শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
নেতানিয়াহুর বিদায়ের সম্ভাবনা জোরালো, গাদি আইজেনকটের পক্ষে ৬৭ এমপির সমর্থন

ইসরায়েলে সরকার গঠনের সমীকরণ পাল্টে দিল আরব দলগুলো

১২০ আসনের পার্লামেন্টে আরব দলগুলোর রেকর্ড ১৯ আসন; দীর্ঘদিনের মিত্রের সমর্থন হারিয়ে চাপে নেতানিয়াহু
ইসরায়েলে সরকার গঠনের সমীকরণ পাল্টে দিল আরব দলগুলো

ছবি সংগৃহীত

বিজ্ঞাপন
ইসরায়েলের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে কোনো পক্ষ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলেও সরকার গঠনের সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে দেশটির আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী জোটের নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রধান দুই আরব রাজনৈতিক জোট।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আরব নেতৃত্বাধীন বৃহত্তম রাজনৈতিক জোট জয়েন্ট লিস্ট ঘোষণা করেছে, নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব আইজেনকটকে দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে আনুষ্ঠানিক সুপারিশ জানাবে তারা।

এর আগে আট আসন পাওয়া আরেক আরব রাজনৈতিক দল রা’আম (ইউনাইটেড আরব লিস্ট) আইজেনকটের পক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে দুই আরব জোটের সম্মিলিত ১৯ আসনের সমর্থনে আইজেনকটের পক্ষে সুপারিশকারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৬৭ জনে। বিপরীতে নেতানিয়াহুর পক্ষে সুপারিশের সংখ্যা ৪৬-এ নেমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি, রয়টার্স এবং ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

নির্বাচনে কার কত আসন

ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন।

২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন চারটি ইহুদি-প্রধান বিরোধী দল সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ৪৮টি আসন।

নির্বাচনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো। দেশটির ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে তারা সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন অর্জন করেছে। এর মধ্যে জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ১১টি এবং রা’আম পেয়েছে আটটি আসন।

ফলে নির্বাচনে কোনো প্রধান জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও আরব দলগুলোর সমর্থন নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নেতানিয়াহুকে ঠেকাতে আরবদের ঐক্য

জয়েন্ট লিস্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারের পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা ঠেকাতেই আইজেনকটকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

দলটির নেতারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের অবস্থান নিয়েও তাঁদের অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে, আরব নাগরিকদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য, রাজনৈতিক বৈষম্য এবং তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতার বিরুদ্ধে বিরোধী নেতৃত্ব যথেষ্ট দৃঢ় অবস্থান নেয়নি বলে অভিযোগ করেছে জয়েন্ট লিস্ট।

তা সত্ত্বেও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে আইজেনকটকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জোটটি।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইসরায়েলের সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় আরব দলগুলোর এই সম্মিলিত অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির মূলধারার ক্ষমতার রাজনীতিতে সীমিত প্রভাব রাখা আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো এবার সরকার গঠনের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দীর্ঘদিনের মিত্রও পাশে নেই নেতানিয়াহুর

নেতানিয়াহুর জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা এসেছে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে) দলের কাছ থেকে।

সাত আসন পাওয়া এই কট্টর ধর্মীয় ইহুদি দলটি আগের পাঁচটি নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুকে সমর্থন করলেও এবার সরকার গঠনের জন্য তাঁকে সুপারিশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে দলটি আইজেনকটকেও সমর্থন দেয়নি।

প্রেসিডেন্ট হারজগের সঙ্গে বৈঠকে দলটির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য তাঁরা কোনো প্রার্থীর নাম সুপারিশ করবেন না।

দলটির সঙ্গে নেতানিয়াহুর বিরোধের অন্যতম কারণ ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতির প্রশ্ন। দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন না হওয়ায় নেতানিয়াহুর ওপর অসন্তুষ্ট দলটির নেতৃত্ব।

ইউটিজের এই সিদ্ধান্তে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

সরকার গঠনের দায়িত্ব কার হাতে

ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ নির্বাচিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা করছেন। সংবিধান ও প্রচলিত রাজনৈতিক রীতি অনুযায়ী, যিনি সরকার গঠনে সবচেয়ে বেশি সক্ষম বলে বিবেচিত হবেন, তাঁকেই প্রথমে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হবে।

দলগুলোর সুপারিশের হিসাবে বর্তমানে আইজেনকট এগিয়ে রয়েছেন। তবে ৬৭ জন সংসদ সদস্যের সুপারিশ পাওয়া এবং ৬১ সদস্যের কার্যকর সরকারি জোট গঠন করা এক বিষয় নয়।

আরব দলগুলো আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারে সরাসরি যোগ দেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বরং আইজেনকট ও তাঁর কয়েকজন রাজনৈতিক মিত্র আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে এসেছেন। ফলে সুপারিশে এগিয়ে থাকলেও তাঁর সামনে জটিল রাজনৈতিক দর-কষাকষি অপেক্ষা করছে।

প্রেসিডেন্ট হারজগকে ১১ নভেম্বরের মধ্যে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য একজন প্রার্থী নির্বাচন করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা প্রথমে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার গঠন সম্ভব না হলে দেশটিতে আবারও নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

কে এই গাদি আইজেনকট

৬৬ বছর বয়সী গাদি আইজেনকট ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান এবং মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির নেতা। দীর্ঘ সামরিক জীবনের পর রাজনীতিতে এসে তিনি নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গঠিত যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তবে যুদ্ধ পরিচালনায় রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালে নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন।

নির্বাচনী প্রচারে জাতীয় ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবার কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে পড়েছেন।

গাজা যুদ্ধ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছে এবারের নির্বাচন।

নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নেতানিয়াহু ও তাঁর সমর্থকদের পক্ষ থেকে বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং অনিয়মের অভিযোগ তোলা হলেও নির্বাচন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভোটের ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এদিকে প্রেসিডেন্ট হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন। নতুন নির্বাচন এড়াতে সব পক্ষকে বাস্তবসম্মত অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন মোড়

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য শুধু নেতানিয়াহুর জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো নয়; বরং সরকার গঠনের ক্ষমতার সমীকরণে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর অভূতপূর্ব উত্থান।

১৯ আসনের সম্মিলিত শক্তি নিয়ে তারা এখন এমন অবস্থানে রয়েছে, যেখানে তাদের সমর্থন উপেক্ষা করে বিকল্প সরকার গঠন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে আইজেনকট সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেই নেতানিয়াহু যুগের অবসান ঘটবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সম্ভাব্য মিত্রদের মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্য, ধর্মীয় দলগুলোর দাবি এবং আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার প্রশ্নে জটিলতা এখনো রয়েছে।

ঠিকানা/এনআই

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz