প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:০৫
•
অনলাইন সংস্করণ
কানাডা : টরন্টোতে ফোবানা সম্মেলনের শাহ নেওয়াজসহ অন্যান্যরা।
হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশির অংশগ্রহণ, দেশ-বিদেশের শিল্পী-অতিথিদের উপস্থিতি এবং বাংলাদেশি সংস্কৃতির নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে কানাডার টরন্টোয় শেষ হয়েছে তিন দিনব্যাপী ৪০তম ফোবানা সম্মেলন। তবে উৎসবমুখর আয়োজনের পাশাপাশি এবারের সম্মেলন ঘিরে আলোচনার বড় একটি অংশ ছিল ফোবানার চলমান বিভক্তি এবং টরন্টো আয়োজক অংশের শীর্ষ তিন নেতার সম্মেলনে অনুপস্থিতি। উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে একই সময়ে একাধিক পক্ষের ‘৪০তম ফোবানা’ আয়োজন হওয়ায় চার দশকের পুরোনো সংগঠনটির ঐক্য ও ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত টরন্টো সম্মেলনের প্রথম দিনের আয়োজন ছিল ডন ভ্যালি হোটেল অ্যান্ড সুইটসে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন ফোবানা এবং ‘টেস্ট অব বাংলাদেশ’-এর যৌথ উদ্যোগে ড্যানফোর্থ রোড ও বার্চমাউন্ট রোড এলাকায় বড় আকারের উন্মুক্ত বাংলাদেশি মেলার আয়োজন করা হয়। সেখানে খাবার, পোশাক, গয়না ও দেশীয় পণ্যের স্টলের পাশাপাশি সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠান ছিল। আয়োজক সংগঠন ছিল বাংলাদেশ সোসাইটি অব কানাডা।
টরন্টো সম্মেলনের প্রস্তুতিতে ফোবানা স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যান গিয়াস আহমেদ, চিফ পেট্রন ও সাবেক চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ, ড. আবু জুবায়ের দারা, এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি ফিরোজ আহমেদ, জয়েন্ট এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি শাহাব উদ্দিন সাগর এবং স্থানীয় আয়োজকদের নাম সামনে আসে। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত প্রাক-সম্মেলন সংবাদ সম্মেলনে টরন্টো সম্মেলনের কনভেনর হিসেবে দেওয়ান আজিম ও খোকন রহমান এবং মেম্বার সেক্রেটারি হিসেবে জহুরুল ইসলাম ও জাহিদ চৌধুরীর নাম জানানো হয়।
সম্মেলনের প্রথম দিন বাংলাদেশের সংস্কৃতি, বিনোদন ও ক্রীড়াঙ্গনের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ফরিদা আখতার ববিতা, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, সাবেক ফুটবলার এনায়েতুর রহমান এবং অভিনেত্রী শান্তা ইসলাম। উদ্বোধনী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন সেলিম চৌধুরী ও আঁখি আলমগীরসহ বাংলাদেশ ও টরন্টোর স্থানীয় শিল্পীরা।
সমাপনী দিনে মঞ্চ মাতান ডলি সায়ন্তনী, ফকির সাহাবুদ্দিন ও শাহনাজ বেলী, রানো নেওয়াজ, অনিক রাজ প্রমুখ।
স্থানীয় মূলধারার রাজনীতিবিদদেরও উপস্থিতি ছিল। বিভিন্ন দিনে উপস্থিত বা বক্তব্য প্রদানকারীদের মধ্যে ছিলেন টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চাও, স্থানীয় এমপি তানভীর শাহনাওয়াজ, কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী ডা. আমানউল্লাহ তরুণ, সিটি কাউন্সিলর পার্থি কান্দাভেলসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরা।
সম্মেলনের আগে আয়োজকেরা বাংলাদেশের তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দীন স্বপন, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার নাহিদা সোবহানের উপস্থিতির কথা জানিয়েছিলেন। তবে সম্মেলনে তাদের অনুপস্থিতি নিয়েও কমিউনিটিতে আলোচনা রয়েছে।
আলোচনায় শীর্ষ তিন নেতা অনুপস্থিত : টরন্টো ফোবানা সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল সংশ্লিষ্ট ফোবানা অংশের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি। তারা হলেন- ফোবানা এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান গিয়াস আহমেদ, এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি ফিরোজ আহমেদ এবং সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান কাজী সাখাওয়াত হোসেন আজম।
২০২৫ সালে এই অংশের যে নির্বাহী কমিটি ঘোষিত হয়েছিল সেখানে গিয়াস আহমেদ চেয়ারম্যান, ফিরোজ আহমেদ এক্সিকিউটিভ মেম্বার সেক্রেটারি এবং কাজী সাখাওয়াত হোসেন আজম সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ফলে ৪০তম বর্ষের মতো প্রতীকী একটি সম্মেলনে একই সঙ্গে তিন শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়।
কমিউনিটির একাংশের প্রশ্ন- যে সম্মেলনকে ‘ইতিহাসের বৃহত্তম’ কিংবা ‘সেরা ফোবানা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেই সম্মেলনে কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান, নির্বাহী সচিব ও ভাইস চেয়ারম্যান না থাকলে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও হোস্ট কমিটির মধ্যকার সমন্বয়ের চিত্র কী দাঁড়ায়? আবার অন্যপক্ষের যুক্তি, ব্যক্তিগত ও পূর্বনির্ধারিত ব্যস্ততার কারণে কারও অনুপস্থিতি সম্মেলনের সাংগঠনিক বৈধতা বা সাফল্য নির্ধারণ করে না। আয়োজকদের স্থানীয় টিম ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতা সম্মেলন পরিচালনা করেছেন।
শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতির চেয়েও বড় সংকট অবশ্য ফোবানার দীর্ঘদিনের বিভক্তি। এবার ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর একই লেবার ডে উইকেন্ডে টরন্টো, নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস ও অরল্যান্ডো- চার শহরে পৃথক চারটি পক্ষ ফোবানার চার দশক পূর্তির সম্মেলন আয়োজন করে।
১৯৮০-এর দশকে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের এক প্ল্যাটফর্মে আনা, নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের ভাষা-সংস্কৃতি তুলে ধরা এবং প্রবাসীদের পারস্পরিক যোগাযোগ শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই ফোবানার যাত্রা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নির্বাচন, নেতৃত্ব, কনভেনশনের স্থান ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধ বাড়তে থাকে।
এবারের চারটি সমান্তরাল আয়োজন সেই বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করেছে। প্রবাসী কমিউনিটির একাংশের অভিযোগ, একসময় উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ফোবানা এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, প্রভাব বিস্তার এবং ‘কে আসল ফোবানা’—এই বিতর্কে আটকে পড়েছে। বিডিনিউজের প্রতিবেদনে প্রবাসীদের একটি অংশের বরাতে একই সঙ্গে ‘মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যাওয়া’ এবং অতিরিক্ত তারকানির্ভর সাংস্কৃতিক আয়োজনের সমালোচনার কথাও উঠে এসেছে।
তবে টরন্টোর আয়োজকেরা বলছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন, প্রবাসী নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, বাংলাদেশি সংস্কৃতি তুলে ধরা এবং কানাডার মূলধারায় বাংলাদেশি কমিউনিটির অংশগ্রহণ বাড়ানো। প্রস্তুতিকালীন সংবাদ সম্মেলনে গিয়াস আহমেদ ও অন্য নেতারা একে সর্বজনীন আয়োজন হিসেবে তুলে ধরে প্রবাসীদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
টরন্টোর মাঠের চিত্র বলছে, সাংস্কৃতিক ও মেলার আয়োজন দর্শক টানতে সক্ষম হয়েছে। মেয়র অলিভিয়া চাওসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ, ববিতা-জুয়েল আইচের মতো পরিচিত মুখ, জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীদের পরিবেশনা এবং উন্মুক্ত বাংলাদেশি মেলা, সব মিলিয়ে স্থানীয় বাংলাদেশিদের জন্য এটি ছিল বড় উৎসব। কিন্তু ৪০তম বর্ষে এসে ফোবানার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর শুধু কত দর্শক এলেন কিংবা কতজন তারকা মঞ্চে উঠলেনম তা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের ঐক্যের নামে গড়ে ওঠা সংগঠনটি নিজেই যদি একই সপ্তাহান্তে চার শহরে চারটি ‘৪০তম ফোবানা’ আয়োজন করে, তবে আগামী প্রজন্মের কাছে ফোবানার পরিচয় কী হবে?
টরন্টো সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট অংশের চেয়ারম্যান, নির্বাহী সেক্রেটারি ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিও সেই বৃহত্তর সাংগঠনিক সংকটের আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। উৎসব সফল হলেও চার দশকের ফোবানাকে ঘিরে তাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনাটি হয়তো এখন মঞ্চের বাইরে, বিভক্তি পেছনে ফেলে আবারও একটি গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মে ফেরা সম্ভব কি না।