শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
হরমুজ খুলে দেওয়া, নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ৬০ দিনের রোডম্যাপ

ওয়াশিংটন–তেহরান ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক প্রকাশ

ওয়াশিংটন–তেহরান ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক প্রকাশ

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল আলোচিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর পূর্ণাঙ্গ সরকারি পাঠ প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রশাসন। বুধবার (১৭ জুন) প্রকাশিত ১৪ দফার এই নথিতে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিষ্ক্রিয় করা এবং ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নথি প্রকাশ করে জানান, চুক্তির বিষয়ে ব্যাপক আন্তর্জাতিক আগ্রহ ও বিভিন্ন খসড়া নিয়ে জল্পনা-কল্পনার কারণে এর সরকারি পাঠ প্রকাশ করা হয়েছে। শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্মারকটিতে স্বাক্ষরের পর চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে ৬০ দিনের নিবিড় আলোচনা শুরু হবে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্কের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমঝোতাগুলোর একটি। সাম্প্রতিক সংঘাত, পারস্য উপসাগরে নিরাপত্তা সংকট এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই স্মারক মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। বিশেষ করে লেবানন, সিরিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছে। উভয় পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ কিংবা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকেও বিরত থাকবে।

সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবহন এই জলপথ দিয়ে হয়ে থাকে। নথি অনুযায়ী, ইরান ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও বিনা খরচে চলাচল নিশ্চিত করবে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং সমুদ্রপথে স্বাভাবিক বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করবে।

পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের চেষ্টা করবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন সংযোজন হলো—আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর তত্ত্বাবধানে ইরানের ভেতরেই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে নিম্নমাত্রার উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের একটি প্রধান দাবি ছিল।

অর্থনৈতিক অংশে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানি তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য, ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন খাতে তাৎক্ষণিক ছাড়পত্র দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ইরানের স্থগিত বৈদেশিক সম্পদ ও তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও নথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় এসব সম্পদ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়া হবে।

চুক্তির বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি যৌথ নির্বাহী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গঠনের কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বৈধতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা এই সমঝোতা স্মারককে একটি ‘রাজনৈতিক কাঠামো’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, এর বাইরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আরও কিছু গোপন বোঝাপড়া রয়েছে, যা প্রকাশিত নথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

সমঝোতা স্মারকের ১৪টি মূল পয়েন্ট
১. স্থায়ী যুদ্ধবিরতি
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করবে।

২. শক্তি প্রয়োগ না করার অঙ্গীকার
কোনো পক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, হামলা বা সামরিক হুমকি দেবে না।

৩. লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষা
লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও স্বাধীনতা সম্মান করা হবে।

৪. পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি
দুই দেশ একে অপরের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও স্বাধীনতাকে সম্মান করবে।

৫. অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা
কোনো পক্ষ অপর দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করবে না।

৬. ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি
দুই পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে।

৭. মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার
চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবরোধ প্রত্যাহার শুরু হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে।

৮. মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার
চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হবে।

৯. হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ-চলাচল
ইরান ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও বিনা খরচে চলাচল নিশ্চিত করবে।

১০. হরমুজ প্রশাসন নিয়ে আঞ্চলিক আলোচনা
ওমান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা হবে।

১১. ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদাররা ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে সহায়তার কাঠামো তৈরি করবে।

১২. নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার
জাতিসংঘ, আইএইএ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া হবে।

১৩. পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির অঙ্গীকার
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আইএইএ’র তত্ত্বাবধানে নিষ্ক্রিয় করবে।

১৪. যৌথ তদারকি ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থা
চুক্তি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে যৌথ নির্বাহী কাঠামো গঠন এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্মারক সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে—
* হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে;
* বৈশ্বিক তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে;
* ইরানের ওপর দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ কমবে;
* মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি সংঘাতের মাত্রা হ্রাস পেতে পারে;
* ওয়াশিংটন–তেহরান সম্পর্ক নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত সমঝোতা স্মারকটি মূলত একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। এর সফলতা নির্ভর করবে আগামী ৬০ দিনের আলোচনার অগ্রগতি এবং উভয় পক্ষের বাস্তব পদক্ষেপের ওপর।

ঠিকানা/এসআর

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz