বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

নিউইয়র্কের নির্বাচনী লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটদের জয়জয়কার

ফের গভর্নর হলেন ক্যাথি হোকুল, লেফটেন্যান্ট গভর্নর অ্যাড্রিয়েন অ্যাডামস স্টেট কম্পোট্রোলার থমাস পি. ডিনাপোলি, অ্যাটর্নি জেনারেল লেটেশিয়া জেমস
নিউইয়র্কের নির্বাচনী লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটদের জয়জয়কার

উপরে বাঁ থেকে গভর্নর ক্যাথি হোকুল,লে. গভর্নর অ্যাড্রিয়েন অ্যাডামস, কংগ্রেসম্যান গ্রেগরি মিক্স, কংগ্রেসম্যান হাকিম জেফরিস, কংগ্রেসওম্যান গ্রেস মেং, কংগ্রেসওম্যান ওকাসিও কার্টেজ, কংগ্রেসম্যান টম সুজি, কংগ্রেসম্যান ব্র্যাড ল্যান্ডার, রিচি টরেস, কংগ্রেসম্যান নিকোল ম্যালিওটাকিস, অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া ও স্টেট কম্পট্রোলার থমাস ডিনাপোলি

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ব্রুস ব্লেকম্যানকে পরাজিত করে পুনরায় গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট ক্যাথি হোকুল। তাঁর নির্বাচনী সঙ্গী অ্যাড্রিয়েন অ্যাডামস লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে বিজয়ী হয়েছেন। একই সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে লেটিশিয়া জেমস এবং স্টেট কম্পট্রোলার পদে থমাস পি. ডিনাপোলিও পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল ও সংবাদমাধ্যমের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নিউইয়র্কের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের আধিপত্য অক্ষুণ্ন রয়েছে। গভর্নর, অ্যাটর্নি জেনারেল ও কম্পট্রোলার পদে দলটির এই সাফল্য রাজ্যের রাজনীতিতে তাদের শক্তিশালী অবস্থানেরই প্রতিফলন। 
গভর্নর ক্যাথি হোকুলের পুনর্নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিউইয়র্কের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। হোকুল ও অ্যাড্রিয়েন অ্যাডামস রাজ্যের ইতিহাসে প্রথম দুই নারীর সমন্বয়ে গঠিত গভর্নর ও লেফটেন্যান্ট গভর্নর নির্বাচনী জুটি হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন। একই সঙ্গে অ্যাডামস নিউইয়র্কের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী লেফটেন্যান্ট গভর্নর হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
২০২১ সালে অ্যান্ড্রু ক্যুমোর পদত্যাগের পর গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ক্যাথি হোকুল। পরের বছর নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম পূর্ণ মেয়াদ শুরু করেন তিনি। এবারের বিজয়ের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলেন ৬৮ বছর বয়সী এই ডেমোক্র্যাট নেতা।
গভর্নর নির্বাচনে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নাসাউ কাউন্টির নির্বাহী কর্মকর্তা ও রিপাবলিকান নেতা ব্রুস ব্লেকম্যান। নির্বাচনী প্রচারণায় জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসনসংকট, কর, জননিরাপত্তা, অভিবাসন এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে।
হোকুল শিশু পরিচর্যার ব্যয় কমানো, করছাড়, আবাসন ও গণপরিবহনে বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও সাশ্রয়ী করার প্রতিশ্রুতি দেন। অন্যদিকে ব্লেকম্যান কর ও ইউটিলিটি বিল কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেন।
নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্র্যাট ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন হোকুলের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা। 
এদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক ফেডারেল প্রসিকিউটর সারিথা কোমাতিরেড্ডিকে পরাজিত করে তৃতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন লেটিশিয়া জেমস। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, নাগরিক অধিকার, করপোরেট অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি অবস্থানের কারণে তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচিত ব্যক্তিত্ব।
অন্যদিকে স্টেট কম্পট্রোলার পদে রিপাবলিকান প্রার্থী জোসেফ হার্নান্দেজকে পরাজিত করে পঞ্চম পূর্ণ মেয়াদে জয়ী হয়েছেন থমাস পি. ডিনাপোলি। ২০০৭ সাল থেকে দায়িত্ব পালনকারী ডিনাপোলি রাজ্যের সরকারি ব্যয় নিরীক্ষা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং বিশাল সরকারি পেনশন তহবিল তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন। 
কংগ্রেসেও ডেমোক্র্যাটদের শক্ত অবস্থান
নিউইয়র্কের ২৬টি কংগ্রেশনাল আসনের নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটিক পার্টি শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। নির্বাচনের আগে রাজ্যের ২৬টি আসনের মধ্যে ১৯টি ডেমোক্র্যাট এবং সাতটি রিপাবলিকানদের দখলে ছিল। এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেশ কয়েকটি আসনে ডেমোক্র্যাটদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেছে।
বিশেষ করে ১, ১৭, ২১, ২৩ ও ২৪ নম্বর কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের ফলাফল রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব আসনের কয়েকটিতে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে জাতীয় প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
১ নম্বর ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান নিক লালোটা ও ডেমোক্র্যাাট ক্রিস্টোফার গ্যালান্ট, ১৭ নম্বরে রিপাবলিকান মাইক ললার ও ডেমোক্র্যাট কেইট কনলি, ২১ নম্বরে রিপাবলিকান অ্যান্থনি কনস্টান্টিনো ও ডেমোক্র্যাট ব্লেক জেন্ডেবিয়েন, ২৩ নম্বরে রিপাবলিকান নিক ল্যাংওয়ার্দি ও ডেমোক্র্যাট অ্যারন গিস এবং ২৪ নম্বরে রিপাবলিকান ক্লডিয়া টেনি ও ডেমোক্র্যাট অ্যালিসা এলম্যান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
তবে নির্বাচনের রাত পর্যন্ত পাওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে নিউইয়র্কের ২৬টি আসনের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের ২২টি এবং রিপাবলিকানদের মাত্র ৪ আসনে চূড়ান্ত বিজয়ের পথে।
নিউইয়র্ক সিটির কংগ্রেশনাল আসনগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী অবস্থান অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন হাকিম জেফ্রিস, গ্রেস মেং, গ্রেগরি মিকস, ইভেট ক্লার্ক, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ, রিচি টরেস ও টম সুয়োজি। অন্যদিকে স্ট্যাটেন আইল্যান্ড ও ব্রুকলিনের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ১১ নম্বর ডিস্ট্রিক্ট রিপাবলিকানদের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
এবারের নির্বাচনে নিউইয়র্কের ২৬টি কংগ্রেশনাল আসনের পাশাপাশি স্টেট সিনেটের ৬৩টি এবং স্টেট অ্যাসেম্বলির ১৫০টি আসনেও ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে নিউইয়র্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের কোনো আসনে এবার নির্বাচন হয়নি। রাজ্য সিনেট ও ফেডারেল সিনেটের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। 
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। ভোটাররা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এর আগে ২৪ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত অগ্রিম ভোটগ্রহণের সুযোগ ছিল।
নিউইয়র্ক স্টেট বোর্ড অব ইলেকশনের তথ্য অনুযায়ী, অগ্রিম ভোটের সময় প্রায় ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ভোটার সরাসরি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছেন। ডাকযোগে পাঠানো অ্যাবসেন্টি ব্যালট ও অন্যান্য বৈধ ভোট যুক্ত হওয়ার পর চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হবে।
নিউইয়র্কে এবারের নির্বাচন সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটগ্রহণ চলাকালে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন এবং অন্যান্য দৈনন্দিন কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত ছাড়াই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়া রাজ্যের গণতান্ত্রিক নির্বাচনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
নিউইয়র্কের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক, রিপাবলিকান, কনজারভেটিভ ও ওয়ার্কিং ফ্যামিলিজ পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। রাজ্যের নির্বাচনী ব্যবস্থায় একই প্রার্থী একাধিক দলের ব্যালট লাইনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। গভর্নর হোকুলও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পাশাপাশি ওয়ার্কিং ফ্যামিলিজ পার্টির সমর্থন পেয়েছেন।
নিউইয়র্কের ভোটারদের কাছে এবারের নির্বাচনের প্রধান বিবেচ্য বিষয় ছিল ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, বাড়িভাড়া, আবাসনসংকট, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জননিরাপত্তা ও অভিবাসননীতি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ইস্যু মোকাবিলায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সফলতার ওপর আগামী দিনে নিউইয়র্কের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।
গভর্নর ক্যাথি হোকুলের পুনর্নির্বাচন এবং রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের বিজয় নিউইয়র্কে দলটির নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে এই ফলাফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের রাজনৈতিক ও নীতিগত সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে নির্বাচন রাতের ফলাফল এখনো প্রাথমিক। নিউইয়র্ক স্টেট বোর্ড অব ইলেকশনের নিয়ম অনুযায়ী, সব বৈধ ভোট গণনা ও যাচাই শেষে কাউন্টিগুলো ফলাফল প্রত্যয়ন করবে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে।


 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz