আমার অনুভূতি অনেক প্রখর। আমি অনেক কিছু আগাম টের পাই। আমি পরিষ্কার দেখতে পাই কী ঘটতে যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারি আমার কতটুকু খারাপ হবে। কতটুকু আমি সাফার করব। সে কারণেও আমি অনেক অঘটন থেকে রেহাই পাই। তার পরও কি আমি সাফার করি না! অনেকই করি। সবাইকেই ভুলের মাশুল দিতে হয়। সেটা কখনো তাৎক্ষণিক, কখনো ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাকে। কেউ জানে না সেটা কখন ঘটবে। কিন্তু ঘটবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। আমি যত ভুল করেছি, তার জন্য যথেষ্ট সাফারও করেছি। ভুল থেকে শিখেছি। আবারও ভুল করেছি। আমি হিউম্যান বিইং বলেই ভুল করি। অনেকে নিজেকে নির্ভুল মনে করে। পারফেক্ট মনে করে। ভাবে, সে যেটা করেছে, সেটাতে কোনো ত্রুটি নেই। সে যেটা বলেছে, সেটাই সঠিক। সেটাকে নড়চড় করা যাবে না। এই ধারণাটা ঠিক নয়। পৃথিবীতে কেউ পারফেক্ট নয়। এই পৃথিবীটাই একটা ইম্পারফেক্ট জায়গা। সেখানে শতভাগ পারফেক্টনেস আশা করা যায় না। অনেক বুদ্ধিমানরা, অনেক ক্ষমতাবানরাও নিজের অজান্তেই ভুল করে। আমি আসলে সবকিছুর জন্য তৈরি থাকি। আগামী দুই বছর পর ঘটতে পারে এমন ঘটনার জন্যও আমার একধরনের পূর্বপ্রস্তুতি থাকে। ভাবি, আমার কতটুকু খারাপ হবে! আমার কি জেল-জরিমানা হবে! আমার কি সম্মান চলে যাবে! আমার কি মৃত্যুদণ্ড হবে! ঘটনার এখানেই তাহলে যবনিকাপাত! এরপর তো আর কিছু নেই! আমাকে কেন্দ্র করে যখন একটা ঘটনা ঘটতে শুরু করে, আমি ঘটতে দিই। শুরুতেই লাগাম পরাতে পারি না। শুরুতেই আমি কাউকে বাতিল করতে পারি না। সেই জোর আমার নেই। তাই আমি ঘটনা দেখি। আমার ক্ষতি মেনে নিয়েই আমি সেটা করি। একটা ভুলের জন্য উভয়ের দায় থাকে। যখন আমি বুঝতে পারি যে আমিও দায়ী, তখন আস্তে আস্তে সেই ভুল থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করি। ভুলটাকে পাহাড়সম উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই না। আমি যেন নিজেকে বলতে পারি, আমি চেষ্টা করেছি। আমি যেন নিজেকে বোঝাতে পারি, আমার ভুলের জন্য আমি অনুতপ্ত। জীবনের সব ক্ষেত্রেই আমি যেন নিজেকে বলতে পারি, অন্যে আমার জন্য যতটুকু করেছে, আমি তার চেয়ে বেশি করেছি।
আমি কখনো কারও কাছে অবলিগেশনে থাকতে চাই না। কেউ আমার কোনো উপকার করলে বা আমি কারও সাহায্য নিলে সেটা আমি কোনো না কোনোভাবে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করি। তবে এটাও ঠিক, ভালোবেসে কেউ কিছু করলে, কেউ কিছু দিলে, সেটার প্রতিদান হয় না। সে চেষ্টাও আমি করি না। এমন কিছু মানুষ থাকে, যাদের কাছে কোনো স্বার্থ থাকে না। তাদের কাছে আমি নিজেকে বিলিয়ে দিই, অকপট হই, নির্ভর করি। তাদের প্রতি আমার এই বিশ্বাস আছে যে তারা কোনো দিন আমার দুর্বলতার সুযোগ নেবে না। জীবনের কোনো অবস্থায়ই সে আমার ক্ষতির চিন্তা করবে না। যেমন আমি করি না। আমাকে দুই চক্ষে দেখতে পারে না, এমন মানুষেরও আমি কখনো ক্ষতি হোক, তা চাই না। আমার কাউকে অপছন্দ হলে আমি তার কাছ থেকে দূরে থাকি, তাকে অ্যাভয়েড করি। এমন মানুষও আছে আমার জীবনে যাদের বলতে পারি, আমার বিপদ হয়েছে, আমাকে বিপদমুক্ত করো। বলতে পারি, তোমার কথার দাম আছে, তোমাকে মানুষ ভ্যালু করে, তুমি আমার জন্য এই কাজটা করে দাও। আমি অল্পতেই সন্তুষ্ট একজন মানুষ। যা পাই, নিজেকে তারই যোগ্য মনে করি। যা পাব না, তার যোগ্য আমি ছিলাম না। জীবনে আমি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি পেয়েছি। এত কিছু পাওয়ার কথা ছিল না। পক্ষান্তরে কেউ যদি আমার কাছে সাহায্য চায়, আমি তার জন্য সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করি। আমার সামান্য চেষ্টায় কারও উপকার হবে, এমন কিছুর জন্য আমি কারও পায়ে ধরতেও দ্বিধা করি না। বিনিময়ে কিছু কখনো চাইব না। কোনোভাবেই সে আমার জন্য প্রতিদানমূলক কিছু না করতে পারে, সে ব্যাপারে আমি সচেতন থাকি। আসলে প্রকৃত ভালোবাসা টের পাওয়া যায়। ফুলের মতো সুবাস ছড়ায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যাদের সঙ্গে চলি, বসি, উঠি, সখ্য করি, খাই, আড্ডা দিই, তার বেশির ভাগই ফেক। দিন শেষে আমরা বুঝতে পারি কে প্রকৃত বন্ধু আর কে না। সুযোগ পেলেই এই মানুষেরা আপনাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলতে দ্বিধা করবে না। তাই মানুষ যেমন আমার কাছে আনন্দ, আবার মানুষই আমার কাছে আতঙ্ক! এই বৈপরীত্য নিয়েই আমাদের জীবন।
আমি কখনো কিছু ভুলি না। আমি কখনো কাউকে ভুলি না। আমার সব মনে থাকে। সব কথা হয়তো লিখি না। কিছু কথা, কিছু স্মৃতি, কিছু আনন্দ, কিছু কান্না, কিছু চোখের জল একান্ত নিজের থাকা উচিত। সেই সব কথা, সেই সব স্মৃতি নিজের মতো করে ভাবার মধ্যেও আনন্দ আছে। একসময় যাদের আপন ভেবেছিলাম, যাদের আপন করেছিলাম, তাদের অনেকেই কোনো এক রহস্যময় কারণে আর আপন থাকেনি। তারা নিজেরাই দূরে সরে গেছে। তারা আর আমাকে আপন ভাবে না, আমি আর তাদের মনের মধ্যে নেই। আমি সেটা টের পাই। আমার অনুভূতি অনেক প্রবল। যারা আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, আমি তাদের প্রতি কোনো অভিমান বা দুঃখ পুষে রাখি না। আমার শুধু জানতে ইচ্ছে করে, কেন তারা আমাকে দূরে সরিয়ে দিল। কিন্তু আমি কখনো কারও কাছে তা জানতে চাইব না। কিছু জিনিস অজানা থাকাই ভালো। একটি সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সবটুকু চেষ্টা আমি করি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করি। সে আবার ফিরে আসুক। আমি নিজ থেকেই যোগাযোগ করি। সম্পর্ক আমার কাছে খুব মূল্যবান। এতে আমি ছোট হয়ে গেছি, তা মনে করি না। আমার চেয়ে বয়সে ছোটদেরও আমি কেয়ার করি। আমার আত্মীয়দের আমি কেয়ার করি, আমার বন্ধুদের কেয়ার করি, প্রতিবেশীদের কেয়ার করি। আমার আত্মসম্মানবোধ খুবই প্রবল। আমি কারও কাছে মাথা নত করতে চাই না। কারণ কারও কাছে আমি কিছু চাই না। আমার অবলিগেশন শুধু ভালোবাসার প্রতি। আমি যেন নিজেকে বলতে পারি, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে আমার কোনো ত্রুটি ছিল না। আমি অনেক ভুল করি। আমি একজন ইম্পারফেক্ট মানুষ। আমার যোগাযোগ একটু খারাপ, সেটা আমি সব সময় স্বীকার করি। কিন্তু আমি কাউকে ভুলি না।
আমাকে সবচেয়ে বেশি দূরে সরিয়ে দিয়েছে আমার আত্মীয়রা। তারা অনেকেই আমাকে আর তাদের একজন মনে করে না। হয়তো দূরে থাকি বলে এমনটা হয়েছে। হয়তো তাদের প্রত্যাশামতো আমি করতে পারিনি বলে এমনটা ঘটছে। যাদের জন্য একসময় অনেক করেছি, তারাও আর আমাকে মনে রাখেনি। কোনো এক অদৃশ্য কারণে তারা আমাকে পর করে দিয়েছে। আমি এসব মেনে নিয়েছি। আমার খারাপ লাগে ঠিকই, কিন্তু আমার কোনো অভিযোগ নেই। জোর করে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। নিজের পরিবারের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে। আমি পরিবারকে অনেক ভ্যালু করি। নিজের সন্তান, স্ত্রী, পারিপার্শ্বিকতাÑএসবের জন্য আমার অনেক সেক্রিফাইস আছে। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও এমনটা হয়। বন্ধু নির্বাচনে আমার ভুল হয়। যাদের খুব আপন ভেবেছি, নির্ভরশীল ভেবেছি, তারা আমাকে আপন ভাবেনি। আবার যাদেরকে অতটা আপন মনে হয়নি, তারাই কার্যত আপন হয়েছে। প্রয়োজনে পাশে দাঁড়িয়েছে। জীবন আসলে খুব রহস্যময়। কে যে কখন কার আপন হবে, কে যে কখন পর হয়ে যায়, বলা কঠিন। তবে বন্ধুরাই আমার বেঁচে থাকার টনিক। তাদের জন্যই আমি সতেজ থাকি, উৎফুল্ল থাকি। তাদের জন্যই ভালোবাসায় বাঁচি। সব সময় তাই ছিল। বন্ধুদের ছোটখাটো ত্রুটি বা স্বার্থপরতাকে আমি ক্ষমা করে দিই। তারাও আমাকে ক্ষমা করে দেয়। কারণ আমিও ভুল করি। বন্ধুত্বে এত হিসাব-নিকাশ চলে না। আমি জানি যাদের সঙ্গে চলি, একসঙ্গে খাই, বেড়াই, এদের সবাই বন্ধু নয়। কেউ কেউ বন্ধু। আমি সব সময় প্রকৃত বন্ধুর সন্ধান করি। আমিও একজন ভালো বন্ধু হয়ে উঠতে চাই। নিঃস্বার্থ এবং নির্ভরশীল। কথায় আছে, পরিচিত হই কোটিক, বন্ধু হই গুটিক। কোথায় হারিয়ে গেল সেই সব সারল্যমাখা দিনগুলো। কত বোকা ছিলাম তখন। সেসব এখন মনে পড়লে হাসি পায়। জীবন যত এগিয়েছে, যত বড় হয়েছি, ততই জীবনের জটিলতা বেড়েছে। চাহিদা বেড়েছে, দাবিদাওয়া বেড়েছে। শৈশবের কোনো কষ্ট, কোনো অভাবই গায়ে লাগেনি। মনে হয়েছে, ওটাই জীবনের অংশ। যাদের সঙ্গে খেলেছি, বন্ধুত্ব করেছি, তাদের কথা মনে পড়ে, খুব মনে পড়ে। কে যে কোথায় হারিয়ে গেল! আর কি কখনো তাদের সঙ্গে দেখা হবে!
আরও একটু বড় যখন হয়েছি, কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে, তখনো কতজনের সঙ্গে সখ্য হয়েছে। অনেক পত্রবন্ধুও ছিল আমার। তাদের প্রায় কারও সঙ্গেই আমার তেমন আর যোগাযোগ নেই। স্কুল-কলেজের বন্ধুরাও কোথায় হারিয়ে গেছে। তখন তো আর সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। একটা চিঠি লিখে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতাম কখন রিপ্লাই আসবে। ডাকপিয়ন সাইকেলের ঘণ্টি বাজিয়ে যখন বাড়িতে ঢুকত, আমি ছুটে যেতাম। ডাকপিয়ন চাচা আমাকে খুব চিনত, বলত, তোমার সাতটা চিঠি আছে আজকে। দিনভর সেইসব চিঠি পড়তাম আর রিপ্লাই দিতাম। পত্রবন্ধুদের কারও সঙ্গেই প্রায় দেখা হয়নি, কিন্তু তা সত্ত্বেও একটা গভীর টান অনুভব করতাম। বগুড়ার মিতা যেদিন লিখল, আমি আমেরিকা চলে যাচ্ছি, সেদিন কষ্টে আমার বুক ভেঙে গিয়েছিল। আমি কেঁদেছিলাম। কোথায় গেল সেই অসাধারণ বন্ধুরা! ফেসবুকে পারু নামের একজন অ্যাড করল আমাকে। লিখল, আমাকে চিনতে পেরেছ! আমি অনেক চেষ্টা করেও তাকে চিনতে পারলাম না। পরে সে আমাকে বলল, আমি তোমার পত্রবন্ধু ছিলাম! এভাবে জীবন থেকে কতজন যে হারিয়ে যায়! আবার ফিরেও আসে। যা হারায়, তা আর ফিরে পাওয়া যায় না! জীবন-যন্ত্রণা আর টানাপোড়েন শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোকে মুছে দিতে কি পারে! পারে না। প্রকৃত জীবন আসলে গল্প-উপন্যাসের মতো নয়। এমনকি ফেসবুকে দেওয়া পোস্টের মতোও নয়। মানুষের জীবনকাহিনি গল্পের চেয়েও ভিন্ন, গল্পের চেয়েও ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ, গল্পের চেয়েও কমপ্লিকেটেড, গল্পের চেয়েও কষ্টের এবং গল্পের চেয়েও নাটকীয়। গল্প-উপন্যাসের বাইরেও আমি প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু লিখি নিজের সম্পর্কে, নিজের চিন্তাচেতনার কথা লিখি, নিজের অতীত জীবনের কথা লিখি, সেই জীবনের পাওয়া-না-পাওয়ার কথা লিখি, নিজের আত্মীয়, বন্ধু, নিজের সন্তান এবং মায়ের কথা লিখি। সেই লেখা পড়ে কেউ মুগ্ধ হয়, ভাবে তার নিজের কথা, কেউবা মনে করে চর্বিতচর্বণ, নতুন কিছু নেই। এসব আমি জানি। তার পরও আমার বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন দরকার। লেখা আছে বলেই এই কষ্টের পৃথিবী, এই আনন্দের পৃথিবী, আবার এই ভুল-বোঝাবুঝির পৃথিবীতে বেঁচে আছি। (চলবে)