তুষার নিজের আচরণের দায় না নিলে মিলির চেষ্টা দিয়েই সব ঠিক হবে না।
মিলি তখনো সংসার ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। মেয়েদের, পরিবারকে, নিজের হাতে গড়া জীবনটাকে সে ভালোবাসত। কিন্তু ধীরে ধীরে নিজের জন্যও কিছু জায়গা রাখতে শিখছিল। অকারণ তর্ক দীর্ঘ না করা, প্রয়োজনে কথা থামানো, বিশ্বাসের মানুষের কাছে মন খুলে বলা—ছোট ছোট কিছু সিদ্ধান্ত তার জীবনে একটু স্বস্তি আনছিল।
থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তার নিজের। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যেন নিজের কষ্টকে অস্বীকার করার প্রতিশ্রুতি না হয়ে ওঠে—এ কথাটিও সে মনে রাখতে চাইত।
এক বিকেলে জানালার পাশে বসে ছিল মিলি। ঘরে নরম আলো। মেয়েদের ঘর থেকে হাসির শব্দ আসছিল। টেবিলে রাখা চা তখনো গরম।
অনেক দিন পর নিজের পুরোনো খাতাটি খুলল সে। কত বছর আগে লেখা কয়েকটি লাইন, কিছু অসমাপ্ত ভাবনা, কিছু ফাঁকা পাতা।
একটি নতুন পাতায় লিখল :
‘এত দিন ভেবেছি, ঘরটাকে সুন্দর রাখাই আমার একমাত্র কাজ। আজ মনে হচ্ছে, এই ঘরে যে মানুষটি প্রতিদিন বেঁচে থাকে, তার মনটারও যত্ন দরকার।’
লেখাটুকু পড়ে মিলি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর চায়ের কাপে চুমুক দিল।
সেদিন তার জীবনের সব সমস্যা মিটে যায়নি। তুষারও হঠাৎ বদলে যায়নি। কিন্তু নিজের কষ্টের কথা লিখতে গিয়ে মিলি প্রথমবার সেটিকে অযথা, তুচ্ছ কিংবা নিজের ব্যর্থতা বলে সরিয়ে দিল না।
এই স্বীকৃতিটুকু তার দরকার ছিল।
আমাদের চারপাশে এমন কত মিলি আছেন—যাঁদের ঘর পরিপাটি, সন্তান বড় হচ্ছে, সামাজিক অনুষ্ঠানে হাসিমুখে দেখা যায়। সেই হাসির আড়ালে কত না-বলা কথা থাকে, বাইরে থেকে তা বোঝা যায় না।
তাদের নীরবতাকে সুখ ভেবে নেওয়ার আগে কখনো একটু মন দিয়ে শুনতে হয়। তাদের সহ্যশক্তির প্রশংসা করার পাশাপাশি জানতে হয়, তারা কেমন আছেন।
কারণ একটি সংসার টিকে থাকার গল্পে, সেই সংসারের ভেতরে থাকা মানুষটির ভালো থাকাও সমান জরুরি।
 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz