বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর

​প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর

বিজ্ঞাপন
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় এবং পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর কোন দেশে হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও বহু মহলে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা হতে দেখা যায়। ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীসহ (Conspiracy Theorists) অনেকে তারেক রহমান প্রথমে ভারতে যাবেন বলে জোরালো মত প্রকাশ করেন। আবার কেউ কেউ ভুটান, চীনসহ আরও কিছু দেশের নাম বলেন। সরকার গঠনের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের ভারত সফরের ঘটনা প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের উনুনে হাওয়া দিতে সহায়ক হয়। ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীদের অনেকে যারা তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও নির্বাচনী বিজয়ে ভারতের সমর্থন-সহযোগিতা Catalyst-এর ভূমিকা পালন করে বলে মনে করেন, তারা তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ভারত ছাড়া অন্য কোথাও হতে পারে না মর্মে জোরালো অভিমত প্রকাশ করেন। এসব সবজান্তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকের বক্তব্য শুনলে মনে হবে, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং নির্বাচনে তার বিজয় মোদি, অমিত শাহ গংদের আনুকূল্যের কারণেই সম্ভব হতে পেরেছে, যেন তারা দিল্লি থেকে বাংলাদেশে উড়ে এসে ভোটের বাক্সে ব্যালট পেপার ভরে তাকে বিজয়ী করে দিয়েছে এবং তার প্রত্যাবর্তনের পেছনে জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কোনো ভূমিকাই নেই এবং নির্বাচনে তার বিজয়ে নিজের জনপ্রিয়তা ও তার প্রতি বাংলাদেশের বিপুল জনতার আস্থা-ভালোবাসার কোনো মূল্য বা ভূমিকা নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা যদি এতই শক্তিশালী ‘ড্রাইভিং ফোর্স’ হয়, তাহলে ভারত তার পরম অনুগত ও আজ্ঞাবহ শেখ হাসিনার পতন ঠেকাতে এবং পরবর্তীকালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা কেন করতে পারল না, সে প্রশ্ন তোলা কি অস্বাভাবিক হবে।

প্রকৃতপক্ষে, জনগণের মতামত ও শক্তির ওপর যাদের আস্থা-বিশ্বাস কম, তারাই স্বীয় হীন রাজনৈতিক স্বার্থ ও জনগণকে বিভ্রান্ত করতে এহেন অপপ্রচারে লিপ্ত হন। তবে আশা ও স্বস্তির কথা হলো এসব তথাকথিত রাজনৈতিক পণ্ডিতের পূর্বাভাস অধিকাংশ ক্ষেত্রে আখেরে ভুয়া প্রমাণিত হতে দেখা যায়। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে তাদের অনেকের আন্দাজ-অনুমানেরও একই পরিণতি হয়।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীদের মুখে চুনকালি নিয়ে দেশের স্বার্থকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে তিনি তার প্রথম বিদেশ সফরের দেশ হিসেবে ভারতকে বাদ দিয়ে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেন। সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে গিয়ে তারেক রহমান বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পারস্পরিক স্বার্থের বহু বিষয়ও তার প্রথম বিদেশ সফরের দেশ নির্বাচনে বিবেচনায় নেন।

বাংলাদেশের জনশক্তির একটি বড় বাজার হলো মালয়েশিয়া, যেখানে প্রায় আট-নয় লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন, যা সেই দেশের বিদেশি শ্রমশক্তির প্রায় ৩৭ ভাগ। মালয়েশিয়ায় কর্মরত বিদেশি কর্মীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা সর্বোচ্চ। এসব বাংলাদেশি সেখানে শ্রম দিয়ে শুধু নিজের ও পরিবারের আর্থিক আয়-উন্নতি এবং জীবনযাত্রার মান বাড়াতেই ভূমিকা রাখছেন না, তাদের প্রেরিত কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন-অগ্রগতিতেও বিপুল অবদান রাখছে। তুচ্ছ রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দেন বলেই তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আরও অধিকসংখ্যক বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেশে বিদ্যমান প্রকট বেকার সমস্যা লাঘবের বিষয়টি তার কাছে অগ্রাধিকার পায়। সে জন্য এই সমস্যা লাঘবে সেখানকার শ্রমবাজার Explore করে তার সদ্ব্যবহার করার বিকল্প তার কাছে ছিল না। আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্য সফরেও এই বিষয়টি তার কাছে সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে-সেটা নিশ্চিত বলা যায়। তা ছাড়া অন্যান্যের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগ, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোটে (ASEAN)’ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির ইস্যু তারেক রহমানের সঙ্গে মালয়েশিয়া ও চীনের নেতাদের আলোচনায় গুরুত্ব পায়। 

আলোচনা-পরবর্তী সময়ে এরই মধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের উন্মুক্ত করার এবং বাংলাদেশে বিভিন্ন চীনা কোম্পানির বিপুল বিনিয়োগের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হওয়ার বার্তা মিডিয়াতে প্রকাশ পেতে দেখা যায়। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদারের ঘটনা বাংলাদেশের প্রতি ভারতের আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক বা Deterrent হিসেবে কাজ করার দিকটিও তারেক রহমান বিবেচনায় নেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের ওপর মালয়েশিয়ার তথ্য ও প্রকাশনা দফতরের তৈরি একটি ভিডিওতে তারেক রহমানকে গার্ড অব অনারের মঞ্চে লাল গালিচার ওপর দিয়ে হেঁটে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে যাওয়ার সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে বাংলাদেশের গায়ক হাবিব ওয়াহিদের ‘আমার বন্ধু জাদু জানে, মহাজাদু জানে’ গানটি বাজানো হয়, যা দুই নেতার মধ্যে বন্ধুত্বের কেমিস্ট্রিতে এক অসাধারণ দ্যুতি ছড়িয়ে দেয়। এ কারণে গানের এই কলিটি হালে বাংলাদেশের বহু মানুষের মুখে অহরিত গুঞ্জরিত হতে দেখা যায়। এই দুই নেতার কেমিস্ট্রি দেখে অতীতে তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগ্যান ও তদানীন্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা মনে পড়ছে। ১৯৮৮ সালের ১৬ নভেম্বর ওয়াশিংটনে এক রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় রেগ্যান বিভিন্ন ইস্যুতে মার্গারেট থ্যাচারের শক্তিশালী, বিচক্ষণ, অর্থবহ ভূমিকা দেখে পানপাত্র হাতে (Raising a toast) তার বক্তব্যে থ্যাচারকে একজন বিশ্বনেতা (A world leader in every meaning of the world) বলে তার বন্ধুত্ব পাওয়ায় তিনি ও তার স্ত্রী ন্যান্সি রেগ্যান গর্ববোধ করেন জানালে মার্গারেট থ্যাচার এহেন প্রশংসায় অভিভূত হয়ে রেগ্যানকে তার হৃদয় নিংড়ানো ধন্যবাদ (Heartfelt) জানান, যা কোনো দেশের দুই নেতার মধ্যে বন্ধুত্বের অধ্যায়ে এক এপিক দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের সম্পর্ক হবে স্বাধীন, পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও মমতার প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে, অন্য কিছুর ভিত্তিতে নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর তারই বার্তাবহ, যা আগামী দিনেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির Cornerstone হিসেবে বজায় থাকবে-এই বিশ্বাস রাখি।
লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz