যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। মঙ্গলবারের (৩ নভেম্বর) এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে।
আগামী জানুয়ারির শুরুতে যে কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হবে, তা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের কংগ্রেসের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন হবে। ওই সময় কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল রিপাবলিকানদের।
ডেমোক্র্যাটরা এখন ট্রাম্পের নীতিগুলো আরও কঠোরভাবে পর্যালোচনা করতে পারবেন এবং তাদের বিরোধিতার মুখে পড়া আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে দিতে পারবেন। তবে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াও প্রেসিডেন্টের হাতে অনেক কিছু করার ক্ষমতা রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজনৈতিক ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে আলোকপাত করেছে আল-জাজিরা।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে বলে স্বীকার করেছেন ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এর একটি কারণ ছিল ইরান। তবে একই সময়ে মানুষ ইরানের বিষয়ে আমি যা করেছি, তার গুরুত্বও বুঝতে পেরেছে।’
মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের প্রত্যাখ্যান করার অন্যতম প্রধান কারণ। ডেমোক্র্যাটরা জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং অভ্যন্তরীণ খাতে সরকারি ব্যয়ের বিষয়টিকে নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ান ট্রাম্প। তিনি এখনো হামলার নির্দেশ দিতে পারেন। তবে নতুন কংগ্রেসের কারণে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
আগামী ১১ ডিসেম্বর বর্তমান সরকারের অর্থায়ন-সংক্রান্ত বিলের মেয়াদ শেষ হলে আইনপ্রণেতারা অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ আটকে দিতে পারেন। এতে সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক বাধা তৈরি হতে পারে।
তবে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সেন্টার অন ইউএস পলিটিকসের গবেষক জেমস বয়েজ বলেন, কংগ্রেস অর্থায়ন বন্ধ করতে চাইলেও বিষয়টি সহজ হবে না। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা মোতায়েন থাকা অবস্থায় এমন পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জটিল হবে। এতে মার্কিন সেনাদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলার অভিযোগ উঠতে পারে।’
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করতে প্রণীত ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন’ ব্যবহার করেও ট্রাম্পকে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। ১৯৭৩ সালের এই ফেডারেল আইন প্রয়োগের আগের প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হয়েছে অথবা কার্যকর ফল দিতে পারেনি।
ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন অনুযায়ী, আসন্ন হামলা প্রতিহত করতে প্রেসিডেন্ট সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন। তবে কংগ্রেস যুদ্ধ ঘোষণা না করলে ৬০ দিনের মধ্যে সেই সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে। এরপর প্রেসিডেন্ট ভেটো দিতে পারেন। আর সেই ভেটো অকার্যকর করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন।
নবনির্বাচিত কংগ্রেসের সম্ভাব্য আসনবণ্টন অনুযায়ী, এই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন থেকে ডেমোক্র্যাটরা অনেক দূরে রয়েছেন।
আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে ইউসিডি ক্লিনটন ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক স্কট লুকাস বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় কংগ্রেসের ক্ষমতা সীমিত থাকবে। তবে নির্বাচনে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোটারদের অসন্তোষের স্পষ্ট বার্তার পর কিছু রিপাবলিকান তার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারেন। তাদের সঙ্গে নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারেন।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কথা উল্লেখ করেন। লুকাস বলেন, ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শুরু থেকেই এই যুদ্ধের বিরোধিতা করে আসছেন।’ গত সপ্তাহে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন ভ্যান্স। এর লক্ষ্য ছিল, আলোচনার পথ আবার চালু করা এবং আরও হামলা এড়ানো।
লুকাস প্রশ্ন তোলেন, ‘এখন কি তিনি যুদ্ধ বন্ধের জন্য আরও জোরালো ভূমিকা নেবেন?’
তবে জেমস বয়েজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে ট্রাম্পকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। ফলে তাকে আর নির্বাচনে লড়তে হবে না। এই পরিস্থিতি প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘জবাবদিহির তোয়াক্কা না করে’ কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন বলে মনে করাতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে তার নীতি আরও কঠোর করতে পারেন। এর মাধ্যমে তিনি নিজের প্রেসিডেন্সির একটি অনস্বীকার্য উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইতে পারেন।’ সূত্র : আল-জাজিরা