শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

বিশ্বকাপ উন্মাদনা: উদযাপন হোক, অন্ধ সমর্থন নয়

বিশ্বকাপ উন্মাদনা: উদযাপন হোক, অন্ধ সমর্থন নয়

বিজ্ঞাপন
অবশেষে শেষ হলো অপেক্ষার প্রহর। শুরু হয়ে গেছে ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে পর্দা উঠেছে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের। এবারই প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—যৌথভাবে আয়োজন করছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই প্রতিযোগিতা।

১২ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত হবে মোট ১০৪টি ম্যাচ। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি, মেক্সিকোর তিনটি এবং কানাডার দুটি শহরে খেলা হবে। ৪৮টি দলকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি গ্রুপে। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল এবং সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দল জায়গা করে নেবে নতুন সম্প্রসারিত ৩২ দলের নকআউট পর্বে।

বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টায় মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অংশ না নিলেও দেশের ফুটবলপ্রেমীদের উচ্ছ্বাসে তার কোনো ঘাটতি নেই। বরং অনেক সময় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সমর্থকদের চেয়েও বেশি আবেগ নিয়ে বিশ্বকাপ উদযাপন করেন বাংলাদেশের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চায়ের আড্ডা, বাজার, রেস্তোরাঁ—সবখানেই এখন বিশ্বকাপের আলোচনা।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের তর্ক, জার্মানি না পর্তুগাল, ফ্রান্স না স্পেন—এমন নানা বিতর্কে মেতে উঠেছেন ফুটবলপাগল বাঙালিরা। অথচ যেসব দেশের মানুষ মাঠে তাদের জাতীয় দলকে সমর্থন করছে, তাদের তুলনায় অনেক বাংলাদেশি সমর্থকই যেন বেশি আবেগপ্রবণ।

এটি একদিকে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমের প্রমাণ, অন্যদিকে কিছু প্রশ্নও তৈরি করে।

ফুটবল নিঃসন্দেহে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে এই খেলা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক মিলনমেলার জন্ম দেয়। এ কারণেই বিশ্বকাপকে বলা হয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’।

অলিম্পিকের পর এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় ক্রীড়া আয়োজন। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ টেলিভিশন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মিলিয়ে পাঁচ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ দেখেছেন।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বৈশ্বিক উৎসবে বাংলাদেশ এখনও কেবল দর্শক। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশ কখনও বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলতে পারেনি। এশিয়ার শীর্ষ ফুটবল শক্তিগুলোর মধ্যেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি দেশটি।

বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়েও বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। ফলে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন এখনো বাস্তবতার চেয়ে আবেগের কাছাকাছি অবস্থান করছে।

তবু বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম থেমে নেই। কেউ ব্রাজিলের, কেউ আর্জেন্টিনার, আবার কেউ স্পেন, জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা পর্তুগালের সমর্থক। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার অনেক আগ থেকেই পোস্টার, জার্সি, পতাকা আর তর্ক-বিতর্কে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।

সমস্যা সমর্থনে নয়, সমস্যার শুরু অন্ধ আবেগে। যে কেউ তার পছন্দের দলকে সমর্থন করতেই পারেন। খেলাধুলার সৌন্দর্যই হলো মতের ভিন্নতা। কিন্তু যখন সমর্থন অন্ধ উন্মাদনায় পরিণত হয়, তখন তা আনন্দের বদলে বিভাজন সৃষ্টি করে।

বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের বিভিন্ন ছাদে, মাঠে কিংবা সড়কে দেখা যায় বিশালাকৃতির ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকা। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কর্মরত আর্জেন্টাইন কোচ ডিয়েগো আন্দ্রেস ক্রুসিয়ানি এবং ফিটনেস প্রশিক্ষক ভিক্টর এরিয়েল কোলম্যান এসব দৃশ্য দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন।

তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের পতাকা সংস্কৃতির খবর আর্জেন্টিনার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

জার্মান পতাকার জন্য কৃষকের জমি বিক্রি
২০২২ সালের বিশ্বকাপে জার্মানির সমর্থক মাগুরার কৃষক আমজাদ হোসেন শত শত ফুট দীর্ঘ জার্মান পতাকা তৈরি করে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসেন।

২০২৬ বিশ্বকাপ উপলক্ষে তিনি এবার তৈরি করেছেন সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মান পতাকা। এ জন্য তিনি নিজের জমি বিক্রি করেছেন। বুধবার মাগুরা সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তিনি পতাকাটি প্রদর্শন করেন।

পতাকা দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মানুষ সেখানে ভিড় করেন। প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে তৈরি এই পতাকার জন্য আমজাদ ১০ শতক কৃষিজমি বিক্রি করেছেন। এর আগেও ২০১৪ বিশ্বকাপের আগে সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা তৈরির জন্য জমি বিক্রি করেছিলেন তিনি।

আমজাদের ভাষ্য, জার্মানি বিশ্বকাপ জিতলে তিনি আরও বড় আয়োজন করবেন। ২০৩০ বিশ্বকাপের জন্য বর্তমান পতাকার তিনগুণ বড় পতাকা তৈরিরও পরিকল্পনা রয়েছে তার।

তার মতে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম তুলে ধরা সম্ভব।

‘মেসি সুমন’ ও তার আলবিসেলেস্তে ভ্যান
বিশ্বকাপের প্রথম বাঁশি বাজতে এখনও বাকি, অথচ ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উৎসব ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

পৌর শহরের এক প্রান্তে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ছোট্ট একটি ঘর নীল-সাদা পতাকায় সাজিয়েছেন ফুটবলপ্রেমী সুমন গৌর, যিনি এলাকায় ‘মেসি সুমন’ নামে পরিচিত।

পেশায় ভ্যানচালক সুমন অর্থকষ্ট ও ঋণের চাপের মধ্যেও প্রিয় দল আর্জেন্টিনা এবং তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসিকে ঘিরে প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি স্ত্রীর নামে নেওয়া ৫০ হাজার টাকার একটি ক্ষুদ্রঋণের অংশ বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে ব্যয় করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে তার খরচের পরিকল্পনা প্রায় এক লাখ টাকা।

ঈশ্বরগঞ্জের বিভিন্ন সড়ক ও মোড়ে ইতোমধ্যে উড়ছে শত শত আর্জেন্টিনার পতাকা। স্থানীয়দের মতে, এসব আয়োজনের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে সুমনের।

নিজের ঘর, দেয়াল, এমনকি জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ভ্যানটিকেও তিনি সাজিয়েছেন আর্জেন্টিনার রঙে।

সুমনের ভাষায়, “বিশ্বকাপ এলেই মনে হয় আমার নিজের উৎসব শুরু হয়েছে। মেসি আর আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা আলাদা।”

প্রতিবেশীরা জানান, বিশ্বকাপের সময় সুমনের বাড়ি যেন একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তার সাজসজ্জা দেখতে আসে।

১০ লিটার দুধ দিয়ে গোসল করে দল পরিবর্তন
বিশ্বকাপকে ঘিরে এবারও দেখা যাচ্ছে বিচিত্র সব ঘটনা। ময়মনসিংহের শেরপুরে এক আর্জেন্টিনা সমর্থক ১০ লিটার দুধ দিয়ে গোসল করে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রাজিলের সমর্থক হয়ে যান।

ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক কৌতূহল ও হাস্যরসের জন্ম দেয়।

স্থানীয়দের মতে, শিবু নামের ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিলেন। সোমবার রাতে তিনি ৮০ টাকা লিটার দরে কেনা ১০ লিটার দুধ দিয়ে গোসল করেন। এরপর সবার সামনে আর্জেন্টিনার জার্সি খুলে ব্রাজিলের জার্সি পরেন।

অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পতাকা টানাতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কিংবা গাছ ও ছাদ থেকে পড়ে প্রাণহানির খবর প্রায়ই শোনা যায়।

বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপ মৌসুমে পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা দুর্ঘটনায় পড়ে বাংলাদেশে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সমর্থনের মূল্য কত?
গবেষণা বলছে, ২০২২ সালের বিশ্বকাপে এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি ছিল। শুধু পতাকা টানাতে গিয়ে অন্তত সাতজন প্রাণ হারিয়েছিলেন।

গত ৯ জুন মানিকগঞ্জ সদরে ব্রাজিলের পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান ২০ বছর বয়সী ফয়সাল হোসেন।

পুলিশ জানায়, ফয়সাল একটি পেট্রলপাম্পের পাশে আমগাছে উঠে পতাকা লাগানোর সময় বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে আসেন এবং নিচে পড়ে যান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশাল পতাকা তৈরির প্রতিযোগিতা এখন বিশ্বকাপ সংস্কৃতির এক অলিখিত অংশ হয়ে গেছে। কেউ হাজার, কেউ লাখ লাখ টাকা ব্যয় করছেন প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন প্রকাশে।

কোথাও রাস্তা সাজানো হচ্ছে, কোথাও বাড়িঘর রঙ করা হচ্ছে প্রিয় দলের রঙে। অথচ দেশের বহু পরিবার এখনও নিত্যদিনের জীবনসংগ্রামে লড়ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুল ব্যয়ের কতটুকু বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নে কাজে লাগে? পতাকা, ব্যানার, জার্সি ও উৎসবের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার সামান্য অংশও যদি স্থানীয় ফুটবলের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা যেত, তাহলে দেশের ফুটবল অনেক দূর এগোতে পারত।

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদেশি দলের সমর্থন অনেক সময় সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। বন্ধু, প্রতিবেশী, এমনকি আত্মীয়দের মধ্যেও তর্ক থেকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অতীতে এ নিয়ে মারামারি, আহত হওয়া, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

একটি খেলা নিয়ে এমন শত্রুতা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বিস্ময়কর বিষয় হলো, যেসব বিদেশি ফুটবলারের জন্য এত আবেগ, তাদের অনেকেই বাংলাদেশ সম্পর্কে খুব কম জানেন। কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার বাংলাদেশ সম্পর্কে সীমিত জ্ঞানের বিষয়টি একসময় আলোচিত হয়েছিল।

এখনও অধিকাংশ ব্রাজিলিয়ান বা আর্জেন্টাইন ফুটবলার বাংলাদেশ সম্পর্কে তেমন জানেন না। অথচ তাদের সমর্থন করতে গিয়ে অনেক সময় আমরা নিজেদের বাস্তবতা ও পরিচয় ভুলে যাই।

বিশ্বকাপের প্রকৃত শিক্ষা হওয়া উচিত বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি এবং আনন্দ ভাগাভাগি করা। খেলাধুলার সৌন্দর্য প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করার মধ্যে নয়, ভিন্ন মতকে সম্মান করার মধ্যে।

ফুটবলকে ফুটবল হিসেবেই দেখা উচিত। জয়-পরাজয় থাকবে, উত্থান-পতন থাকবে; কিন্তু সেগুলো কখনো সম্পর্ক নষ্টের কারণ হতে পারে না।

বাংলাদেশের মানুষ ফুটবল ভালোবাসে—এটাই আমাদের শক্তি। এই আবেগ যদি স্থানীয় ফুটবলের উন্নয়ন, নতুন খেলোয়াড় তৈরির উদ্যোগ এবং ক্রীড়া সংস্কৃতি গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করা যায়, তাহলে একদিন বাংলাদেশ বিশ্বকাপে শুধু দর্শক নয়, প্রতিযোগী হিসেবেও অংশ নিতে পারবে।

আসুন, আমরা বিশ্বকাপ উপভোগ করি, প্রিয় দলকে সমর্থন করি; তবে অন্ধ আবেগ দিয়ে নয়। উৎসব করি, বিভাজন নয়। তাহলেই বিশ্বকাপ সত্যিকারের আনন্দের উৎসবে পরিণত হবে এবং বাংলাদেশ পরিচিত হবে দায়িত্বশীল ও প্রাণবন্ত ফুটবলপ্রেমী জাতি হিসেবে।
লেখক: সাংবাদিক

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz