রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ :
• তাহসিফের কথিত ‘বান্ধবী’ দিশার সাত দিনের রিমান্ডে চাইল পুলিশ • বিক্ষোভ করা শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করল পুলিশ, যান চলাচল স্বাভাবিক • আলোচিত নিকি মিনাজকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি করতে চান  ট্রাম্প • তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার বারে যাওয়া সেই তরুণী গ্রেপ্তার • পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন নির্ধারণে মজুরি বোর্ড ঘোষণা • দেশের যুবশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান রাষ্ট্রপতির • পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভে ৫ মেট্রোস্টেশন বন্ধ • ইরানে ফের হামলার প্রস্তুতির মধ্যে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ফোনালাপ • ডাবের পানি সবার জন্য সমানভাবে উপকারী নয় • ইয়েমেনে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ৬ হাজার অন্তঃসত্ত্বা, নতুন বাস্তুচ্যুত ৩ লাখ

রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​আল মুজাহিদী এক বহুমাত্রিক কবি

​আল মুজাহিদী এক বহুমাত্রিক কবি

বিজ্ঞাপন
ছয় ফুট লম্বা এক বাগ্মী পুরুষের পাশে হাঁটা সত্যি খুব মুশকিল হচ্ছিল। কাঁধে খাদি কাপড়ের ব্যাগ। পরনে পাঞ্জাবি, পায়জামা, পায়ে স্যান্ডেল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। হাঁটছেন আর আমাকে সম্বোধন করে বলছেন- ‘বুঝলে আশরাফ আমার এই লম্বা পা দুটো মহামূল্যবান অঙ্গ। ষাটের দশকের উত্তাল দিনগুলোতে এই পা দুটোই ছিল সংগ্রামে অংশ নেওয়ার প্রধান বাহন।’

২০১৬ সালের মে/জুনের কথা, আমার বাসায় এসেছিলেন তিনি। এর আগে প্রথম তার সাথে আমার দেখা হয় দৈনিক ইত্তেফাক অফিসে, টিকাটুলিতে। রাহাত খানের পূর্বানুমতি নিয়ে আমি পত্রিকা অফিসে যাই। উল্লেখ্য, রাহাত খান তখন দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং আল মুজাহিদী সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক।

২০০৮ সালের ১৮ নভেম্বর আমি আল মুজাহিদীদের দেখা পাই। স্পষ্ট মনে আছে, প্রায় ৪০ মিনিট কোনো কথাই বলছিলেন না তিনি। আমিও চুপচাপ বসে আছি। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে অবশেষে তিনি বললেন, ‘বলুন?’

সাহস নিয়ে বললাম- ‘জলপাই রঙ বেয়াড়া গাড়ি’ নিয়ে যদি একটু কথা বলতেন। কবিতাটি ১৯৮৫ সালের মে মাসের ২৪ তারিখ ইত্তেফাক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে প্রথম প্রকাশ হয়। তিনি আবার চুপ হয়ে গেলেন।

বাংলা সাহিত্যের ষাট এবং সত্তরের দশকের কবিদের মধ্যে ইতোমধ্যে প্রথম সারির একজন কবি তিনি। দেশভাগের পর সিকানদর আবুজাফর, আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, সৈয়দ আলী আহসান, আল মাহমুদ, শিহাব সরকার, সৈয়দ হায়দার, রফিক আজাদ, নয়ীম গহর, আলাউদ্দিন আল আজাদ, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রমুখ কবি ইত্তেফাকের সাহিত্য সাময়িকীতে নিয়মিত কবিতা লিখতেন। আল মুজাহিদীও তাদের সমগোত্রীয় এবং লিখতেন সচেতন চেতনায়। উল্লিখিত কবিদের মধ্যে একটা স্বতন্ত্র ধারা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তার কবিতায় ইতিহাস, ঐতিহ্য যেমন ওঠে এসেছে অবলীলায়, তেমনি মৃত্তিকাজাত মানুষও ঠাঁই পেয়েছে অকপটে।
১৯৮৪ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৪ তারিখ এই পাতায় তিনি লেখেন ‘দূত পারাবাত’ নামক কবিতাটি। ‘সোনালী ঈগল’ কবিতাটি লেখেন ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এ ছাড়া ‘সশস্ত্র ঈশ্বর’ কবিতাটি লেখেন আশির দশকের শেষের দিকে। এই কবিতায় একবিংশ শতাব্দির পৃথিবীর এক রূপরেখা অংকনের চেষ্টা করেন কবি। বিশাল এ কবিতায় দু’টি পক্ষ দাঁড় করান তিনি। এক পক্ষে কবির নিরস্ত্র শব্দাবলী, অপর পক্ষে সশস্ত্র ঈশ্বর। কবির শব্দাবলী নিরীহ। সহজ সুন্দর পৃথিবী রচনার উদগ্রীব, অপরদিকে ঈশ্বর তার অস্ত্রের অভিসম্পাতে ধ্বংস করে চলছে সবকিছু। ভাঙা-গড়ার এই দোলাচলবৃত্তির মাঝখান থেকেই গড়ে ওঠবে নতুন পৃথিবী।

এক মহাকাব্যিক দ্যোতনায় রঞ্জিত ‘জলপাই রঙের বেয়াড়া’ কবিতাটি। বিশাল অবয়বের এ কবিতায় ওঠে এসেছে হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদির কথা। কবি সঞ্চরমান, কালের পীঠে চড়ে তিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন পৃথবীময়। তাই তার চেতনায় ওঠে এসেছে ব্যবলনপর কথা-আরাকানের কথা। কবিতার শুরুতে আছে যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা। কবির আশঙ্কা সামরিক পরিবহনে পিষ্ট তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, তাঁর প্রাণনিঃসৃত পাণ্ডুলিপি-
‘জলপাই রঙের পেয়ারা গাড়িটার নিচে/আমার পুরনো পাণ্ডুলিপি’- এই পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণে দৃঢ় সংকল্প কবি। তিনি এখান থেকে জেনেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা, দেশ বিভাগের কথা, মন্বন্তরের কথা। কবি জেনেছেন সকাল দুপুর রাত্রি অষ্টপ্রহর তার জাতির উপর অত্যাচারের কথা। কিন্তু হতবিহ্বল নন কবি। বলে ওঠেন- ‘আমি ওঠে দাঁড়ালাম/মাতৃ গহ্বর থেকে ওঠে দাঁড়ালাম শিরদাঁড়া টান করে।’

তার চলার শেষ নেই। যতদিন না তিনি শ্রান্তি পাচ্ছেন, পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করতে সক্ষম হচ্ছেন; ততদিন চলবে তার জঙ্গম পরিভ্রমণ। সেদিন দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল তার সঙ্গে। এরপর দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকায় চলে গেলেন তিনি। কথা হলো। দেখা হলো। এই সূত্রেই পারিবারিক আলাপচারিতা। এর পর করোনা। দীর্ঘ বিরতি। আর হলো না দেখা। হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা মুজাহিদ ভাই।

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

 
© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz