মধ্যবয়সে এসে মানুষ হঠাৎ করেই নিজের শৈশবকে নতুন করে আবিষ্কার করে। যে দৃশ্যগুলো একসময় শুধু চোখে দেখেছিলাম, আজ সেগুলোর অর্থ বুঝতে পারি হৃদয় দিয়ে। আমার সন্তানেরা বড় হয়ে গেছে। জীবনের নানা দায়িত্বের ভিড় একটু সরতেই বারবার ফিরে যাই সেই মানুষ দুটির কাছে, যাদের ভালোবাসার ভেতর দাঁড়িয়েই আমার বেড়ে ওঠা।
আমার বাবা আলী আহমেদ চৌধুরী, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী পরিবারের সন্তান। সুদর্শন, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ। কিন্তু তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এক কঠিন অসুস্থতা, যাকে আজ আমরা বাইপোলার ডিসঅর্ডার নামে চিনি। বছরের কিছু সময় সেই অসুস্থতা আমাদের সংসারের আকাশে ঝড় ডেকে আনত। বিশেষ করে, আমার মায়ের জন্য সেই সময়গুলো ছিল অসীম ধৈর্যের পরীক্ষা।
মাকে একমুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল হতে দিতে চাইতেন না বাবা। মা গোসল করতে গেলে পুকুরপাড়ে বসে থাকতেন, বাথরুমে গেলে দরজার বাইরে অপেক্ষা করতেন। দাদির বকাঝকা, আত্মীয়দের কথা, প্রতিবেশীদের কৌতূহল-কিছুই তাঁর কানে পৌঁছাত না। মা লুকিয়ে চোখ মুছতেন, কিন্তু বাবার সামনে কাঁদার সাহস পেতেন না। কারণ বাবা সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করতেন, ‘কাঁদছ কেন?’ মা তখন চোখের পানি লুকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলতেন, ‘কই, কাঁদি না তো!’
আজ বুঝি, অসুস্থতার অস্থিরতার ভেতরেও বাবার ভালোবাসা কত প্রবল ছিল। আমি দেখেছি, বাবা পুকুর থেকে মায়ের ধোয়া শাড়ি তুলে এনে উঠানে শুকাতে দিয়েছেন। দেখেছি, নিজের হাতে ভাত মেখে মায়ের মুখে তুলে দিয়েছেন। হাট থেকে ডালের বড়া (পেঁয়াজু) কিনে লুকিয়ে এনেছেন, যেন বাড়ির অন্য কেউ দেখার আগেই মাকে খাইয়ে দিতে পারেন। বাড়িতে অতিথি এলে বা ভালো কিছু রান্না হলে সবার অগোচরে মায়ের জন্য আলাদা করে তুলে রেখেছেন।
ছোটবেলায় এসব দৃশ্যের গভীরতা বুঝিনি। শুধু অবাক হয়ে দেখতাম। এখন বুঝি, ভালোবাসা সব সময় বড় বড় শব্দে প্রকাশ পায় না। কখনো তা একটি প্লেটে তুলে রাখা মাছের বড় টুকরো, কখনো একটি শাড়ি শুকাতে দেওয়া, কখনো-বা প্রিয় মানুষটির জন্য লুকিয়ে আনা গরম ডালের বড়া।
আমি দেখেছি, গভীর রাতে বাবা-মা ফিসফিস করে কথা বলছেন। দেখেছি, মানুষে ভরা বাড়ির মাঝখান থেকে বাবা হঠাৎ মাকে আড়ালে ডেকে নিচ্ছেন, আর মা কিছুক্ষণ পর লজ্জায় লাল মুখে ফিরে আসছেন। তখন বুঝিনি, আজ বুঝি, সংসার শুধু একসঙ্গে থাকা নয়; সংসার হলো প্রতিদিন নতুন করে প্রেমে পড়ার শিল্প।
আমাদের ঘরে টাকার অভাব ছিল। ছিল না মায়ার অভাব। অভাব ছিল না একে অপরকে প্রয়োজন মনে করার অনুভূতির।
আজকের পৃথিবীতে আমরা অনেক বেশি সচ্ছল। ঘরে প্রয়োজনীয় সবকিছু আছে। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়, সম্পর্কের ভেতর সেই উষ্ণতা কোথায় হারিয়ে গেছে? একসময় মানুষ মানুষকে আঁকড়ে ধরে বাঁচত, এখন যেন পাশাপাশি থেকেও দূরে দূরে থাকি। একটা সময়ের পর আমরা অনেকের জীবনেই আসবাবপত্রের মতো হয়ে যাই, ব্যবহার্য কিন্তু অপরিহার্য নই।
আমার বাবা-মা ছিলেন একটি বড় যৌথ পরিবারের সদস্য। ব্যক্তিগত সময় ছিল কম, সুযোগ-সুবিধা ছিল সীমিত। তবু তাঁদের ভালোবাসার কোনো ঘাটতি ছিল না। বাবা অসুস্থ অবস্থায় কখনো রূঢ় আচরণ করলে পরে সুস্থ হয়ে প্রতিবেশীদের মুখে শুনে অনুতপ্ত হতেন। তারপর বাকি সময়টুকু বাড়তি আদর দিয়ে সেই ক্ষত মুছে দেওয়ার চেষ্টা করতেন।
তখন জন্মদিনের কেক ছিল না, বিবাহবার্ষিকীর ফুল ছিল না, ভ্যালেন্টাইনস ডের বিশেষ আয়োজন ছিল না। তবু তাঁদের ভালোবাসা ছিল পূর্ণ। কারণ ভালোবাসা উদযাপনের জন্য ক্যালেন্ডারের নির্দিষ্ট দিন লাগে না; লাগে একটি যত্নশীল মন এবং একটি বিশ্বস্ত হৃদয়।
আজ বাবা নেই। মা অসুস্থ শরীর নিয়ে বেঁচে আছেন। কিন্তু বাবার কথা উঠলেই তাঁর চোখে এক অদ্ভুত আলো জ্বলে ওঠে। মুখে ফুটে ওঠে সেই তরুণী বয়সের লাজুক হাসি। মনে হয়, সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষের শরীরকে নয়, স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে।
বাবা দিবসে বাবাকে স্মরণ করতে গিয়ে আমি শুধু একজন বাবাকে দেখি না, একজন প্রেমিককেও দেখি। যে মানুষটি হয়তো নিখুঁত ছিলেন না, কিন্তু ভালোবাসতে জানতেন নিঃস্বার্থভাবে। আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসার গল্প কোনো উপন্যাসে লেখা নেই। তা লেখা আছে আমার বাবা-মায়ের একসঙ্গে কাটানো সেই সাধারণ অথচ অসাধারণ জীবনে।
আর সেই গল্পই আমাকে আজও শেখায়, সংসার টিকে থাকে অর্থে নয়, মায়ায়; আয়োজনে নয়, আন্তরিকতায়; আর ভালোবাসা কখনো বড় ঘোষণায় নয়, ছোট ছোট যত্নের ভেতরেই সবচেয়ে বেশি বেঁচে থাকে।