সম্প্রতি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আবারও রাজপথে অবস্থান নেন। প্রথমত, দেশ তখন ভাসছে বন্যার জলে। প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে দেশের আনাচ-কানাচে উজান থেকে ধেয়ে আসা বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা খুব পুরোনো একটি বিষয়। তবে উজানে সেই বানের পানির তোড়জোড় একটু বেশি হলে ভাটি অঞ্চলের ওপরও তার বিরূপ প্রভাব পড়ে, সেটাও পুরোনো খবর। এবার অবশ্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বৃষ্টি এবং ভারী বৃষ্টির প্রকোপে মানুষের নাজেহাল অবস্থার খবর প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে সতর্ক সংকেত হিসেবে উপস্থিত হয়ে জানান দিয়েই যাচ্ছিল-বাংলাদেশের অবস্থা কতটা মারাত্মক হতে পারে।
বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ অঞ্চল। ফি বছর বানের পানিতে কত মানুষ নিজেদের সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব ভিখারিতে পরিণত হয়, তার কোনো লেখাজোখা হিসাব থাকে না বলেই প্রকৃত খবরটা পৌঁছায় না মানুষের কাছে। না, সাধারণ মানুষ নন, যারা দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, তারাও সেই হিসাব রাখার তাগিদ অনুভব করেন না বলেই ওই বন্যা সমস্যা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোনো উচ্চমার্গের কাজ হয় না অনেক বছর ধরেই। অথচ প্রতিবছরই বন্যায় ঘর-বাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব মানুষের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছেই। গত কয়েক বছর ধরে খোদ রাজধানী শহর বানের পানিতে তলিয়ে গিয়ে নাজেহাল মানুষের সর্বনাশের পরিমাণটা ক্রমশ বাড়িয়েই যাচ্ছিল, তার পরও সেই বিষয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বড় ধরনের কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। মাঝখানে অন্তর্বর্তী সরকারের সাড়ে আঠারো মাসের সময়কাল গেল, তখনো এই বিষয়টা নিয়ে ইউনূস সরকারের কোনো কাজ করার খবর পাওয়া যায় না। সেই আঠারো মাস সময়কালটা মানুষ দেখেছে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার উদ্দেশ্য নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অসাধু এক বড় সম্প্রদায় রোজ দিন বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে কী করে রাস্তায় আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়েই যাচ্ছিল। তাই অন্তর্বর্তী সরকার এসব দাবিদাওয়ার মুখে ঠিকমতো কাজ করে যাওয়া কিংবা কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সঠিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। এসব কিছুর পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়ার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই অন্তর্বর্তী সরকারের ওই আঠারো মাস চলে গেল।
বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে মাত্র মাস ছয়েক আগে। সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। বিধ্বস্ত, ঘুণে খাওয়া, ভঙ্গুর একটা অর্থনীতিকে চাঙা করে মানুষের সামনে আশার আলো দেখানোর মতো যোগ্য নেতৃত্বের অভাব থাকা সত্ত্বেও তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর আস্থা যখন কিছুটা হলেও ডালপালা মেলছিল, সেই রকম এক সময়ে জনা কয়েক মানুষের কথাবার্তা এবং কাজ-কারবার দেখে হতাশা গ্রাস করতে শুরু করেছে মানুষের হৃদয়। কেউ কেউ নিজের প্রভাব দেখাতে গিয়ে নিজের জেলা-উপজেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজ পরিবারের সদস্যদের নাম জুড়ে দেওয়ার সাহস দেখাতে গিয়ে যেমন বেকায়দায় পড়েছেন, তেমনি কেউ আবার সকল বিষয়ে নিজেকে সবজান্তা প্রমাণ করতে গিয়ে জাতির সামনে ভিন্ন মাত্রার সমস্যারও জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন। এই সমস্যার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বন্যার ভয়াল গ্রাস, উজানের পানিতে ফি বছর বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তলিয়ে যাওয়া। যদিও বন্যা কোনো বছর বেশি আবার কোনো বছর কম হয়। এবার পরিমাণটা বেশি। বড়লোকদের জায়গা হিসেবে চিহ্নিত রাজধানী ঢাকা শহরের গুলশান এলাকা পর্যন্ত বানের পানিতে তলিয়ে যায়, বাকি নিম্নাঞ্চলের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচটি জেলায় ৪৪ হাজার ৭৯৩ হেক্টর জমির ফসল এবং ৮৪৬টি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এই পাঁচ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে দশ লাখেরও বেশি।
চট্টগ্রাম ছাড়াও ঢাকা, সিলেটসহ প্রায় সব অঞ্চলেই বন্যার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনজীবন। এই অবস্থায় দেশজুড়ে এইচএসসি পরীক্ষা চলছিল। যেহেতু চট্টগ্রাম অঞ্চল বন্যায় অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম বোর্ডের সব জেলায় পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেয়। ঢাকা বোর্ড কিংবা অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিতের কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে যথারীতি পরীক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে বেকায়দায় ফেলে দেওয়া হয় লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে। খোদ রাজধানীর অনেক অঞ্চল বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের বেকায়দায় পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। অনেক পরীক্ষার্থীকে দেখা গেল নৌকায় করে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার চেষ্টা করতে। আবার যাদের নৌকায় করে যাওয়া সম্ভবপর নয়, তাদেরকে জামা-কাপড় পরা অবস্থায় হাঁটু পানি বা কাউকে কোমর পানি মাড়িয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার চেষ্টা করতে দেখা গেল। জীবনের ঝুঁকি ছিল এবার অন্য ধরনের। বানের পানির সঙ্গে ভেসে আসা সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালেও যেতে হয়েছে কাউকে কাউকে। ভেজা জামা-কাপড় গায়ে বেশি সময় জড়িয়ে রাখলে জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই শিক্ষার্থীদের পরিবারের কাছ থেকে পরীক্ষা সাময়িক সময়ের জন্য স্থগিত রাখার দাবি ওঠে।
বিষয়টা যখন সময়ের কারণেই গুরুত্ব পাওয়ার প্রশ্নাতীত একটা ব্যাপার ছিল, খুব স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকেরা আশা করেছিলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় গুরুত্ব দিয়ে সেটা বিবেচনা করবে। তা ছাড়া শিক্ষামন্ত্রী একজন অতি উৎসাহী মানুষ। তিনি নিশ্চয় এই অসুবিধার কথা মাথায় রেখেই পরীক্ষা সাময়িক সময়ের জন্য হলেও স্থগিত রাখার ঘোষণা দেবেন। কিন্তু তিনি এতটাই বালখিল্য এক বক্তব্য দিয়ে উসকে দিলেন পুরো ছাত্রসমাজকে। তাদেরকে ফার্মের মুরগি বলে উপহাসের পাত্র বানিয়ে আরেক কদম এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘সামান্য বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর উঠবে, কত আবদার, একেকটা যেন ফার্মের মুরগি।’
মানুষেরও মাঝে মাঝে ভুল হয়, কিন্তু অতিমানুষেরা কখনো ভুল করে না। না হলে জুলাই বিপ্লবের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে কী করে এতটা দুর্বিনীত হতে পারলেন তিনি? জুলাই বিপ্লবের সময় চৌদ্দশ ছাত্র-জনতা মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে যেখানে কার্পণ্য করেনি, সেই রক্তের বিনিময়ে পাওয়া ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছানোর অহংকার নিয়ে আর যাই হোক এতটা ক্ষমতা না দেখালেই পারতেন এহছানুল হক মিলন।