বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

হেফাজত এখন কার হেফাজতে?

হেফাজত এখন কার হেফাজতে?

বিজ্ঞাপন
শেষে-অবশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গেলেন হেফাজতের দরবারে। গেলো রবিবার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে  তাকে মোবারকবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি। সেখানে সংগঠনটির আমির শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরীসহ অন্য শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেসময় হেফাজতকে আগের মতো বিএনপির সঙ্গে থাকার আহ্বান জানান তিনি। আর এ সুযোগে হেফাজতও কিছু দাবি-দাওয়া ধরিয়ে দিয়েছে। ক্ষমতার শখ-আহ্লাদ জানাতেও ছাড়া হয়নি। বলা হয়েছে, আলেমদের নিয়ে জোট করেছেন, ইলেকশন করেছেন। কিন্তু মন্ত্রিপরিষদ বা সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আলেমদের রাখা হয়নি। কী, কেমন মনে হলো তাদের দাবি ও যুক্তি? 
বিরোধীদল জামায়াতের অভিযোগ- এ সরকার হেফাজতে ইসলামকে ব্যবহার করে তাদের জোট ভাঙার ‘ষড়যন্ত্র’ করছে। হেফাজতের পক্ষ থেকে সরকার প্রধানের কাছে দেয়া দাবির প্রথমটিতেই রয়েছে কুরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি তথা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন পাস করা। ‘২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্ত্বরে রাতের আঁধারে নৃশংস গণহত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিতের দাবি তো রয়েছেই। সেইসঙ্গে, কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমানের স্বীকৃতি কার্যকরের দাবিও। কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা এবং হিজবুত/হেজবুত তাওহিদকে নিষিদ্ধের দাবিও বাদ যায়নি। দাবিগুলো শোনার পর প্রধানমন্ত্রী কী করলেন? কী বললেন?
বলেছেন, ইসলামবিরোধী, কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড অতীতেও বিএনপি সরকারের আমলে হয়নি। তার সরকারের আমলেও হবে না। ২০১৩ সালে আত্মপ্রকাশ করা হেফাজতে ইসলাম এর আগেও বিভিন্ন সময় একই ধরনের দাবি জানিয়েছে। ১৩ দফা থেকে এখন ৯ দফায় নেমেছে। মতিঝিলেন শাপলা চত্ত্বরে ১৩ দফা আদায়ে সমাবেশ করতে গিয়ে চ্যাঁছা মার খাওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে হেফাজতের সখ্যতা রিম্যাক হয়। এমনকি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিকে মাস্টার্স বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমানের মর্যাদাও দেয়া হয়। এ ঘটনার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিও দেয়া হয়। তা’হলে আর সমস্যা কী?
সমস্যা না থাকার পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধ দেখা দেয়। হেফাজতের অনেক নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়। এখন আরেক চিত্র। বিএনপি বলছে, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে তাদের ‘সুসম্পর্ক’ বেশ দীর্ঘদিনের। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলন থেকে শুরু করে সবশেষ সংসদ নির্বাচনেও সংগঠনটি তাদের পাশে ছিল। আগামীতেও থাকবে বলে আশা তাদের। বিরোধীদলে থাকা জামায়াত এতে সমূহ গোলমাল দেখছে। তাদের কাছে তথ্য আছে, ১১ দলীয় জোট থেকে কওমি ধারার দলগুলোকে বের করে নেবে সরকার।  তথ্য কি মনগড়া? 
হেযবুত তাওহীদের কথাবার্তাও মনগড়া নয়। হেজবুতের ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমের দাবি, প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত তাদের আন্দোলন দেশের প্রচলিত কোনো আইন ভঙ্গ করেনি এবং কোনো অনৈতিক বা বেআইনি কর্মকাণ্ডেও জড়িত নয়। বরং,  হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে বহু অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও বেআইনি কর্মকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। 
তার মতে, ইসলাম ধর্মের ভেতরে আকিদাগত, মাসআলাগত এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত মতপার্থক্য কোনো নতুন বিষয় নয়। মুসলিম বিশ্বে এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্বীকৃত ঐতিহ্য, যা হাজার বছর ধরে চলে আসছে। অতীতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও বিভিন্ন সংগঠনসহ দেশের বিভিন্ন মহল থেকে হেফাজতে ইসলামকে নিষিদ্ধের দাবিও বারবার উঠেছে। আবার হেফাজতের পক্ষ থেকেও বহু ধর্মীয় সংগঠনকে নিষিদ্ধের দাবি তোলা হয়েছে। 
তার মতে, এটি একটি অপ-অভ্যাস। তা চলতে থাকলে এ দেশে কোনো  দল বা সংগঠনই তার সাংবিধানিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পাবে না। হেফাজতে ইসলাম মূলত সরকারের কাঁধে বন্দুক রেখে নিজেদের ধর্মীয় উগ্রতা ও অশুভ এজেন্ডা হাসিল করতে চাচ্ছে বলেও অভিযোগ তার। তাহলে মানে কী দাঁড়ায়?
হেফাজতে ইসলামের পরিচয় কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু রাজনৈতিক, সহিংসতা, আদর্শিক বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সরকারি সুযোগ-সুবিধা হাতানোর মতো কাজকামের কোনোটিই বাদ নেই তাদের। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব-বিভক্তিও সময়ে সময়ে মারাত্মক পর্যায়ে। তাদের কট্টর ও রক্ষণশীল অবস্থান কেবল আধুনিক চিন্তার মানুষ নয়, কখনো কখনো সাধারণ মানুষকেও ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়। লক্ষণটি ভালো নয়। হেফাজত চায় হেজবুত/হিজবুত নিষিদ্ধ হোক। তাবলীগের এক গ্রুপের নেতারা আরেক গ্রুপকে ইজতেমা করতে না দেয়ার দাবি জানাচ্ছে। এসব সরকারের কাছে প্রশ্রয় পেলে পরে কে না থাকবে নিষিদ্ধের তালিকায়? সুন্নি, আহলে হাদিস, আহলে কুরআন, সাদপন্থী তাবলীগ ইত্যাদি গোষ্ঠীগুলো হেফাজতে ইসলামকে ওহাবি, তাকফিরি, খারেজি, উগ্রবাদী, ধর্মব্যবসায়ী, ইয়াজীদের উত্তরসূরী ইত্যাদি বলে সম্বোধন করে। সংখ্যায় হেফাজতে ইসলামের চেয়ে তারা বহুগুণ বেশি। ওই দলগুলোও পাল্টা হেফাজতে ইসলামকে নিষিদ্ধের দাবি জানালে হেফাজতকে হেফাজত করবে কে? সরকারেরই বা কী করার থাকবে?  
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন, ঢাকা। 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz