কথা ছিলো ডিসেম্বরে জমবে মাঠভরা আন্দোলন। শেখ হাসিনার স্বেচ্ছা-প্রত্যাবর্তন ঘিরে প্রস্তুতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ‘গৃহযুদ্ধের’ প্রক্রিয়া। ডানপন্থীদের মতে 'হাসিনা-আ.লীগ বনাম বাংলাদেশ'। জুলাই আন্দোলনের চেয়েও ভয়াবহ হবে পরিস্থিতি। 'হাসিনা-ঠেকানো' প্রকল্পে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি এককাট্টা। জুলাই যোদ্ধারাও নিচ্ছে বিশেষ প্রস্তুতি। কিন্তু প্রতিপক্ষ ডিসেম্বরের অপেক্ষায় বসে নেই। নভেম্বরের হালকা শীতেই চালিয়েছে মহড়া। গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বিতর্কে টালমাটাল পরিস্থিতি। ৬৭৫টি গার্মেন্টস আন্দোলনের মুখে বন্ধ। শিল্প এলাকাসমূহে পুলিশের গাড়ি অগ্নিদগ্ধ। ব্যাপক ধর-পাকড়-অচলাবস্থা।
ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী বিশেষ বৈঠক সেরেছেন। আন্দোলনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। ভারতে হাত্রলীগ-যুবলীগের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ সংবাদও পাওয়া গেছে। চলমান আন্দোলনে অর্থায়ন করেছে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতারা। সবকিছুর বিরুদ্ধে চলছে সাঁড়াশি অভিযান।
সাড়ে ১২ বছরের মজুরি ৩০ হাজার টাকা দাবি আন্দোলনে সমানে বাতিল হচ্ছে ওয়ার্ক-অর্ডার আসন্ন ঈদের বেতন-বোনাস-ঢাকরি অনিশ্চিত
গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। 'গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদ' তুলেছে নতুন দাবি। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে চলে বিপ্লবের প্রস্তুতি। খ্যাতিমান শ্রমিকনেত্রী মেশরেফা মিশু ঘোষণা করেন দাবিনামা। ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। শুধু গার্মেন্টস মালিক বা সমিতি নয়। সরকারকেও এই দাবিনামা মানতে হবে। অর্থাৎ গার্মেন্টস সেক্টরের পাশাপাশি সরকারকেও জড়ানো হয়। ফলে সচেতন মহলে প্রশ্ন ওঠে বিষয়টি রাজনীতিঘনিষ্ঠ। হঠাৎ আড়াই গুণ বেতন বৃদ্ধির দাবিটিকে অনেক অস্বাভাবিক বলেন।
অন্যদিকে আন্দোলনকারী নেতাদের ভাষাও জোরালো। বলেন এখন দ্রব্যমূল্যের মারাত্মক উর্ধগতি। বাসা ভাড়া, পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। দৈনন্দিন জীবনে আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বেশি। তাই বেতন-ভাতা না বাড়ালে জীবনযাত্রা অচল।
মালিকপক্ষ বলছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এমনটা ঘটেনি। একযোগে আড়াই গুণ বেতন বৃদ্ধির দাবিটি রহস্যজনক। অধিকাংশ শ্রমিক ওভারটাইম করে থাকে। সাড়ে ১২ হাজারের বেতন ১৫ থেকে ২০ হাজারে দাঁড়ায়। তাতে তাদের জীবনযাত্রা স্বাচ্ছন্দ্যময় থাকে। কিন্তু ৩০ হাজার টাকা আকাশকুসুম প্রস্তাবনা। আমরা প্রতিযোগিতামূলক দরে বিদেশের অর্ডার আনি। তাতে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়। কোনরকম টেনেটুনে পোশাক রপ্তানির ব্যবসা চলছে। এখন বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন মানে শিল্পটির মুখ থুবড়ে পড়বে।
উল্লেখ্য, ৬৭৫টি চালু গার্মেন্টস লে-অফ ঘোষণা করেছে। ফলে সাধারণ শ্রমিকেরা পড়েছে মহাবিপদে। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, মিরপুর, নারায়ণগঞ্জে চলছে অচলাবস্থা। দুটি প্রধান কারণে বিদেশি বায়াররা বাংলাদেশমুখী। গুণগত মান এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পোশাক প্রাপ্তি। কিন্তু ক্রমাগত আন্দোলনে বিদেশি বায়াররা বিরক্ত। দূর দেশের বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়ে উঠেছেন। আর এখন বেতন বৃদ্ধিতে সাশ্রয়ী মূল্য ব্যাহত হবে। তাই ক্রয়াদেশ বা ওয়ার্ক অর্ডার কমে যাচ্ছে
নিরাপত্তার আশঙ্কা ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেক বিনিয়োগকারী। পূর্ব নির্ধারিত সফর বাতিল করেছে বিদেশিরা। ফলে পরবর্তী দুটি উৎপাদন মৌসুম কার্যাদেশ পাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে ব্যাপক লোকসান গুণবে পোশাকশিল্প। আসন্ন ঈদে উৎসব ভাতা, বোনাস প্রাপ্তি অনিশ্চিত। শ্রমিকদের চাকরি রক্ষাও কঠিন হয়ে উঠবে।
আন্দোলনকারী নেতাদের ভাষ্য অবশ্য ভিন্ন। তাদের মতে, বিনিয়োগকারী বা বায়াররা বাংলাদেশের অনুরক্ত। পরিশ্রমী শ্রমিকশিল্পীরা তাদের বিশেষ পছন্দের। সেই শ্রমজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে তারাও আগ্রহী। তাই বুঝিয়ে বললে পোশাকের সামান্য উচ্চমূল্য মেনে নেবে। এক্ষেত্রে সরকার পক্ষকেও উদ্যোগী হতে হবে
প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে 'জরুরী আইনে'র প্রস্তুতি গার্মেন্টস আন্দোলনে আ.লীগের সম্পৃক্ততায় সরকার উদ্বিগ্র মিজোরামে 'ছাত্রলীগের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ'
সদ্য জাপান ফেরৎ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বসে নেই। গত ২ নভেম্বর সন্ধ্যায় সচিবালয়ে বিশেষ বৈঠক ডাকেন। গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনের অনেকগুলো দুর্লভ তথ্য পান। সাধারণ শ্রমিকরা আন্দোলনে ততটা আগ্রহী নন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রাজনেতিক সংশ্লিষ্টতার খবর দেন। প্রায় ১০ জন সাবেক মন্ত্রী-এমপির সংযোগের কথা জানান। আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের সক্রিয়তার প্রমাণ দেন। কারাগারে থাকা শিল্প-উদ্যোভা সালমান এফ রহমানও তালিকায়। শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। অভিযোগ, আওয়ামীপন্থী কিছু গার্মেন্টস মালিকও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
সভায় তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তীরা ছিলেন। ডিসেম্বরের কর্মসূচি নভেম্বরে শুরুর তথ্য পান। আন্দোলনে অর্থায়নের সূত্রগুলো ধরার সিদ্ধান্ত হয়। ভারতের মিজোরাম রাজ্যে সশস্ত্র প্রশিক্ষণের তথ্য মেলে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ৩০০ করুণ প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। ডি নিচ্ছে। ডিসেম্বরের কালিক্রত কাঙ্ক্ষিত 'হাসিনা প্রত্যাবর্তন প্রকল্পে'র সঙ্গী তারা। আন্দোলন সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয় সভায়। পুলিশের একাধিক পাড়ি অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। ৫০০-এর অধিক আন্দোলনকারী গ্রেফতার। জ্বালাও-পোড়াও পরিস্থিতি বহাল রয়েছে। ক্ষতির আশঙ্কায় মেট্রোরেল মূলত বন্ধ। অনেক স্পর্শকাতর এলাকায় যান চলাচল বন্ধ। আত্মরক্ষার্থে রাবার বুলেট ছোড়ার অনুমতি মেলে। তবে কোন প্রকার হতাহত না করার সিদ্ধান্ত হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর অপপ্রচার চলমান। ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের ছবি-ভিডিও চালানো হচ্ছে। মিডিয়া থেকে সরানো হচ্ছে ভুয়া নিউজকার্ড। জানানো হচ্ছে ২/৫/৭ জন নিহত। এগুলোর প্রতিবাদ বা প্রতিহত করতে সরকার নাজেহাল।
পরদিন ৩ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী যান বঙ্গভবনে। জাপান সফরের অভিজ্ঞতা প্রেসিডেন্টকে অবহিত করেন। গার্মেন্টস শিল্পের অস্থিরতা পর্যালোচনা করা হয়। ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন পরিস্থিতিও আলোচিত হয়। অস্থিরতা বাড়লে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের প্রসঙ্গ ওঠে। সে ক্ষেত্রে জরুরী অবস্থা জারির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণেরও সিদ্ধান্ত হয়। আন্দোলনের পরিস্থিতির ওপর সরকার পক্ষ বক্তব্য দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। বলেছেন, গার্মেন্টস আন্দোলনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। পরাজিত শক্তি অচলাবস্থা সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে। ডিসেম্বরকে ঘিরে নভেম্বরের মহড়া চালানো হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশে সশস্ত্র প্রস্তুতি চলছে। সরকার সব ষড়যন্ত্র রুখতে বদ্ধপরিকর। নভেম্বরের মহড়া ডিসেম্বরে আলোর মুখ দেখবে না। বাংলাদেশের জনগণকে জুজু বুড়ির ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।