বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন ও কিছু অপ্রিয় কথা

​পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন ও কিছু অপ্রিয় কথা

বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক সময়ে এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল ও বয়কটের দাবিতে দেশের কিছু শিক্ষার্থীর আন্দোলনের খবর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অতিবৃষ্টির কারণে দেশের কয়েকটি এলাকায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় সারা দেশের পরীক্ষা বাতিল করা হয়নি-এ অভিযোগ তুলে কিছু শিক্ষার্থী বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন করছে। কোথাও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, কোথাও সরকারবিরোধী স্লোগান, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও ট্রলের ঘটনাও দেখা গেছে।

বাংলাদেশে পাবলিক পরীক্ষা একটি নিয়মিত ও বৃহৎ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। প্রতিবছরই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে বন্যা, অতিবৃষ্টি কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। এবারও চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরীক্ষাগুলো স্থগিত করেছে। অর্থাৎ স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আক্রান্ত এলাকার পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পরও সারা দেশের পরীক্ষা বাতিলের দাবি কতটা যৌক্তিক, তা আমার বোধগম্য নয়।

শিক্ষাজীবনে প্রায় প্রত্যেকেরই প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমাদের সময় মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে শিক্ষকেরা বেতন-ভাতার দাবিতে ধর্মঘট করেছিলেন এবং পরীক্ষা পেছানোর দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু সরকার পরীক্ষা স্থগিত না করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করে। শিক্ষকদের অনুপস্থিতিতে সেই পরীক্ষা দেওয়া সহজ ছিল না। পরবর্তীকালে কলেজজীবনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কারণে দীর্ঘদিন নিয়মিত ক্লাস করা সম্ভব হয়নি। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদের পতনের পরও নির্ধারিত সময়েই আমাদের স্নাতক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আবার মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষার সময় ভয়াবহ বন্যায় ঢাকার অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। তখন রামপুরার বাসায় যেতে বাঁশের সাঁকো পার হতে হতো। এত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পরীক্ষা পেছানো হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে মনে হয়, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যার কারণে সারা দেশের জাতীয় পরীক্ষা স্থগিত করার নজির তৈরি হলে ভবিষ্যতে সময়মতো পরীক্ষা আয়োজন করাই কঠিন হয়ে পড়বে।

শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রতিবছর লক্ষাধিক শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং এ পরীক্ষা তাদের উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তাই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ, প্রত্যাশা ও যৌক্তিক দাবিকে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তবে কোনো দাবি যদি বাস্তবতা ও যুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে তা মেনে নেওয়াও সম্ভব নয়। একইভাবে আন্দোলনের নামে আইন ভঙ্গ বা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকদের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার রয়েছে। শিক্ষার্থীরা এর ব্যতিক্রম নয়। পরীক্ষা, প্রশ্নপদ্ধতি, সময়সূচি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অসংগতি থাকলে তারা প্রতিবাদ করতেই পারে। তবে সেই প্রতিবাদের ভাষা, পদ্ধতি ও দাবি হতে হবে যুক্তিসংগত, শান্তিপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত। কারণ ইতিবাচক পরিবর্তন আসে গঠনমূলক আন্দোলনের মাধ্যমেই। এখন দেখছি কিছু শিক্ষার্থী সড়ক অবরোধ করে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ দাবি করছে। কিন্তু তারা হয়তো বিবেচনা করছে না, পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি বা পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছায় হয় না। শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং প্রশাসনের সমন্বিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এসব বিষয় নির্ধারিত হয়। তাই সামগ্রিক প্রক্রিয়া বিবেচনা না করে শুধু মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিফলন নয়।

আমার বিশ্বাস, কোনো ভালো ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে রাজপথে নামেনি। খারাপ শিক্ষার্থী যারা সারা বছর পড়ার টেবিলে বসেনি, তাদের একটি অংশ হয়তো পরীক্ষা না দেওয়ার সুযোগ প্রত্যাশা করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে নিজেদের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেÑএমন অভিযোগও বিভিন্ন মহলে শোনা যাচ্ছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া উচিত। তবে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তা চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়াও সমীচীন নয়।

অতীতে অটোপাসের অভিজ্ঞতা থাকলেও সেটি ছিল একটি বিশেষ পরিস্থিতির ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। অটোপাসের মাধ্যমে সনদ অর্জন করা সম্ভব হলেও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার এই যুগে প্রকৃত দক্ষতা, জ্ঞান ও যোগ্যতার কোনো বিকল্প নেই। একটি সফল জীবন গড়তে নিয়মিত অধ্যয়ন, সুশৃঙ্খল প্রস্তুতি এবং কঠোর পরিশ্রমই সবচেয়ে বড় পুঁজি।

শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা কোনো দেশের জন্যই কল্যাণকর নয়। তাই শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও সরকারের মধ্যে আন্তরিক সংলাপের মাধ্যমেই সমস্যার টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা উচিত। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য বিভাজন সৃষ্টি নয়; বরং জ্ঞান, যুক্তিবোধ ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্যেই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সংযম, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিচয় দেবেÑএটাই প্রত্যাশা।
লেখক : কলামিস্ট ও কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট, নিউইয়র্ক।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz