জন পিউরীফিকেশন, তিনি আমার বাবা। তিনি ছিলেন নিতান্তই একজন সহজ, সরল, নির্বিবাদী প্রাণবন্ত মানুষ। ১৩ জুলাই তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৭ সালে মাত্র ৬০ বছর বয়সে তিনি আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে যান।
একজন সদালাপী, বন্ধুবৎসল এবং নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ হিসেবে আমার বাবাকে দেখেছি। সহজেই তিনি মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন। তাঁকে মানুষের সঙ্গে রাগ করতে দেখিনি। কোনো সমালোচনা, কটূক্তি করতেও শুনিনি। ঠান্ডা মাথায় প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে দেখেছি তাঁকে। আমাদের পরিবারেও তেমন রাগ-অভিমান করতে দেখিনি। অনেকেই বাবাকে ‘পাদ্রি’ বলতেন। তবে তাঁর আদর-শাসন ছিল সময়োপযোগী। তাই বাবাকে যেমন সমীহ করতাম, ভয়ও পেতাম তেমনই। কাজ থেকে ছুটির অবসরে গ্রামের বাড়িতে এলেই আমি তাঁর শাসনের আওতায় একরকম অবরুদ্ধ হয়ে পড়তাম। তাই বাবা যেদিন বাড়ি আসতেন, সেদিনই মাকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘বাবা ঢাকায় যাবেন কবে? বা কত দিনের জন্য বাড়ি এসেছেন?’ মা আমাকে বলতেন, ‘আমি তো জানি না! তুমিই তাঁকে জিজ্ঞেস করো গিয়ে।’ মনে পড়ে, বাড়িতে বাবার উপস্থিতিতে যথেচ্ছ খেলাধুলা, ঘুড়ি নিয়ে রোদে দৌড়াদৌড়ি, মার্বেল, ডাংগুলি, হাডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধা ইত্যাদি খেলায় গ্রামের সাথিদের সঙ্গে মশগুল হয়ে দিনভর চিৎকার-চেঁচামেচি করা একেবারেই সীমিত হয়ে পড়ত। একসঙ্গে দুপুরে ভাত খেতে বসলে আমি মনে মনে ভাবতাম, বাবা নিশ্চয় কিছু বলবেন এবার এবং ঠিক তা-ই। বাবা বলতেন, ‘ভাত খেয়ে ঘুমাবি।’ তখন আমি অপ্রস্তুত হয়ে পড়তাম। দুপুরের খাবারের পর বাবার বিছানার পাশেই গিয়ে আমাকেও গা এলিয়ে দিতে হতো। মনে পড়ে, একদিন চুপিসারে উঠে যেই দাঁড়িয়েছি, বাবার গলার মোটা স্বর, ‘কোথায় যাচ্ছিস?’ আমি ‘হিসু করতে’ বলেই দিয়েছিলাম দৌড়! ওদিকে আমার সাথি অপেক্ষা করছে আমার জন্য। একবার শখের বশে ‘দাঁত শক্ত করার’ লোভে সিগারেটে টান দেওয়ার অপরাধে রুদ্ধদ্বার ঘরে বাবার হাতের কাঁচা কঞ্চির বাড়ির কথা এখনো ভুলতে পারি না। বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে আমার ঠাকুরমার (দাদির) বিনীত ও সকরুণ আর্জি, ‘জনরে, আমার জাদুরে আর মারিস না! ওর ভুল হয়েছে। এমন আর করবে না!’ সেই থেকে সিগারেটের দিকে আর ফিরেও তাকাইনি। এখন সিগারেটের গন্ধও সহ্য করতে পারি না। ধূমপায়ীদের বরাবরই এড়িয়ে চলি। তাদের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করি। বাবা তাস খেলা পছন্দ করতেন না। তাই আমাকে কড়া নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তাস খেলে অনেকের মতো আমি যেন পড়াশোনার বারোটা বাজিয়ে না দিই!’ আমিও আমার অনেক বন্ধু-সাথিদের বেলায় দেখেছি, উঠতি বয়সে তারা সিগারেট ধরেছে। তারা ‘বাংলা’ও (চোলাই মদ) সেবন করত। রাত জেগে এমনকি স্কুল পালিয়ে জঙ্গলে বসে তাস খেলায় মত্ত হয়েছে। এই তাদের অনেকেই উচ্চবিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হতে পারেনি। সে সময় আমাদের গ্রাম থেকে আমার মতো আরেক অগ্রজ ভাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমার এলাকার অন্য সঙ্গীরা তা পারেনি।
তখন এসব বিষয় নিয়ে বাবার ওপর রাগও হতো। বস্তুত শুধু বাবাই নন, তাঁর অবর্তমানে আমার মা ও ঠাকুরমার (দাদির) শাসনের বেড়াজালে সর্বদাই আমি ছিলাম বন্দী। আর বাবা বাড়িতে অবস্থান করলে তার মাত্রা বেড়ে যেত। সে সময় আমার পরিবারের শাসনকে আমার ওপর একরকম ‘অত্যাচার’ বলেই মনে হতো। আমার পরিবারের শাসনের কারণে আমি একরকম ‘ঘরকুনো’ হয়ে উঠেছিলাম। ঘরে বসে স্কুলের পড়াশোনার সঙ্গে ছবি আঁকা, কবিতা-গল্প-নিবন্ধ লেখা চালিয়ে যাওয়া এবং ‘সাপ্তাহিক প্রতিবেশী’তে তা পাঠিয়ে দেওয়া ছিল আমার শখের বিষয়। পত্রিকায় প্রকাশিত আমার লেখা দেখে অনুপ্রাণিত হতাম। বাবাও আমাকে অনুপ্রাণিত করতেন। ঢাকায় গেলে নিউমার্কেট ও গুলিস্তানের স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে বিভিন্ন বই, পত্রিকা কিনে আনতাম। বাড়িতে তাই আমার নিজস্ব একটি মিনি লাইব্রেরি হয়ে উঠেছিল। পরে দৈনিক বাংলা, ইত্তেফাক, চিত্রালী, পূর্বাণী, বাংলার বাণীর একনিষ্ঠ পাঠক হয়ে উঠেছিলাম। বই কেনার ব্যাপারে বাবা আমাকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করতেন। নাটক-সিনেমার প্রতি আমার আগ্রহও ছিল। নিজের লেখাসহ অন্যান্য সামাজিক নাটক পরিচালনা ও অভিনয়ও করেছি স্কুল-কলেজ বেলায়। আমার বাবা কখনো নিরুৎসাহিত করেননি আমাকে। এসসব বিষয়ে তাঁর ‘মৌন-সম্মতি’ ছিল। আমার বাবার এবং মা-ঠাকুরমার শাসনে ত্যক্ত-বিরক্ত হতাম সে সময়। তাঁদের শাসন অতিরিক্ত বলেই মনে হতো। কিন্তু পরিণত বয়সে যখন আমিও একজন বাবা হয়েছি, তখন বুঝেছি বাবাই ঠিক ছিলেন। আমার মা, ঠাকুরমাও ঠিক ছিলেন। আমার বাবার মতো শাসন করতে আমি আমার সন্তানদের বেলায়ও চেষ্টা করেছি। তবে তাঁর মতো সফল হতে পারিনি নিশ্চয়! তাই মনে করি, একটি পরিবার থেকেই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষা-দীক্ষার ভিত রচিত হয়। তাই জ্ঞানীজন বলে গেছেন, ‘পরিবারই হলো মানুষের বড় পাঠশালা।’
আমার বাবা ছিলেন একজন কাজপাগল মানুষ। কর্মঠ। তাঁকে দেখেছি, ঢাকা থেকে বাড়ি এসেই বেশভূষা পাল্টে, চা-নাশতা করে হাতে কাস্তে বা কোদাল নিয়ে নেমে যেতেন জমিতে। ঠিক তখনই আমার মাথা বিগড়ে যেত। এই কখন জানি, তাঁকে সঙ্গ দিতে ডাক পড়ে! কলার চারা লাগাও। পাটখেতে নিড়ানি দাও। বাড়ির পাশের জমিতে কোদাল মেরে আদা-হলুদের সারি তৈরি করো। কিংবা লাউ-টমেটো-তামাকের চারা লাগাও। তাদের যত্ন করো। নিয়মিত পানি দাও। বাবার সঙ্গে খেতেও কাজ করেছি। বোরো ধানের খেত পরিষ্কার করো। দূর থেকে ধানের চারা নিয়ে আসো। খেতে তা রোপণ করো। চারা একটু বড় হলে, ছাই-গোবর ছিটিয়ে দাও। খেতে পানি সেচন করো। ধান পাকলে কামলাদের সাথে সঙ্গ দাও। কাটা ধান বাড়িতে নিয়ে আসো। মাড়াই করো। বাবার সঙ্গে সবই করতে হয়েছে আমাকে। আবার বাড়িতে গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগির যত্ন নিতে হতো। বিক্রির জন্য মাথায় আতাফল, লাউ, টমেটো বা কামরাঙার ঝাঁকা বয়ে নিয়ে দুই মাইল দূরের উলুখোলা হাটে নিয়ে যেতে হয়েছে। আবার বাজার-সওদা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। বাবার ইচ্ছায় এত কাজ আমাকে করতে হয়েছে। তিনি বলতেন, ‘লেখাপড়ার সাথে কৃষিকাজও করতে হয়। বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই করতে হয়।’ কেবল আমি তাঁর একমাত্র পুত্রসন্তান বলেই আমার জন্য এত কিছুর আয়োজন!
আমার বাবা শৈশবে তাঁর বাবাকে হারিয়েছেন। তাই আমার ঠাকুরমাকে তাঁর দুটি সন্তান নিয়ে সে সময় দারিদ্র্যের কঠিন অবস্থায় নিপতিত হতে হয়েছিল। সে সময় অবিভক্ত বাংলায় আমাদের এলাকার অনেকেই জীবিকার সন্ধানে কলকাতায় পাড়ি জমিয়েছেন। কলকাতায় বাবুর্চির কাজ শিখে বাবা একসময় রয়েল হোটেলে সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন। পরে ঢাকার শাহবাগ হোটেলে (পরে পিজি হাসপাতাল হয়) তিনি কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। আমি তাঁকে দেখেছি, ঢাকার ধানমন্ডিতে আশুগঞ্জ সার-কারখানা নির্মিত হওয়ার সময় তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির ‘ফস্টার হুইলার’ কোম্পানির কর্মকর্তার অধীনে কাজ করতে। একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা আশুগঞ্জে কর্মরত ছিলেন। সে সময় জুন বা জুলাই মাসে তিনি বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবে বাবা ট্রেনে আশুগঞ্জ থেকে রওনা হয়ে ভৈরব হয়ে টঙ্গীতে নামতেন। টঙ্গী থেকে সাত মাইল বা অনেক সময় আড়িখোলা নেমে, সাত-আট মাইল পথ পায়ে হেঁটে বাড়ি আসতেন। উপরিউক্ত সময় তিনি যখন যাত্রা শুরু করেন, ভৈরব এসে দেখেন ট্রেন বন্ধ। হানাদার পাকসেনাদের আক্রমণের মুখে যাতায়াত-ব্যবস্থা তখন বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধারাও ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য হন। তাঁরা ওই এলাকায় কারফিউ দিয়ে রাখেন। বাবা ট্রেনের ওপর ভরসা না করে রিকশা নিলেন। কোথায় কোন পাঁচদোনা, মনোহরদী পাড়ি দিতে পথিমধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের বাধার মুখে পড়েন তিনি। তাঁদের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এলাকায় প্রবেশ করায় মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ বাবাকে ‘রাজাকার’ বলতেও কসুর করেননি।
মুক্তিসেনারা অন্যদের মতো বাবার পরিচয় জানার জন্য তাঁদের ক্যাম্পে নিয়ে যান। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে রাত ঘনিয়ে আসে। পরের দিন দুপুরের দিকে বাবা ছাড়া পান। তিনি বর্তমান গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার আড়িখোলা-নাগরী হয়ে গভীর রাতে বাড়ি এসে পৌঁছান। আমার মনে আছে, সে সময় বাবার যে অবয়ব আমি দেখেছি, তা ছিল একেবারেই বিধ্বস্ত! তিনি মানসিক এবং দৈহিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। নিশ্চয় পথে তাঁকে অনেক ধকল সহ্য করতে হয়েছিল। মনে পড়ে, স্বাধীনতার পর বাবা তাঁর কাজে ঢাকায় ও আশুগঞ্জে যোগ দিয়েছিলেন। সে সময় আশুগঞ্জ দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার।
পরিবারে আমরা তিন ভাইবোন বাবা-মা, পিসিমা ও ঠাকুরমার আদর-যত্নে বেড়ে উঠেছি। আমার পিসিমা তাঁর এক মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে অল্প বয়সে বিধবা হয়েছিলেন। বাবা তাঁর বোনের ছেলেমেয়েদের তাদের বাবার অভাব বুঝতে দেননি। আমার মা-ঠাকুরমারও ছিল বাবার মতো মন। তাঁদের সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমার পিসিমার দুই সন্তান বড় করে তুলে তাদের প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছেন।
আমার বাবার চাহিদা ছিল খুবই সীমিত। জমিজমা, অর্থকড়ির তেমন মোহ তাঁর ছিল না। বাড়ির জমি থেকে অল্পবিস্তর আয় এবং তাঁর বেতন দিয়ে সংসার নির্বাহ করেই তিনি সন্তুষ্ট থাকতেন। আমাদের তিন ভাইবোনের (আমার বড় ও ছোট বোন এবং আমি) লেখাপড়ায় গুরুত্ব দিতেন তিনি। আমার কিশোরবেলায় লেখালেখি, ছবি আঁকা, নাটক দেখা, অভিনয় করা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কথা জানতেন বাবা। এসব ব্যাপারে কখনো বাধা দেননি তিনি। আমি একজন বাবা হয়ে, আমার বাবার কথাই ভাবি। সব সময় নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি কি বাবার মতো হতে পেরেছি? তাঁর চরিত্র কি আমি পরিধান করতে পেরেছি? আমি নিশ্চিত, পারিনি! তবে সব সময় চেষ্টা করি তাঁর মতো একজন আদর্শ ‘বাবা’ হতে। আমার অনেক সীমাবদ্ধতা আমাকে তা হতে দেয় না। বাবা কলকাতায় স্থায়ী হওয়ার বা পরে আমেরিকার ‘অভিবাসী’ হওয়ার সুযোগ দু’হাতে দূরে ঠেলে দিয়েছেন। কিন্তু আমি? এই আমি তাঁর সন্তান, তা করতে পারিনি! নিজের বাপের ভিটার প্রতি, স্বদেশের প্রতি ছিল বাবার অপরিসীম প্রেম। আর আমার ‘দেশপ্রেম’ আমাকে দূরে, একেবারে অসম্ভব দূরে ঠেলে দিয়েছে! আমার দেশকে আমি, আমার জন্য নিরাপদ ভাবতে পারিনি! এখানে আমার বাবার সঙ্গে আমার ভিন্নতা! আমার দেশকে তো আমিও ভালোবাসি! ‘দেশপ্রেম’ আমারও নিশ্চয় আছে। প্রশ্ন, আমার বাবার মতো কি? তাই তো শরৎচন্দ্র বলেছেন, ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না। দূরেও ঠেলিয়া দেয়!’ এখন দেখছি আমার নিখুঁত ‘দেশপ্রেম’, এই আমাকে বাংলাদেশের একেবারে উল্টো দিকে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছে!
আমার বাবার কথা সাজিয়ে সাহিত্যরসে পরিপূর্ণ একটি মনোগ্রাহী লেখা দাঁড় করানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি যদি হতাম একজন পারঙ্গম লেখক, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখেও নান্দনিক একটি বয়ান বা আলেখ্য পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা সম্ভব হতো না এই আমার দ্বারা। জন পিউরীফিকেশন তো আমাদের তিন ভাইবোনের বাবা! প্রতিবছর ১৩ জুলাই দিনটা অতিবাহিত হয় শুধু বাবার কথা মনে করেই। সেদিন বাবা আমাদের ছেড়ে স্বর্গলোকের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন তখন তুঙ্গে। ঢাকার খিলক্ষেতে আমার বড় বোনের বাড়িতে থেকেও কারফিউয়ের কারণে ঢাকার হাসপাতালে নিয়ে ভালো চিকিৎসা করার তেমন সুযোগ হয়নি আমাদের। পরের দিন ১৪ জুলাই ১৯৮৭ সালে মেশিনচালিত ছোট্ট বোটে বাক্সবন্দী নিথর বাবাকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছিলাম ‘বরুয়ার বিলের’ উত্তাল ঢেউয়ের বিপরীতে। সেদিন চারদিকে ছিল শুধু ঢেউ আর ঢেউ! ভরা বর্ষার সময় এই বিলকে মনে হয়েছিল কূল-পাড়বিহীন এক মহাসমুদ্র! আজ সেখানে সেই চিত্র আর নেই। পূর্বাচলে যাওয়ার পথেই সেখানে রচিত হয়েছে ‘বসুন্ধরা সিটি’। বাবাহারা হয়ে সেদিন আমিও বুঝে নিয়েছিলাম, এই সংসার আমার জন্য ‘মহা-অতলান্তিক’ হয়ে উঠেছে!
হ্যাঁ! যে সন্তান তার মাথার ওপর সুশীতল ছায়া প্রদানকারী বটবৃক্ষসম বাবাকে চিরতরে হারায়, একমাত্র সেই বোঝে, এই জগৎ-সংসারের ‘মহা-অতলান্তিক’ কী ও কাকে বলে!
বাবা! বিশ্বাস করি, তুমি এখন স্বর্গীয় কাননে অনন্ত সুখ, অনন্ত শান্তি উপভোগ করে যাচ্ছ। আমাদের আশীর্বাদ করো, একদিন আমরা যেন তোমার পাশে স্থান পাই। (সমাপ্ত)