বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​প্রসঙ্গ : শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা

​প্রসঙ্গ : শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা

বিজ্ঞাপন
কিছুদিন আগে নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডে আমার এক নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে যাই। সেখানে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে কথা উঠতে আমার এক তরুণ বয়সী আত্মীয় বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহসাই দেশে ফিরতে পারেন বলে জানায়। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত শেখ হাসিনার ফাঁসির দণ্ডের কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দিলে সে জানায়, দেশে ফিরলে তার ফাঁসি কার্যকর হওয়া তো দূরের কথা, তাকে এমনকি কয়েক ঘণ্টার জন্যও কারাগারে যেতে হবে না। বলাবাহুল্য, তার কথা শুনে আমিসহ সেখানে উপস্থিত আরও অনেকে বেশ অবাক হই। বহুসংখ্যক মামলার একজন আসামি সম্পর্কে তার বক্তব্যকে আমার কাছে অনেক হাসিনা সমর্থক ব্যক্তির একজনের অমূলক কল্পনা (Delusional Fantasy) বলে মনে হয়। এহেন বক্তব্যের পেছনে যুক্তি দেখানো হয়, হাসিনার বিচার ইস্যুতে দিল্লির বিদ্যমান মনোভাব এবং ভূরাজনৈতিক কৌশলের কাছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতি স্বীকার করে শেখ হাসিনাকে বিচারের কাঠগড়া থেকে ‘Clean Chit’ দিয়ে রাজনীতি করার তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া তার আর কোনো পথ নেই। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়, যা এখনো বহাল রয়েছে। তার যুক্তি শুনে আমার এই আত্মীয়টি যে ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী অনেকের একজন, তা বুঝতে আর বাকি থাকে না।

সম্প্রতি ভারতের এনডিটিভি এবং ব্রিটেনভিত্তিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এ বছরের ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফেরার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে এই ইস্যুতে বিভিন্ন মিডিয়া ও মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হতে দেখা যায়। মিডিয়ায় এই ঘোষণার প্রচারে ব্যবহৃত কয়েকটি শিরোনাম ছিল এরূপ : ‘হাসিনা ফিরবেন, নাকি প্রত্যর্পণ, নেত্রী নাকি আসামি’, ‘ফিরে আসবেন হাসিনা, তারপর’, ‘আমাকে গ্রেপ্তার বা হত্যা করা হতে পারে, ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে হাসিনা’ ইত্যাদি। মোটকথা, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে একপ্রকার ‘টক অব দ্য টাউন’ হয়ে উঠেছে, বলা যায়।

এর আগেও একবার বাংলাদেশে নিজ দলের জনৈক নেতার সঙ্গে ফোনালাপে শেখ হাসিনা যেকোনো সময় বাংলাদেশে ‘টপ করে ঢুকে’ পড়তে পারেন বলে আভাস দিয়েছিলেন। তার সেই বক্তব্য অবশ্য এবারের মতো এতটা ব্যাপকভাবে চর্চিত হতে দেখা যায়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে সে বছরের ৫ আগস্ট জনরোষ থেকে স্বীয় জীবন বাঁচাতে শেখ হাসিনা ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন। তখন থেকে তিনি সে দেশের সরকারের আতিথ্যে দিল্লির অভিজাত এলাকায় এক বাংলোতে অবস্থান করেন। তথ্যমতে, ওই এলাকায় রাষ্ট্রপতি ভবন, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর রয়েছে। দিল্লি তার জন্য নিñিদ্র নিরাপত্তাসহ তার আরাম-আয়েশে জীবনযাপনের যাবতীয় সুব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে বলে শোনা যায়। এ প্রসঙ্গে নিকট অতীতে ভারত সম্পর্কে শেখ হাসিনার একটি উক্তির কথা মনে পড়ছে। সে সময় তিনি জানান, ভারতকে তিনি যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা (মোংলা বন্দর, আশুগঞ্জ নৌবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ ইত্যাদি) দিয়েছেন, ভারত কখনো তা ভুলতে পারবে না। দিল্লি বিনিময়ে বাংলাদেশকে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ-সুবিধা না দিলেও বাংলাদেশের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও তাকে সর্বোচ্চ সমাদরে আশ্রয়-প্রশয়দানের বিষয়টিকে দিল্লিকে প্রদত্ত তার সুযোগ-সুবিধার প্রতিদান ভাবাটা মোটেও অসংগত হবে না। এটা সর্বজনবিদিত, একজন স্বৈরশাসক সব সময় ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বিপদের কথা মনে রেখে তার Exit Plan আগেভাগেই ঠিক করে রাখেন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তার দিল্লি গমন সেই Exit Plan-এর অংশ মনে করাটা ভুল হবে না।

ইদানীং একশ্রেণির আওয়ামী সমর্থককে লজ্জা ও আত্মসম্মানের মাথা খেয়ে গর্বের সঙ্গে বলতে শোনা যায়, শেখ হাসিনার দিল্লিতে স্থান হয়েছে, কিন্তু পালাতে হলে তারেক রহমানের কোথাও স্থান হবে না। এসব আওয়ামী সমর্থকের জানা উচিত, একজন স্বৈরশাসককেই পালানোর পথ ও আশ্রয়ের খোঁজ করতে হয়, তারেক রহমানের মতো গণতান্ত্রিক নেতার জন্য সে ধরনের স্থানের সন্ধান করা নিষ্প্রয়োজন।
দিল্লির চাপে তারেক রহমানের সরকার শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের চলমান বিচারপ্রক্রিয়া থেকে বিরত হবেন বা ইতিমধ্যে ঘোষিত রায় কার্যকর করা থেকে পিছিয়ে আসবেন, এই চিন্তা ও প্রচার-প্রচারণা অনেকটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অনেকে মনে করেন। এই সরকার দিল্লির অনুগত এবং এর জনভিত্তি নড়বড়ে-জনগণকে এটা বোঝানোই এসব প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য। হাসিনা ও তার দোসরদের বিচার কার্যক্রম নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি দিলে তারা বুঝতে পারবেন, তাদের এ-সংক্রান্ত ধারণা কতটা বাস্তবতাবর্জিত। মন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তা ও প্রত্যয়ের সঙ্গে জানিয়েছেন, দেশে শেখ হাসিনার রাজনীতির পরিসমাপ্তি এবং দিল্লিতে তার কবর হয়েছে। হাসিনার বিচার নিয়ে সরকারের অবস্থান এর থেকে আর বেশি স্পষ্ট করে প্রকাশের অবকাশ রয়েছে বলে মনে হয় না। প্রকৃতপক্ষে, সরকার অপরাধীদের বিচারের পুরো বিষয়টিকে আদালতের ওপর ছেড়ে দিয়েছে এবং এ সম্পর্কে মন্তব্য ও বক্তব্য দিয়ে বিচারাধীন মামলা (Sabjudice) ও বিষয়কে বিতর্কিত করতে আগ্রহী নয় বলেই সরকার এসব বিষয়ে যতটা সম্ভব নীরব থাকাকে শ্রেয় মনে করে, যেটা সরকারের তথ্যমন্ত্রী জহিরউদ্দিন স্বপনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ফুটে উঠতে দেখা যায়। মন্ত্রী জানান, সরকার শেখ হাসিনার বিচারের পুরো বিষয়টি আইনের দৃষ্টিতে দেখছে এবং এ নিয়ে অন্য কোনো ধরনের বক্তব্য ও জল্পনা-কল্পনা নৈরাজ্য সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিচালিত।

উপরে বর্ণিত প্রেক্ষাপটে অনেকের ধারণা, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পেছনে অন্য কোনো গোপন উদ্দেশ্য (Ulterior motive) রয়েছে। উদ্দেশ্য ছাড়া তার দেশে ফেরার ঘোষণা দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। দেশে তার ও দলের বহু নেতার দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে দলের নেতা-কর্মীরা বর্তমানে চরম হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় আছেন। পরিস্থিতির আশু পরিবর্তন না হলে রাজনীতিতে স্বীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তাদের অনেকে অন্য দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলে ভিড়ে যেতে পারেন। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে মেরুকরণের এহেন প্রক্রিয়া শুরু হলে আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ও তার দলের বহুলাংশে অপ্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বহীন হওয়ার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ ধরনের চিন্তা থেকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এসেছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। তার ঘোষণায় সুদিন সমাগত ভেবে দলের নেতা-কর্মীরা গা-ঝাড়া দিয়ে চাঙা হয়ে আরও অধিক সংখ্যায় ঝটিকা মিছিল এবং অন্যবিধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত হবেন, যা প্রকারান্তরে সরকাররের ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তা বিনষ্টের কারণ হয়ে উঠতে সহায়ক হবে।

অতীতে স্বৈরশাসকদের অনেকের কী পরিণতি হয়েছে, সে সম্পর্কে সবাই কমবেশি অবহিত। এসব স্বৈরশাসকের অনেকেই শেখ হাসিনার মতো জুলুম-নির্যাতন, গুম-হত্যা ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০১১ সালে হাইতির স্বৈরশাসক জাঁক্লদ বেবিডক ডুভ্যালিয়ে স্বেচ্ছায় বিদেশ থেকে দেশে ফিরলে বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে বিচারের জন্য তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। পূর্ব ইউরোপের দেশ জর্জিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মিখাইল শ্যাক্সভিল নিজেকে দেশের রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইউক্রেন থেকে দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। উগান্ডার স্বৈরশাসক ইদি আমিন ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রথমে লিবিয়া ও পরে ইরাকে অবস্থানের পর সৌদি আরবে গিয়ে আশ্রয় নেন। ২০০৩ সালে সে দেশে তার মৃত্যু হলে তাকে সে দেশে কবরস্থ করা হয়। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গুম-খুন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। দেশে ফিরলে এসব গুরুতর অভিযোগ থেকে পার পেয়ে তিনি রাজনীতির মঞ্চে পুনরায় রাজকীয় কায়দায় আসন গেড়ে বসতে সক্ষম হবেন, বিষয়টা অতটা সহজ ও কুসুমাস্তীর্ণ না হওয়ারই কথা। শেখ হাসিনা তার দেশে ফেরার ঘোষণায় তাকে ফিরে পেতে দেশের মানুষের আকুতি ও দলের নেতা-কর্মীদের ওপর কথিত জুলুম-নির্যাতনের উল্লেখ করেছেন। এটা সত্যি, দেশের মানুষ তার দেশে ফেরা দেখতে আগ্রহী, তবে সেটা তাকে সাদরে বরণ করে নিতে নয়, বরং আদালত কর্তৃক প্রদত্ত তার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়া দেখতে।

শেখ হাসিনার মিথ্যাচার ও নাটুকেপনা সম্পর্কে অনেকেই মোটামুটি ওয়াকিবহাল আছেন। স্বজন হারানোর ব্যথা বোঝার ভান করে অসংখ্য গুম-খুন করে অন্যদের স্বজনহারা করা, পদত্যাগ করেও পদত্যাগ না করার ঘোষণা, আদৌ নামাজ না পড়ে সকালে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে দিন শুরু, শেখের বেটি পালায় না বলে দেশ ছেড়ে পালানো, পিজি হাসপাতালের পরিচালকের কাছ থেকে ভুয়া সনদ নিয়ে নিজের মেয়েকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চাকরিলাভে সহায়তাÑতার চরিত্রের কোন বৈশিষ্ট্যের পরিচয়বহ, সেটা খোলাসা করে বলার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি না।
লেখক : কলামিস্ট 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz