বিশ্ব পরিবেশ দিবস প্রতিবছর আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেÑআমরা কি সত্যিই এই পৃথিবীকে ভালোবাসি? আমরা কি প্রকৃতিকে শুধুই ভোগের বস্তু হিসেবে দেখি, নাকি তাকে আমাদের অস্তিত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের নিজেদের জীবন, সমাজ ও দৈনন্দিন আচরণের দিকে তাকাতে হয়।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন পরিবেশের সংকট আর কোনো দূরের আশঙ্কা নয়; এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। ঘর থেকে বের হলেই আমরা ধুলো, ধোঁয়া ও শব্দদূষণের মুখোমুখি হই। গ্রীষ্মের তাপমাত্রা প্রতিবছর নতুন রেকর্ড গড়ে। বৃষ্টির মৌসুমে অনিয়মিত বর্ষণ, হঠাৎ বন্যা, জলাবদ্ধতা কিংবা খরার মতো ঘটনা এখন নিত্যসঙ্গী। প্রকৃতি যেন বারবার আমাদের সতর্ক করছে, কিন্তু আমরা কি সেই সতর্কবার্তা শুনছি?
একসময় গ্রামের পথঘাট ছিল গাছের ছায়ায় ঢাকা। পুকুরে ছিল স্বচ্ছ পানি, নদীতে ছিল প্রাণের স্পন্দন। বর্ষাকালে মাঠে মাঠে দেখা যেত নানা জাতের মাছ। শীতের সকালে অতিথি পাখিরা এসে প্রকৃতিকে মুখরিত করত। আজ সেই দৃশ্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। নদী ভরাট হচ্ছে, বন উজাড় হচ্ছে, জলাশয় বিলীন হচ্ছে আর মানুষের লোভ প্রকৃতির সৌন্দর্যকে গ্রাস করছে।
আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো-আমরা প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, অথচ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিও করছি প্রকৃতিকেই। আমরা অক্সিজেন চাই, কিন্তু গাছ কাটছি। আমরা বিশুদ্ধ পানি চাই, কিন্তু নদী দূষণ করছি। আমরা নিরাপদ ভবিষ্যৎ চাই, কিন্তু পরিবেশ ধ্বংসের পথেই এগিয়ে চলেছি।
পরিবেশদূষণের অন্যতম কারণ আমাদের অসচেতন ভোগবাদী জীবনযাপন। আমরা যতটা প্রয়োজন, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যবহার করছি। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ খরচ, খাদ্যের অপচয়, যানবাহনের অতিরিক্ত ব্যবহার-সবকিছুই পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। আমরা অনেক সময় ভাবি, আমার একার কারণে কী হবে? কিন্তু পৃথিবীর বড় সংকটগুলো লক্ষ-কোটি মানুষের ছোট ছোট অসচেতনতার ফল।
বিশ্ব উষ্ণায়ন আজ মানবসভ্যতার জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। হিমবাহ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, আবহাওয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ঝুঁকির মুখে পড়ছে। কৃষি উৎপাদনে দেখা দিচ্ছে অনিশ্চয়তা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ, যারা এই সংকট তৈরিতে সবচেয়ে কম ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি ও তাপপ্রবাহ আমাদের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। কৃষক তার ফসল নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন, জেলে হারাচ্ছেন মাছের উৎস, আর সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। পরিবেশের ক্ষতি কোনো একটি শ্রেণির সমস্যা নয়; এটি ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে।
কিন্তু আশার কথা হলো, এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। আমরা চাইলে পরিবর্তন আনতে পারি। পরিবেশ রক্ষার জন্য শুধু বড় বড় প্রকল্পই নয়, ব্যক্তিগত উদ্যোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি গাছ লাগানো, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করা, বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা, গণপরিবহন ব্যবহার করা-এসব ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে।
পরিবেশ শিক্ষা আজ অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ শেখাতে হবে। তাদের বুঝতে হবে যে প্রকৃতি কেবল ভ্রমণের স্থান নয়; এটি জীবনধারণের মূল ভিত্তি। একটি গাছ, একটি নদী, একটি পাখি কিংবা একটি ফুল-সবই পরিবেশের বৃহৎ ব্যবস্থার অংশ।
আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও নৈতিক শিক্ষাও প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের কথা বলে। পৃথিবীর সব মহান দর্শন মানুষকে সংযম, ভারসাম্য ও সহাবস্থানের শিক্ষা দিয়েছে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে কখনোই মানুষের কল্যাণ সম্ভব নয়। প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত নয়, সহমর্মিতাই মানবসভ্যতার টিকে থাকার একমাত্র পথ।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতার দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনার দিন। আজ আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত-আমি কি আমার পরিবেশের জন্য কিছু করছি? আমি কি আমার সন্তানের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে পারব? আমি কি প্রকৃতির কাছ থেকে নেওয়ার পাশাপাশি কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি?
পৃথিবী আমাদের একমাত্র আবাস। অন্য কোনো গ্রহে গিয়ে আমরা সহজে জীবন গড়তে পারব না। এই মাটি, এই নদী, এই বন, এই আকাশ-এসবই আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। তাই পরিবেশ রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
আমি নিজে একজন পরিবেশবান্ধবের সঙ্গে যুক্ত। প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের ঢাকা জোনের একজন উপদেষ্টা। আমি দেখেছি, আমরা যখন পরিবেশ দিবসে গাছ রোপণ করেছি বিভিন্ন স্কুলে, রাস্তার চারপাশে সবার উৎসাহ অনেক থাকে কিন্তু তার পরিচর্যা করার জন্য সিটি করপোরেশনকে আন্তরিকতা দেখতে হবে। শুধু গাছ রোপণ করলে হবে না, এই গাছগুলো যেন পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে, সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে পারে, সে বিষয়ে সিটি করপোরেশনকে এবং এলাকাবাসীকে সচেতন থাকতে হবে।
আসুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমরা নতুন করে অঙ্গীকার করি-প্রকৃতিকে ভালোবাসব, তাকে রক্ষা করব, তার প্রতি দায়িত্ব পালন করব। কারণ প্রকৃতি সুস্থ থাকলে মানুষ সুস্থ থাকবে, পরিবেশ নিরাপদ থাকলে ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে।
আজ একটি গাছ লাগানো হয়তো সামান্য কাজ মনে হতে পারে, কিন্তু সেই গাছই একদিন কারও শ্বাস নেওয়ার অক্সিজেন হবে। আজ একটি নদীকে দূষণমুক্ত রাখার চেষ্টা হয়তো ছোট উদ্যোগ, কিন্তু সেটিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পানির উৎস হয়ে উঠবে। তাই পরিবেশ রক্ষার প্রতিটি পদক্ষেপ আসলে মানবতার সেবায় একটি বিনিয়োগ।
প্রকৃতি আমাদের অনেক দিয়েছে-জীবন, সৌন্দর্য, খাদ্য, পানি ও আশ্রয়। এবার আমাদের পালা। আমরা যদি প্রকৃতিকে রক্ষা করি, প্রকৃতিও আমাদের রক্ষা করবে। আর যদি তাকে ধ্বংস করি, তাহলে সেই ধ্বংস একদিন ফিরে আসবে আমাদের জীবন, সমাজ ও সভ্যতার ওপর।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল শিক্ষা একটাই-পৃথিবীকে ভালোবাসুন, কারণ পৃথিবীই আমাদের একমাত্র ঠিকানা।
লেখক : কবি, কলামিস্ট, প্রকাশক ও সমাজকর্মী।