মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :
• বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী • তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা কেন? • কনি আইল্যান্ডে ‘কস্ট অব লিভিং ক্ল্যাসিক’ ফুটবল টুর্নামেন্ট • নিউইয়র্ক সিটির ৩ হাজার গাড়িতে থাকবে গতি নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি • স্ন্যাপ ও মেডিকেইড সুবিধা ধরে রাখতে নিউইয়র্ক সিটির নতুন ওয়েবসাইট • ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরু হলেও ইউক্রেনে সামরিক অভিযান থামবে না : রাশিয়া • জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকে নতুন এমডি • যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের আহ্বান জাতিসংঘ মহাসচিবের • তীব্র সমালোচনার মুখে ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলো পুলিশ সদর দপ্তর • টেলিটকের ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​ত্রিশ টাকার পতাকা

​ত্রিশ টাকার পতাকা

বিজ্ঞাপন
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি জানালার কাচ ভেদ করে ঘরে ঢোকেনি। এক কাপ চায়ের ধোঁয়া ধীরে ধীরে উঠছে। টেবিলের ওপর রাখা পত্রিকাটা খুললেন একজন বাবা। প্রতিদিনের মতোই। পৃথিবীর আর দশটা সাধারণ সকালের মতোই।
প্রথম পাতায় একটি ছবি। একটি রিকশা। রিকশার পাদানিতে রক্তে ভেজা এক কিশোর। মাথায় বাঁধা লাল-সবুজের পতাকা। বুকের রক্ত সেই পতাকার রংকে যেন আরও গাঢ় করে দিয়েছে। এক হাত এখনো লোহার রড শক্ত করে ধরে আছে। মনে হচ্ছে, জীবনটা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, তবু শেষ শক্তিটুকু দিয়ে সে পৃথিবীটাকে আঁকড়ে রাখতে চাইছে।

বাবার চোখ হঠাৎ থেমে গেল। তারপর সময় থেমে গেল। তিনি ছবিটার দিকে ঝুঁকে এলেন। ঠোঁট কাঁপল। গলা শুকিয়ে গেল।
‘এটা... এটা তো আমার নাফিজ...’
এই একটি বাক্যের সঙ্গে সঙ্গে একটি সংসারের আকাশ ভেঙে পড়ল। পাশের ঘর থেকে ছুটে এলেন মা। মোবাইলের স্ক্রিনটা দুই হাতে ধরে ছবির ওপর আঙুল বুলিয়ে বলতে লাগলেন, ‘ওঠ বাবা...একবার শুধু চোখ খুলে তাকা... আমি এসেছি...’
কিন্তু ছবির মানুষ কখনো ফিরে তাকায় না। তারা শুধু মানুষের বুকের ভেতর আজীবনের জন্য একটি শূন্যতা রেখে যায়।
ষোলো বছরের একটি ছেলে। এই বয়সে মানুষের চোখে পৃথিবী সবচেয়ে সুন্দর লাগে। ভবিষ্যৎ তখন এক বিশাল নীল আকাশ, যেখানে প্রতিটি মেঘই স্বপ্নের মতো।

গোলাম নাফিজও স্বপ্ন দেখত। বইয়ের পাতায় ভবিষ্যৎ খুঁজত। পরীক্ষার খাতায় নিজের আগামী লিখত। বন্ধুদের সঙ্গে হাসত। খেলাধুলা করত। বিতর্কে দাঁড়িয়ে যুক্তি দিত। জীবনের প্রতিটি দিনকে দু’হাত ভরে গ্রহণ করত।
বাবা ভাবতেন, ছেলে একদিন অনেক বড় হবে। মা ভাবতেন, সংসারের সব কষ্ট একদিন এই ছেলের মুখের হাসিতেই মুছে যাবে। কিন্তু তারা জানতেন না, কিছু কিছু সন্তান বড় হয় বয়সে নয়, আত্মত্যাগে।
৪ আগস্টের সকাল। সাধারণ একটি সকাল। নাফিজ বাবার সামনে এসে দাঁড়াল। মুখে লাজুক হাসি।

‘আব্বু, ত্রিশটা টাকা দিবা?’
বাবা পকেটে হাত দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী করবি?’
ছেলেটা খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, ‘একটা পতাকা কিনব।’
মাত্র ত্রিশ টাকা। এই পৃথিবীতে কত মানুষ লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে নিজের সুখ কেনে। আর একটি ছেলে মাত্র ত্রিশ টাকায় কিনতে চেয়েছিল নিজের দেশের পতাকা।

বাবা টাকা দিলেন। হয়তো মনে মনে হাসলেনও। কে জানত, সেই ত্রিশ টাকার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল লেনদেন!
দুপুরের শহর তখন উত্তাল। মানুষের ঢেউয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল নাফিজ। মাথায় বাঁধা পতাকাটা বাতাসে উড়ছিল। মনে হচ্ছিল, পতাকাটা শুধু কাপড় নয়, যেন একটি প্রজন্মের স্বপ্ন।
চারদিকে সেøাগান। চোখে আগুন। বুকে সাহস।
যে বয়সে মানুষ ভবিষ্যতের জন্য বাঁচে, সে বয়সেই নাফিজ দাঁড়িয়ে ছিল ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে।
হঠাৎ আকাশ কেঁপে উঠল। একটার পর একটা গুলির শব্দ। মানুষ দৌড়াতে শুরু করল। চিৎকারে ভরে গেল চারপাশ। ধোঁয়ার মধ্যে মানুষের মুখগুলো ঝাপসা হয়ে গেল।

কিন্তু নাফিজ পালায়নি। সে আগে অন্যদের দিকে ছুটেছিল। আহত একজনকে ধরেছিল। আরেকজনকে সরিয়েছিল। হয়তো তার বিশ্বাস ছিল, মানুষকে বাঁচানোই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
তারপর...একটি গুলি। একটি মুহূর্ত। একটি জীবন।
বুকের এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল ধাতব আগুন। নাফিজ ধীরে ধীরে মাটিতে পড়ে গেল।
আকাশ তখনো নীল ছিল। সূর্য তখনো আলো দিচ্ছিল। শুধু পৃথিবীটা হঠাৎ অনেক অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।
একজন রিকশাচালক ছুটে এলেন। তার নাম নূর মোহাম্মদ। তিনি রক্তাক্ত ছেলেটিকে কোলে তুলে নিজের রিকশায় শুইয়ে দিলেন। রিকশার সিটে নয়। পাদানিতে।
সময়ের তখন আর কোনো নিয়ম ছিল না। ছিল শুধু একজন মানুষকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা।
রিকশা ছুটছে। চাকার সঙ্গে সঙ্গে সময়ও ছুটছে। নাফিজের হাত এখনো লোহার রড শক্ত করে ধরা। সেই হাতের দিকে তাকালে আজও মনে হয়, জীবন কত অসীম সুন্দর ছিল তার কাছে।
মৃত্যু যখন দরজায় দাঁড়িয়ে, তখনো সে যেন ফিসফিস করে বলছিল, ‘আর একটু...আমি এখনো মরতে চাই না...আমার তো আরও অনেক পথ বাকি...’

কিন্তু মৃত্যু কোনো উত্তর দেয় না। সে শুধু মানুষকে নিঃশব্দে নিয়ে যায়।
সেদিন একটি ক্যামেরা ক্লিক করেছিল। শুধু একটি ক্লিক। কিন্তু সেই ক্লিকের ভেতর আটকে গিয়েছিল একটি সময়, একটি জাতির দীর্ঘশ্বাস, একটি কিশোরের অসমাপ্ত জীবন।
পৃথিবীর কিছু ছবি সংবাদ হয় না। প্রতীক হয়ে যায়। এই ছবিটিও তেমনই।
রিকশার পাদানিতে পড়ে থাকা নাফিজ যেন একা ছিল না। তার পাশে শুয়ে ছিল একটি জাতির বিবেক।
সন্ধ্যা নেমেছে। রাত বাড়ছে। একজন বাবা পাগলের মতো ছেলেকে খুঁজছেন। এক হাসপাতাল। আরেক হাসপাতাল। এক থানা। আরেক থানা।
প্রতিটি দরজায় একই প্রশ্ন।

‘আমার ছেলেটাকে দেখেছেন?’
কেউ উত্তর দিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত উত্তর এল। কিন্তু মানুষের মুখে নয়। একটি ছবিতে।
কত নির্মম এই পৃথিবী! যে সন্তানকে বুকের মধ্যে আগলে বড় করলেন, তাকে শেষবার দেখতে হলো পত্রিকার প্রথম পাতায়।
বাবা পরে বলেছিলেন, ‘ওই যে রডটা ধইরা আছিল... কত বাঁচতে চাইছিল!’
এই কথাটুকুর ভেতর হাজার বছরের সমস্ত পিতৃত্ব কেঁদে ওঠে।
মা বলেছিলেন, ‘আমি চাইতাম আর কোনো মায়ের বুক খালি না হোক।’
কিন্তু ইতিহাস কখনো কখনো সবচেয়ে পবিত্র প্রার্থনাগুলোরও কঠিন পরীক্ষা নেয়। আজ সেই রিকশা একটি জাদুঘরে দাঁড়িয়ে আছে। লোহার শরীরে মরিচা পড়েছে হয়তো। কিন্তু তার স্মৃতিতে নয়।
সে এখন আর যানের নাম নয়। সে এক নীরব সাক্ষী। সে জানে, একদিন তার পাদানিতে শুয়ে ছিল একটি কিশোর, যার হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র, ছিল শুধু একটি পতাকা।

আজও যখন বাতাসে লাল-সবুজের পতাকা দুলে ওঠে, মনে হয় তার প্রতিটি দোলায় নাফিজের নিঃশ্বাস মিশে আছে। তার প্রতিটি রঙে আছে একটি কিশোরের রক্ত। তার প্রতিটি ভাঁজে লুকিয়ে আছে অসমাপ্ত স্বপ্ন।
মাত্র ত্রিশ টাকার একটি পতাকা কিনতে বের হয়েছিল সে। কেউ জানত না, শেষ পর্যন্ত সেই পতাকার দাম তাকে নিজের জীবন দিয়ে শোধ করতে হবে।
কিছু মৃত্যু কেবল একটি পরিবারকে অনাথ করে না। একটি জাতির বিবেককে চিরদিনের জন্য জাগিয়ে রেখে যায়।
নাফিজ আজ নেই। কিন্তু কখনো কখনো গভীর রাতে, ইতিহাসের পাতা উল্টালে মনে হয়, সেই রিকশার পাদানিতে এখনো একটি হাত লোহার রড শক্ত করে ধরে আছে।
সেই হাত যেন আমাদের থামিয়ে বলে, ‘দেশকে ভালোবাসো। কারণ পতাকার রং শুধু কাপড়ে আঁকা নয়।
কখনো কখনো তা লেখা হয় মানুষের বুকের রক্তে।’

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

 
© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz