জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটওয়ারীর মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ ক্রমেই বাড়ছে। দলীয় নেতৃত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে দুই নেতার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শামীম হায়দার পাটওয়ারীর নেতৃত্বে নতুন একটি জাতীয় পার্টি গঠিত হতে পারে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি।
দলীয় সূত্রের দাবি, জিএম কাদেরের স্ত্রী ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেরীফা কাদেরের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের অভিযোগও বিরোধ বাড়িয়েছে। দলীয় কর্মসূচিতে শামীম হায়দার পাটওয়ারী ও তাঁর অনুসারীদের উপস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলায় মহাসচিবের সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
চেয়ারম্যানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যও দলের একাংশের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। গণমাধ্যমে জিএম কাদের শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কথা স্বীকার করে তাঁর দেশে ফেরার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। এ বক্তব্যের পর গত ১২ অক্টোবর ঢাকার উত্তরায় তাঁর বাসায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। জিএম কাদেরের দাবি, হামলাকারীরা তাঁকে ‘ভারতীয় এজেন্ট’ আখ্যা দিয়ে সেøাগান দেয়। এসব ঘটনায় দলটির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
শেরীফা কাদের অবশ্য দলের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, জাতীয় সাংস্কৃতিক পার্টির সভাপতি হিসেবে তিনি দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, এ নিয়ে সমালোচনা করা হলে তাঁর কিছু করার নেই। জাতীয় পার্টির অতিরিক্ত মহাসচিব রেজাউল করিম ভূঁইয়া বলেন, দল হিসেবে টিকে থাকাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
শামীম হায়দার পাটওয়ারী চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে মতদ্বৈধের কথা স্বীকার করেছেন। তাকে দল থেকে বাদ দেওয়া হলে নতুন দল গঠন করবেন কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি দেশের বাইরে রয়েছি। আগামী ৩১ অক্টোবর দেশে ফিরে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
বিভক্তির দীর্ঘ ইতিহাস : ১৯৮৬ সালে এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি একসময় দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি ছিল। তবে ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, নির্বাচনী কৌশল ও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দলটিতে একাধিকবার ভাঙন ঘটে। বিভিন্ন সময়ে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, কাজী জাফর আহমেদসহ একাধিক নেতা পৃথক রাজনৈতিক দল বা বলয় গড়ে তোলেন।
২০১৯ সালে এরশাদের মৃত্যুর পর রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরকে কেন্দ্র করে বিরোধ আরও প্রকট হয়। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরেও দলীয় বিভক্তি বাড়ে। ওই বছরের মার্চে রওশনপন্থীরা পৃথক সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেদের নেতৃত্ব ঘোষণা করেন। পরে ২০২৫ সালে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারের নেতৃত্বে আরেকটি অংশ সক্রিয় হয়ে পৃথক কমিটি গঠন করে।
একের পর এক বিভক্তির কারণে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব কমেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। এমন পরিস্থিতিতে মহাসচিব শামীম হায়দার পাটওয়ারী দল ছাড়লে সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাঁর পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ কোন দিকে গড়াবে। দীর্ঘদিনের বিভক্তি কাটিয়ে সাংগঠনিক ঐক্য ফিরিয়ে আনা জাতীয় পার্টির জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন করে ভাঙন ঘটলে দলটির রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।




