বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশ

গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশ

বিজ্ঞাপন
দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা গত ১৫ সেপ্টেম্বর স্টকহোমভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স’-এর বার্ষিক যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে, ‘বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের মূল সূচকগুলো গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তার মধ্যে আবার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশেই গণতন্ত্রের মূল সূচকগুলোতে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন ঘটেছে।’

দ্য গার্ডিয়ানের এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ঠিকানা তার ১৬ সেপ্টেম্বর সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায়। শিরোনাম হয়েছে, ‘দেশে গণতন্ত্রের সূচকে বড় পরিবর্তন’। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর ৩টি সূচকে পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়। বিশেষ করে, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, নির্বাচিত সরকার এবং কার্যকর সংসদ এ ক্ষেত্রে দারুণভাবে কেবল প্রশ্নবিদ্ধই হয় না; এ তিনটি ক্ষেত্রে মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় দাঁড়ায়। সেই সঙ্গে এ কথাও প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন নিয়ে সম্প্রতি যে পরিস্থিতি লক্ষ করা যায়—তার প্রভাবও রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর গণতন্ত্র চর্চায়।

নির্বাচন গণতন্ত্রের একমাত্র সূচক না হলেও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনসহ বিশ্বের বড় বড় সকল রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করেন, যেসব রাষ্ট্রে প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র ক্রিয়াশীল থাকে, সেসব রাষ্ট্রে মানবিক অন্যান্য সূচকেও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দ্বার খোলা থাকে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র সর্বাধিক উচ্চারিত শব্দ হলেও যেসব বৈশিষ্ট্য দিয়ে গণতন্ত্রকে বুঝতে বা অনুভব করতে পারা যায়, তার সবই থাকে প্রায় অনুপস্থিত। বাংলাদেশে সরকারবিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দল, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ এমনকি সাধারণ মানুষ যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত, তারা পর্যন্ত গণতন্ত্রের কথা বলবে, গণতন্ত্র নিয়ে টেবিল চাপড়াবে, গণতন্ত্র-গণতন্ত্র বলে দিনরাত গলা ফাটাবে, কিন্তু রাষ্ট্রে-সমাজে কোথাও গণতন্ত্রের দেখা মিলবে না।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের এই অবনয়নের কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পক্ষে নিজস্ব কোনো কর্মসূচি না থাকা। শুধু গণতন্ত্র শক্তিশালী করা নয়, জনকল্যাণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সব দলই গণতন্ত্রের মতো অহরহ জনকল্যাণের কথা জপ করে। জনগণই রাষ্ট্রের মালিক—এ কথাও রাজনীতিবিদদের মুখে সব সময় শোনা যায়। কিন্তু দিন শেষে না গণতন্ত্রের দেখা মেলে, না জনগণের আস্থায় কোনো কাজ করা হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা একটি কাজ খুব নিষ্ঠার সঙ্গে করে থাকেন। সেটিই যেন তাদের নিজ নিজ দলের একমাত্র কর্মসূচি। সেটিই যেন তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি। সবচেয়ে বড় কথা, মনে হবে, সেটিই তাদের গণতন্ত্র, সেটিই তাদের জনকল্যাণ-ভাবনা। রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীরা নিজেদের কর্মসূচি নিয়ে কাজ করে না—তাদের নিজ নিজ দলের নির্দিষ্ট কোনো কর্মসূচি আছে বলেও মনে হয় না। তাদের গণতন্ত্র চর্চা অন্য দলের সমালোচনা, কুৎসা রটনা এবং অভিযুক্ত করার মধ্যেই সীমিত। ক্ষমতাসীনরা আরও একটি কাজ খুব নিষ্ঠার সঙ্গে করে থাকেন। দেশের মধ্যে খুন, রাহাজানি, সন্ত্রাস, ঘুষ, দুর্নীতির কথা উঠলে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতরা সেই সব অপরাধমূলক কাজ দমন বা প্রতিহত না করে, অন্য দেশেও এসব কাজ অহরহ ঘটার উদাহরণ টেনে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এসব দেশের গণতন্ত্র চর্চা এবং অন্যান্য জনহিতকর কাজ অনুসরণ করতে চান না।

অথচ বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে যে চারটি মূল স্তম্ভ রয়েছে, তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভই হচ্ছে গণতন্ত্র। যার বেদিমূলে ৩০ লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। ২ লাখের অধিক মা-বোন দখলদার বাহিনীর লালসার শিকার হয়েছেন। সেসব আমরা বিস্মৃত হয়েছি। দেশে আজ গণতন্ত্রহীনতার যে চর্চা চলছে, তার জন্য কমবেশি সবাই দায়ী থাকলেও তা থেকে বের হয়ে আসার দায়িত্ব সরকারের সব থেকে বেশি। স্বাধীন বাংলাদেশে বর্তমানে সেই কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের দেখা মেলে না। তার স্থলে এখন মব তন্ত্র এবং কথায় কথায় ফ্যাসিবাদের দোসর ট্যাগ লাগিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও নাজুক অবস্থার দিকে ঠেলে দিতে দেখা যাচ্ছে।

এসব নেতিবাচকতা মুক্ত হয়ে প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চা এবং দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করার কিছু বিধানও রয়েছে প্রতিবেদনটিতে। বলা হয়েছে, প্রকৃত গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর দেশকে দাঁড় করার জন্য কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন যথেষ্ট হবে না। অতীতে এর উদাহরণ অনেক রয়েছে। এ জন্য জরুরি আইনের শাসন, সকল ক্ষেত্রে সকল কর্মে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকারের ভিত মজবুত করা। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সূচক স্থায়ীভাবে উন্নত করা সম্ভব বলে প্রতিবেদনটির উপসংহার টানা হয়েছে। সবই নির্ভর করে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছার ওপর। যত দিন দোষারোপের রাজনীতি চলবে, মব সংস্কৃতি এবং ট্যাগের রাজনীতি থেকে দেশ মুক্ত না হবে—তত দিন গণতন্ত্র-গণতন্ত্র বলে কেবল চিৎকারই শোনা যাবে, দুষ্ট রাজনীতির চক্র থেকে গণতন্ত্রের মুক্তি মিলবে না।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz