একটি মন্তব্য করে ইরফান সাহেব কড়া ধমক খাবেন, এমন কথা কখনো ভাবেননি তিনি। দুজন লেখকের সৃষ্টিকে এক কাতারে ফেলায় ইরফান সাহেব মনঃক্ষুণ্ন হয়ে নিজের অমত প্রকাশ করেছিলেন। লোকটা সামাজিক মাধ্যমে লাঠি নিয়ে তাড়া করল। সঙ্গে ওর দুটো কুকুর ভেউ ভেউ করে এগিয়ে এল। ইরফান সাহেব এই প্রথম প্রমাণ পেলেন সামাজিক মাধ্যমেও অনেকে কুকুর পালে। প্রয়োজনে লেলিয়ে দেয়। প্রথমে ভেবেছিলেন পাল্লা দিয়ে ঝগড়া করবেন, পরে সিদ্ধান্ত নিলেন শরীর ও মনের শক্তি অন্য কোনো ভালো কাজে ব্যয় করবেন। এসব ফালতু মন্তব্যকারী গায়ে মানে না আপনি আঁতেল অনেককেই ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেছেন গত পাঁচ দশকে। এর কপালেও একই পরিণতি রয়েছে।
অল্প বয়সে লেখকদের না খেয়ে কষ্ট পেতে দেখেছেন। পত্রপত্রিকায় চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণকারী লেখকদের খবর পড়েছেন। তাই তারুণ্যে লেখালেখির প্রতিভাটাকে বাক্সবন্দী করে পায়ের নিচে মাটির ব্যবস্থা করতে বেশি মনোযোগী হয়েছিলেন। পায়ের নিচে শক্ত মাটির ভিত্তি জমাতে গিয়ে দীর্ঘদিন চলে গেছে। লেখালেখিতে প্রত্যাবর্তন করতে গিয়ে দেখেন, দুঃখ-কষ্ট লেখালেখির অন্তঃপ্রাণ। এগুলো কমে যেতে থাকলে কলমের কালিও ফুরিয়ে যেতে থাকে। আর্থিক সমস্যার সমাধান হলেও অন্যান্য জটিল দুর্বোধ্য সমস্যাগুলো এসে তার লেখক সত্ত্বাকে আবার জাগিয়ে দিল। বুঝতে পারলেন প্রকৃতির হাতে জীবনের বৃহদাংশ বন্ধক দেওয়া। মায়ের দুধের মতো এই ঋণও কখনো পরিশোধ করা যায় না। আবার লিখতে শুরু করলেন ইরফান সাহেব। লেখালেখির জগতে প্রত্যাবর্তন করে দেখলেন, এখন লেখকেরা সেলিব্রেটির মর্যাদা পেয়ে যায়। এই অভাবনীয় প্রাপ্তির লোভে ডাক্তারি পড়া শেষ করে এখন অনেকে গরিব মানুষের চিকিৎসা না করে তাদের নিয়ে লেখে। নামী-দামি ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে পড়ে দেশের মান্ধাতা আমলের ইনফ্রাস্ট্রাকচার, পুরোনো মডেলের কলকারখানা পরিবর্তন করার পরিবর্তে মানুষের মনোজগতের বিষয়বস্তু নিয়ে জটিল বই লেখে। এদের পাঠানো লেখা পত্রপত্রিকাগুলো মেধাবীর কোঠায় ছাপে। রেডিও-টিভিতে সংবাদপত্রে এদের গুণগানে সয়লাব। কঠিন পরীক্ষা দিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে নিজের জুরিসডিকশনের অসামান্য সমস্যাগুলো না ঘেঁটে প্রেমের কবিতা লিখে পুরস্কার বাগিয়ে নেওয়া লোকের সংখ্যাও কম নয়।
ইরফান সাহেব নিজেকে শাসান। এগুলো বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। এতদিন পরে এই জগতে এসে কোথায় উনি শান্তিতে দুটো ভালো লেখা উপহার দেবেন। তা না করে লেখকদের ওপর অস্ত্রোপচার শুরু করেছেন। বছর দুয়েক আগে রিটায়ার করার পর ইরফান সাহেব এখন শত্রুতায় মনোযোগী হয়েছেন। এখন কেউ তার দিকে বেখাপ্পা চাইলেও ছাড়েন না, চোখ লাল করে একটা প্রত্যুত্তর দিয়ে দেন। এখন সবকিছুতে তার একটা প্রতিশোধ নেওয়ার মনোবৃত্তি। সামাজিক মাধ্যমে তাকে হেনস্তা করার লোকটিকে মনে মনে বেশ কয়েকবার পিটিয়েছেন। গায়ে শক্তি থাকলে হয়তো প্রকাশ্যে সত্যি সত্যি খুন করে ফেলতেন। ভাগ্যিস, তা না থাকায় কারাগারে যেতে হবে না।
কোনো সাহিত্য অনুষ্ঠানে গেলে মহিলা লেখকেরা তার সঙ্গে হেসে কথা না বললে তার মেজাজ চড়ে যায়। এদের কেউ কেউ আবার পাহারাদার স্বামী নিয়ে আসে। তার সঙ্গে হেসে কথা বললে বেচারি বাসায় গিয়ে একটা বিপদে পড়ে যেতে পারে, সেটাও তিনি তোয়াক্কা করেন না। এমনিতেই নারীদের দেখলে তার চোখ চকচক করে। এর মধ্যে কোনো খারাপ কিছু দেখেন না ইরফান সাহেব। যুগে যুগে নারীরা লেখকদের মহৎ সৃষ্টির অনুপ্রেরণা। তাদের প্রত্যাখ্যানে সহস্র কবিতার জন্ম হয়েছে। গল্প লেখা হয়েছে অসংখ্য।
সেদিন ছেলেসহ একটি কুরিয়ার সার্ভিসের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইরফান সাহেব। হঠাৎ লক্ষ করলেন, দোকানি তাদের দিকে বিশ্রী চোখে চাইছে। ভাবখানা এই, তোরা আমার দোকানের সামনে কী করছিস? যদিও সরকারি রাস্তায় দাঁড়ানো তার নাগরিক অধিকার। ওর বিশ্রী চাহনির প্রতিশোধ নিতে ইরফান সাহেবও ওর দিকে রাগী চোখে চোখ মেলালেন। আর যায় কই। মুহূর্তে লোকটা বাইরে এসে ঝগড়া শুরু করে দিল। এই তোরা এখানে দাঁড়ানো কেন? পরমুহূর্তেই ইরফান সাহেবের জ্ঞাতীগোষ্ঠীরা এ ধরনের ফ্যালফ্যাল চাহনিতে অভ্যস্ত ও এদের জন্য এই দেশ সঠিক নয়, হাজারো মন্তব্য করে ফেলল। ইরফান সাহেব বললেন, আমরা গাড়ির মিটারের টিকিট কাটছি, তোর সমস্যা কোথায়? ওর নিজের জাত সেই মহা খুনির সঙ্গে এসে এখানকার আদি বাসিন্দাদের টুকরো টুকরো করে মেরেছে, সেই ইতিহাস এই অর্বাচীনকে বলার রুচি হলো না ইরফান সাহেবের। যতক্ষণ না গায়ে হাত দিচ্ছে ততক্ষণ পুলিশ কল দেওয়া যাবে না। মৌখিক আঘাতের জন্য জেল-জরিমানা হয় কি না, তার জানা নেই। তবে শারীরিক আঘাতে জেল-জরিমানা সুনিশ্চিত। নিজেকে সামলে নিয়ে ওই জায়গা থেকে ছেলেকে নিয়ে সরে গেলেন ইরফান সাহেব। বলা যায় না ব্যবসায়ী হিসেবে পুলিশ কল দিলে ওর চামড়ার কেউ এসে গেলে খামোকা বেঁধে নিয়ে যেতে পারে। এরকম ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। এ জন্য ওর এক আত্মীয়ের অভিমত, ইরফান ভাই একদিন দেখবেন এখানে ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধ হবে।
এই দেশকে কেউ ভালোবাসে না। নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্য এগুলো নিয়ে আজাইরা মাথা ঘামায়। ছুটিতে ভেকেশনে নিজ নিজ দেশে গেলে এয়ারপোর্ট থেকে জুতোর বাড়ি খাওয়া শুরু হয়। পদে পদে ভোগান্তি জরিমানা অকথ্য কথাবার্তা শুনে ভগ্ন মনোরথে নিজের হিজরত করা আশ্রয়ে ফিরে এসে বুকভরে নিঃশ্বাস নেয়। কিন্তু এখানেও শান্তি পাচ্ছেন না ইরফান সাহেব। কদিন আগে কাপড় ধোয়ার লন্ড্রমেটের মধ্যে এক টেবিলের ওপর কফি রেখে কাপড় মেশিনে ঢোকাবেন, এর মধ্যে কৃষ্ণ বর্ণের এক লোক রশি ঘোরাতে ঘোরাতে তার দিকে এগিয়ে এল। ওর ভাষার মধ্যে খুন করার ইঙ্গিত। একই সঙ্গে রশি এমনভাবে পেঁচাচ্ছে, ক্রাইম পেট্রোলে এই ধরনের মার্ডার অসংখ্যবার দেখেছেন ইরফান সাহেব। কায়দা করে গলার দু’পাশে বসিয়ে একটা হেঁচকা টান দিলেই জীবন শেষ। লন্ড্রমেটের দায়িত্বে থাকা মেয়েটি বোবা। এ জন্য নিজের ভাষার বাইরে এদেশের প্রধান ভাষা তার জানা নেই শেখারও আগ্রহ নেই। শেখাটা বাধ্যতামূলকও নয়। আনমনে নিজের কাজ করে যাচ্ছে। বিপদ বুঝে পুলিশে কল দেবে, তারও তাড়া নেই। লন্ড্রমেটে থাকা বাকি সবাইও মেশিনে কাপড় ঢোকাচ্ছে, যেন ঘটুক না একটা ঘটনা। মোবাইলে ভিডিও করে ভাইরাল করা যাবে। ইরফান সাহেবের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাড়া না পেয়ে রণে ভঙ্গ দিল সেই কৃষ্ণকায় ব্যক্তি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও একটা ট্রমার মধ্যে চলে গেলেন ইরফান সাহেব।
বেশ কয়েক বছর আগে গাড়ি চালিয়ে একটা এক্সিটে ঢুকছেন ইরফান সাহেব। হঠাৎ পেছন থেকে তার গাড়িকে কেউ যেন ধাক্কা দিল। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থামালেন ইরফান সাহেব। গাড়ির কোনো ক্ষতি হলো কি না দেখার জন্য। লোকটা তার গাড়ি থেকে নেমে এসে উল্টো ইরফান সাহেবকে ধমকাতে শুরু করল। ব্যাটা, অত ধীরে চালাস কেন? তোর তাড়া না থাকলেও মানুষের অনেক তাড়া আছে। ইরফান সাহেব ভাবছেন নিয়মমাফিক ইন্স্যুরেন্সের ইনফরমেশন বিনিময় করবেন। এর মধ্যে লোকটা লাফ দিয়ে ওর গাড়িতে উঠে গাড়ি অন্য রাস্তায় নিয়ে পালিয়ে গেল। ভাগ্যিস, ইরফান সাহেব ওর গাড়ির প্লেট নাম্বারটা টুকে নিয়েছিলেন। ইরফান সাহেব গাড়ির নাম্বার নিয়ে পুলিশের কাছে গেলে ওরা তাকে আগের জায়গায় ফেরত যেতে বলল। তুমুল গাড়িবহরে সয়লাব হাইওয়ের ওই স্থানে আবার ফেরত যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। কোনো রকমে পুলিশ রিপোর্ট ফাইল করে ঘরে ফেরত গিয়েছিলেন ইরফান সাহেব। পরে তদন্তে পাওয়া গিয়েছিল, গাড়িটি চুরি করে ওই লোক পালাচ্ছিল। ডিডেকটিভ ওকে ধরতে একদঙ্গল লোক জড়ো করে ইরফান সাহেবকে শনাক্ত করতে বললে তিনি গররাজি হোন। আধা সেকেন্ডে একটা লোককে দেখে তার চেহারা মনে রাখার মতো জিনিয়াস তিনি নন। ওই ফাঁদে ধরা দিয়ে নিরীহ লোককে জেলে পোরার খায়েশ তার ছিল না।
ইরফান সাহেব একবার ব্যবসা দেওয়ার জন্য এক প্রাচীন সভ্যতার দেশের লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে যান। লোকটা এসইউভি চালিয়ে এসে প্রতিষ্ঠানের সামনে পার্ক করল। সঙ্গে ওর টিনএজ ছেলে নিয়ে এসেছে। ছেলেটাকে গাড়ির সামনের সিটে এমনভাবে বসাল, যেন কথা বলার সময় ওরা ছেলেকে দেখতে পায়। ইরফান সাহেব লোকটার হাত ধরে মিনতির ভাষায় বলেছিলেন, ‘আলেকজান্ডার, আমার তিনটি ছেলে। তুমি আমাকে এমন ব্যবসা দাও, যেন আমি ওদের ভবিষ্যতের জন্য একটা কিছু করে যেতে পারি।’ লোকটা মুচকি হেসে ওর ছেলের দিকে তাকাল। ইরফান সাহেবও তাকালেন। ভাবখানা যেন দেখো আমারও ছেলে আছে। তোর মনের কথা আমার বোধগম্য হচ্ছে। ইরফান সাহেব প্রতারিত হওয়ার পর বুঝতে পেরেছিলেন সেই মুচকি হাসির রহস্য। আসলে আলেকজান্ডার বোঝাতে চেয়েছিল-তুই যেমন তোর ছেলেদের কথা ভাবছিস, ঠিক তেমনি আমিও আমার ছেলের কথা ভেবে তোর সারা জীবনের সঞ্চয় হাতিয়ে নিচ্ছি। এত পোড় খেতে খেতে ইরফান সাহেব ভাবলেন, এখন আর তাকে ফাঁসানো যাবে না। বাজার করতে গেলেন একটা চায়নিজ সুপার মার্কেটে। কেনাকাটার পর গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন। এর মধ্যে ডান দিকের এক লোক নক করল। হাতে এক তাড়া নোট। বলল, মনে হচ্ছে এই ডলারগুলো তোর। অসতর্কতায় পকেট থেকে পড়ে গেছে। মুহূর্তে ইরফান সাহেবের মাথায় তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। তার জানামতে এই ডলারগুলো তার নয়। আবার ভাবলেন অনেকগুলো বিল বাকি পড়ে আছে। ডলারগুলো পেলে খানিকটা কষ্ট লাঘব হবে। ইরফান সাহেবের দোটানার মধ্যে লোকটা দরজা খুলতে বললে ইরফান সাহেব লক খুলে দিলেন। তড়িৎ গতিতে লোকটা তার পাশের সিটে বসে পড়ল। হাতে এক তাড়া নোট : দেখ ডলারগুলো সত্যি তোর কি না বল। যদি না হয়, তাহলে আমরা অর্ধেক অর্ধেক ভাগ করে ফেলি। এই কথাবার্তা চলার সময় আরেকটা সুঠামদেহী লোক ইরফান সাহেবের ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে ফেলল। তারপর উবু হয়ে ইরফান সাহেবের উভয় পকেট থাবড়িয়ে ডান দিকের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে কড়কড়ে দুটো একশ ডলারের নোট নিয়ে মানিব্যাগটা ফেরত দিয়ে চলে গেল। ইতিমধ্যে ডান পাশে বসা লোকটিও কখন যে এক তাড়া নোট নিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে, ঘটনার নাটকীয়তায় তিনি তা খেয়াল করতে পারেননি। ইরফান সাহেব বেশ কিছুক্ষণ থ মেরে বসে থাকলেন। এবার বিলগুলো পরিশোধ করা আরও কঠিন হয়ে গেল। ইরফান সাহেবের আর কোনো দ্বিধা নেই। আগামী দিনগুলোতেও তার প্রতিপক্ষের অভাব হবে না। তিনি তাদের এড়াতে চান না উপরন্তু ডেকে নিয়ে আসেন। আজ তারই প্রমাণ পেলেন। তিনি তো ভালোভাবেই জানতেন, ওই এক তাড়া নোট তার নয়। না বলে গাড়ি ব্যাকআপ করে চলে গেলেই তো হতো।