বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​আমেরিকায় হোম কেয়ারের টাকা ও হারিয়ে যাওয়া মানবিকতা

​আমেরিকায় হোম কেয়ারের টাকা ও হারিয়ে যাওয়া মানবিকতা

বিজ্ঞাপন
এক বুক স্বপ্ন, আজীবনের ত্যাগ আর সন্তানের মুখে হাসি দেখার অদম্য ইচ্ছা নিয়েই বাংলাদেশের অসংখ্য বাবা-মা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। কেউ স্থায়ীভাবে গ্রিন কার্ড নিয়ে, কেউ ভিজিট ভিসায়, আবার কেউ সন্তানদের আবেদনের ভিত্তিতে। তাদের প্রত্যাশা খুব বড় কিছু নয়। সারা জীবন যে সন্তানদের জন্য নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন, শেষ বয়সে তাদের সান্নিধ্যে কয়েকটি শান্তির দিন কাটাবেন। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবের এই ব্যবধান অনেকের জন্যই হয়ে ওঠে নির্মম।

প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে গত কয়েক বছরে এমন বহু অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে বৃদ্ধ বাবা-মা অবহেলা, মানসিক নির্যাতন, আর্থিক শোষণ, এমনকি শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত ঘটনা এবং কমিউনিটির অভিজ্ঞতা একটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে-বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নামে পাওয়া হোম কেয়ার সুবিধা বা কেয়ারগিভিং-সংক্রান্ত অর্থকে কেন্দ্র করে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও শোষণের অভিযোগ। যদিও প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা একই রকম নয় এবং কোনোভাবেই সব প্রবাসী পরিবারকে একই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না, তবু ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি সমাজের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রবীণদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি রয়েছে। যারা শারীরিকভাবে দুর্বল বা দৈনন্দিন কাজে অন্যের সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করেন, তাদের জন্য অনেক অঙ্গরাজ্যে হোম কেয়ার বা ব্যক্তিগত পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, একজন প্রবীণ ব্যক্তি যেন নিজের পরিচিত পরিবেশে থেকে নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারেন। কোথাও পরিবারের সদস্য পরিচর্যাকারী হিসেবে কাজ করতে পারেন, কোথাও আবার অনুমোদিত সংস্থার মাধ্যমে সেবা দেওয়া হয়। এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রবীণ ব্যক্তি-তার স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও জীবনমান।

কিন্তু এখানেই শুরু হয় কিছু অনাকাক্সিক্ষত বাস্তবতা। কমিউনিটিতে এমন অভিযোগ শোনা যায়, কিছু ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের নামে আসা অর্থ তাদের প্রয়োজনের জন্য ব্যয় না করে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রবীণ বাবা-মা সামান্য ব্যক্তিগত খরচের জন্যও সন্তানের কাছে হাত পাততে বাধ্য হন, অথচ তাদের নামে বরাদ্দ অর্থ অন্য খাতে চলে যায়। কোথাও কোথাও অভিযোগ আরও গুরুতর-বাবা-মায়ের ব্যাংক হিসাব, সুবিধা বা সরকারি ভাতার ওপরও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তাদের আর্থিকভাবে নির্ভরশীল করে রাখা হয়।

এসব অভিযোগের সবগুলো আদালতে প্রমাণিত নয়, অনেক ঘটনাই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থাগুলোও স্বীকার করে, প্রবীণদের আর্থিক শোষণ (Financial Exploitation of Older Adults) একটি বাস্তব ও উদ্বেগজনক সমস্যা। মার্কিন Government Accountability Office (GAO) এবং National Center on Elder Abuse বহুবার সতর্ক করেছে, প্রবীণদের আর্থিক শোষণের বড় একটি অংশ ঘটে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচর্যাকারীদের মাধ্যমে। অর্থাৎ সমস্যাটি কোনো একটি জাতিগোষ্ঠী বা অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকট।

প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের কিছু সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা ইংরেজি ভাষা জানেন না, গাড়ি চালাতে পারেন না, বন্ধুবান্ধবও খুব একটা নেই। ফলে তাদের পুরো জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে সন্তানের পরিবারের মধ্যে। এই নির্ভরশীলতাই অনেক সময় তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়। তারা জানেন না কোথায় অভিযোগ করতে হবে, কীভাবে নিজের অধিকার রক্ষা করতে হবে, কিংবা আদৌ তাদের কোনো আইনি অধিকার আছে কি না।

অনেকের দিন কাটে চার দেয়ালের মধ্যে। সন্তান কর্মস্থলে চলে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা বসে থাকা, বাইরে যাওয়ার সুযোগ না পাওয়া, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেলামেশা করতে না পারা-এসব ধীরে ধীরে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একাকিত্ব প্রবীণদের জন্য উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্নতা, স্মৃতিভ্রংশ এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।

কমিউনিটিতে প্রচলিত অনেক ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিযোগ হলো, কিছু বাবা-মা নাকি নিজের ব্যক্তিগত খরচের জন্যও স্বাধীন নন। চা খাওয়া, পান কেনা কিংবা কোনো আত্মীয়ের জন্য ছোট একটি উপহার কেনার সামর্থ্য পর্যন্ত তাদের থাকে না। পরিচিত মানুষের কাছে সামান্য সাহায্য চাইতে বাধ্য হওয়ার মতো ঘটনাও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। এমন দৃশ্য শুধু আর্থিক সংকটের নয়, এটি আত্মসম্মানের গভীর ক্ষয়ের প্রতীক।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো, কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, বাবা-মা যদি বাইরের কারও কাছে নিজেদের কষ্টের কথা বলেন, তাহলে তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। কোথাও কোথাও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অবশ্য এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনাই তদন্তসাপেক্ষ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু এ ধরনের অভিযোগের অস্তিত্বই বলে দেয়, বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এমন ভিডিও, লাইভ বা পোস্ট দেখা যায়; যেখানে কোনো বৃদ্ধ ব্যক্তি নিজের অসহায় অবস্থার কথা তুলে ধরছেন। আবার অনেক সময় প্রতিবেশী বা পরিচিত কেউ বিষয়টি প্রকাশ্যে আনছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য সব সময় নির্ভুল নয়, অনেক ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন বা একপাক্ষিক বর্ণনাও থাকতে পারে। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ যখন বারবার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, বিভিন্ন পরিবার এবং বিভিন্ন সূত্রে উঠে আসে, তখন সেটিকে কেবল গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়াও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রবীণ নির্যাতন সব সময় চোখে দেখা যায় না। ক্ষুধার্ত রাখা, ওষুধ সময়মতো না দেওয়া, ইচ্ছাকৃতভাবে একা ফেলে রাখা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি করা, ব্যক্তিগত অর্থ বা নথিপত্রের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া-এসবও নির্যাতনেরই রূপ। অনেক সময় ভুক্তভোগী নিজেই বুঝতে পারেন না যে তিনি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আবার বুঝলেও সন্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চান না। কারণ পৃথিবীর প্রায় সব বাবা-মায়ের মতো তারাও শেষ পর্যন্ত সন্তানের মুখ রক্ষা করতে চান।

প্রশ্ন হলো, একটি পরিবারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় কেন? এর উত্তর কেবল অর্থ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক দূরত্ব, প্রজন্মগত পার্থক্য, অভিবাসী জীবনের চাপ এবং অনেক ক্ষেত্রে নৈতিক অবক্ষয়। কিন্তু কোনো কারণই একজন প্রবীণ মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার বৈধতা দিতে পারে না। একজন বাবা বা মা কখনোই কেবল একটি সরকারি সুবিধার উৎস নন; তিনি একটি পরিবারের ইতিহাস, একটি সন্তানের শেকড় এবং একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তি।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রবীণদের প্রতি নির্যাতনকে ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয় হিসেবে দেখা হয় না; এটি একটি গুরুতর সামাজিক ও আইনি অপরাধ। প্রায় প্রতিটি অঙ্গরাজ্যেই Adult Protective Services (APS) নামে একটি সংস্থা রয়েছে, যারা প্রবীণ বা অক্ষম ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতন, অবহেলা এবং আর্থিক শোষণের অভিযোগ তদন্ত করে। চিকিৎসক, সমাজকর্মী, নার্স কিংবা কোনো প্রতিবেশী যদি মনে করেন একজন প্রবীণ ব্যক্তি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, অনেক ক্ষেত্রেই তারা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন। অর্থাৎ একজন বাবা-মা সন্তানের বাড়িতে থাকছেন বলেই তিনি আইনের সুরক্ষার বাইরে নন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ভোক্তা-নির্দেশিত হোম কেয়ার কর্মসূচি (CDPAP) নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। সরকারি তদন্ত ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই কর্মসূচির কিছু ক্ষেত্রে জালিয়াতি, ভুয়া বিল, অযোগ্য ব্যক্তির নামে অর্থ উত্তোলন এবং সংগঠিত প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অনিয়মের বড় অংশই ছিল কিছু এজেন্সি, দালালচক্র বা অসাধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে; তাই এই ঘটনাগুলোকে ভিত্তি করে হোম কেয়ার সুবিধা গ্রহণকারী সব পরিবারকে সন্দেহ করা সমীচীন নয়। একইভাবে কিছু সন্তানের অনৈতিক আচরণের কারণে পুরো প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজকে দোষারোপ করাও অন্যায় হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, হাজার হাজার বাংলাদেশি পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বাবা-মাকে অত্যন্ত সম্মান ও ভালোবাসার সঙ্গে আগলে রেখেছেন। কেউ চাকরির ব্যস্ততার মধ্যেও বাবা-মায়ের চিকিৎসার জন্য রাত জেগে হাসপাতালে ছুটছেন, কেউ আবার নিজের ক্যারিয়ারের সুযোগ ছেড়ে দিয়ে তাদের সেবা করছেন। এই ইতিবাচক গল্পগুলো খুব কমই সংবাদ শিরোনাম হয়। সংবাদে আসে ব্যতিক্রম, আর সেই ব্যতিক্রমই অনেক সময় পুরো বাস্তবতাকে আড়াল করে ফেলে।

তার পরও প্রশ্ন থেকে যায়-কেন কিছু পরিবারে এমন অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়? সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, অভিবাসী জীবনের অর্থনৈতিক চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, পারিবারিক যোগাযোগের অভাব এবং প্রবীণদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অনেক সময় সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। কিন্তু এসব কারণ কখনোই নির্যাতনের অজুহাত হতে পারে না। একজন মানুষ বৃদ্ধ হওয়ার কারণে তার স্বাধীনতা, সম্মান বা আর্থিক অধিকার হারিয়ে ফেলবেন-সভ্য সমাজে এমন ধারণার কোনো স্থান নেই।

বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, সামাজিক মূল্যবোধেরও অংশ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মূল্যবোধ মুখে উচ্চারণ করলেই তা প্রতিষ্ঠিত হয় না; তা প্রতিদিনের আচরণে প্রতিফলিত হতে হয়। একজন বৃদ্ধ মানুষকে সময় দেওয়া, তার কথা মন দিয়ে শোনা, তার চিকিৎসা নিশ্চিত করা, নিজের সিদ্ধান্তে তাকে অংশীদার করা-এসবই সম্মানের প্রকাশ। বিপরীতে, তাকে বোঝা মনে করা, তার নামে আসা অর্থকে নিজের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা কিংবা তাকে নীরব থাকতে বাধ্য করা শুধু আইনভঙ্গ নয়, মানবিকতারও পরাজয়।

এখানে প্রবাসী কমিউনিটিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনেক সময় প্রতিবেশীরা বুঝতে পারেন যে পাশের বাসায় একজন বৃদ্ধ মানুষ দীর্ঘদিন বাইরে বের হচ্ছেন না, কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছেন না অথবা সব সময় ভীতসন্ত্রস্ত থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টিকে ‘তাদের পারিবারিক ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। অবশ্যই কারও ব্যক্তিগত জীবনে অযথা হস্তক্ষেপ করা ঠিক নয়, কিন্তু নির্যাতনের যৌক্তিক আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা কমিউনিটি নেতাদের অবহিত করা মানবিক দায়িত্ব।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা কিংবা কমিউনিটি সেন্টারগুলো যদি নিয়মিত প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সচেতনতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক মেলামেশার উদ্যোগ নেয়, তাহলে অনেক প্রবীণ একাকিত্ব থেকে মুক্তি পেতে পারেন। একই সঙ্গে নতুন অভিবাসী বাবা-মায়েদের যুক্তরাষ্ট্রের আইন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে ধারণা দেওয়াও জরুরি।

সন্তানদের প্রতিও কিছু কথা বলা প্রয়োজন। আজ যাদের বাবা-মা বৃদ্ধ, তারা একসময় আপনাদের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন। নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে আপনাদের পড়াশোনা করিয়েছেন, অসুস্থ রাতে জেগে থেকেছেন, জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করেছেন ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য। বার্ধক্যে তাদের চাহিদা খুব বেশি নয়। তারা বিলাসিতা চান না; চান সম্মান, একটু সময়, দুটো ভালো কথা এবং এই বিশ্বাস যে তারা পরিবারের বোঝা নন।

আর বাবা-মায়েদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে। যদি সত্যিই কোনো প্রবীণ ব্যক্তি মানসিক, শারীরিক বা আর্থিক নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে নীরব থাকা সমাধান নয়। বিশ্বস্ত আত্মীয়, বন্ধু, কমিউনিটি সংগঠন, চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন। নিজের অধিকার রক্ষা করা সন্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা নয়; বরং নিজের মর্যাদা রক্ষার একটি ন্যায্য পদক্ষেপ।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন প্রযুক্তি মানুষকে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে গেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে মানুষের হৃদয়ের দূরত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে। বড় বাড়ি, দামি গাড়ি কিংবা ব্যাংক ব্যালেন্স কোনো পরিবারের সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। একটি পরিবারের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে তারা তাদের সবচেয়ে দুর্বল সদস্যের সঙ্গে কেমন আচরণ করে।

যে বাবা তার সন্তানের জন্য নিজের যৌবন উৎসর্গ করেছেন, যে মা সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে নিজের ক্ষুধা লুকিয়েছেন, শেষ বয়সে তাদের যদি সামান্য ব্যক্তিগত খরচের জন্যও অন্যের কাছে হাত পাততে হয়, তবে সেটি শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের সামাজিক বিবেকেরও ব্যর্থতা।

তবে এই আলোচনার শেষে আবারও একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা জরুরিÑকিছু হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী সব বাংলাদেশি সন্তানকে দোষী বলা যাবে না। বরং অধিকাংশ প্রবাসী পরিবার আজও ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও ত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন। এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে হেয় করা নয়; বরং যে অন্যায়ের অভিযোগগুলো বারবার সামনে আসছে, সেগুলো নিয়ে সমাজে একটি দায়িত্বশীল আলোচনা তৈরি করা। কারণ একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার সুউচ্চ অট্টালিকায় নয়, বরং সেই সমাজ কতটা সম্মান দেয় তার প্রবীণ মানুষদের। আর যে সন্তান নিজের বাবা-মায়ের প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করতে পারে না, সে যত বড় সাফল্যের দাবিই করুক না কেন, তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় সে আসলে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz