বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

স্পেনে ট্রেন দুর্ঘটনায় ৬৮ জনের মৃত্যু, তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক

দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনকে পেছন থেকে ধাক্কা, নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটির অভিযোগ; তদন্তের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
স্পেনে ট্রেন দুর্ঘটনায় ৬৮ জনের মৃত্যু, তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক

বিজ্ঞাপন
স্পেনের মধ্যাঞ্চলের তোলেদো প্রদেশে দুটি উচ্চগতির ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে উর্দা শহরের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। মর্মান্তিক এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এ শোক পালন করা হবে।

দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় থাকা রোগীও রয়েছেন। দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণ স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলে উচ্চগতির রেল চলাচল ব্যাহত হয়েছে। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে। তদন্তে নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটি কিংবা কারও অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই বছরে দেশটিতে দুটি ভয়াবহ উচ্চগতির রেল দুর্ঘটনার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সানচেজ আরও বলেন, উচ্চগতির রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদার করে যাত্রীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঘটে যাওয়া আগের দুর্ঘটনার সঙ্গে এবারের দুর্ঘটনার কারণের মিল রয়েছে কি না, তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। প্রাথমিকভাবে দুটি ঘটনার কারণ ভিন্ন বলে ধারণা করা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
স্পেনের রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেনফের একটি উচ্চগতির ট্রেন মাদ্রিদ থেকে সেভিলের দিকে যাচ্ছিল। একই পথে সামনে ছিল বেসরকারি রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইরোর আরেকটি উচ্চগতির ট্রেন। কোনো একপর্যায়ে ইরোর ট্রেনটি রেললাইনে থেমে যায়। পরে পেছন থেকে আসা রেনফের ট্রেনটি সেটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে ট্রেনের কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয় এবং বহু যাত্রী হতাহত হন। দুর্ঘটনাটি ঘটে তোলেদো প্রদেশের উর্দা এলাকার কাছে।

স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার আগে রেললাইনের একটি অংশে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থায় কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। এর ফলে সংশ্লিষ্ট রেলপথে ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে ট্রেন পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া হয়।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটির পরও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে রেনফের ট্রেনটিকে স্বাভাবিকভাবে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। অথচ সংশ্লিষ্ট সংকেতে থামার নির্দেশ বহাল ছিল বলে জানিয়েছেন পরিবহনমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের নির্দেশ পাওয়ার পর রেনফের ট্রেনটি প্রায় ২৫ কিলোমিটার অতিক্রম করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইরোর ট্রেনটির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়।

দুর্ঘটনার সময় রেনফের ট্রেনটির প্রকৃত গতি কত ছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তবে ওই রেলপথে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচলের সুযোগ রয়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার পরও কেন ট্রেন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল এবং সংকেতব্যবস্থার নির্দেশনা কীভাবে কার্যকর ছিল—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় এসেছে।

নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
দুর্ঘটনার পর স্পেনের উচ্চগতির রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সিদ্ধান্ত এবং ট্রেন চলাচলের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তের বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর ট্রেন চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকেই নেওয়া হয়েছিল। তবে ওই সিদ্ধান্তের পেছনে কী পরিস্থিতি কাজ করেছিল, সংশ্লিষ্ট কর্মীরা তখন কী তথ্য পেয়েছিলেন এবং নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।

প্রধানমন্ত্রী সানচেজ জানিয়েছেন, তদন্তে কোনো ধরনের অবহেলা বা নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

একই বছরে দ্বিতীয় বড় দুর্ঘটনা
চলতি বছরের জানুয়ারিতেও স্পেনে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ওই দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হন। নয় মাসের ব্যবধানে আবারও উচ্চগতির ট্রেনের সংঘর্ষে বহু মানুষের মৃত্যু দেশটির রেল নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সানচেজ বলেছেন, দুটি দুর্ঘটনার কারণ একই বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি নির্ধারণ করবে স্বাধীন রেল দুর্ঘটনা তদন্ত কমিশন, বিচার বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট রেল কর্তৃপক্ষ। তদন্তের ফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। এ সময়ে সরকারি ভবনসহ নির্ধারিত স্থাপনাগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকার পাশাপাশি রেল চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

ঠিকানা/এসআর

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz