শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :
• নেতানিয়াহু যা-ই করুন, সরকার গঠন করতে পারবেন না : ইয়ার লাপিদ • প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রশস্ত হয়েছে : হুমায়ুন কবির • কিছু লোকের ধাওয়ায় তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেয় : পিবিআইকে দ্বীপ • ইরানে হামলার প্রস্তুতি জোরালো, ইসরায়েলে মার্কিন বিমানের বহর • এক শর্তে জয়া আহসানের সঙ্গে কফি খাওয়ার সুযোগ • ওরেগনে মাঝ আকাশে দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ, নিহত ৩ • ফাইনালে হেরে বিশ্বকাপে ১৩০তম হলো বাংলাদেশ • ‘পুলিশের লোকের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয় তাহসিফ, আমি পালিয়ে আসি’ • প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি, তদন্তে কমিটি • প্রতিদিনের যে ৫ অভ্যাস নীরবে আপনার লিভারের ক্ষতি করছে

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
উত্তর আমেরিকার চার সিটিতে ফোবানা সম্মেলন

লস অ্যাঞ্জেলেস বসেছিল প্রবাসীদের মিলনমেলা

লস অ্যাঞ্জেলেস বসেছিল প্রবাসীদের মিলনমেলা

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শিকড়ের সঙ্গে প্রবাসের নতুন প্রজন্মের বন্ধন আরও দৃঢ় করার প্রত্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত হলো ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন্স ইন নর্থ আমেরিকার (ফোবানা) ৪০তম সম্মেলন। ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনের ভেন্যু ছিল লস অ্যাঞ্জেলেসের ইউনিভার্সাল সিটি হিলটন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়ার (বাক) আয়োজনে অনুষ্ঠিত এবারের সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, কানাডাসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি অংশ নেন। উত্তর আমেরিকার ২২টি শহরের প্রায় ৬৭টি সংগঠনের
অংশগ্রহণে এবারের আয়োজন ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্যে ফোবানার চার দশকের পথচলায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায় সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এবারের সম্মেলনে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, প্রবাসের নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের চর্চা ধরে রাখতে ফোবানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। চার দশক ধরে উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশিদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন জোরদারে সংগঠনটির ধারাবাহিক ভূমিকার প্রশংসা
করেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন না, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বও করছেন। নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা সংস্কৃ তির চর্চা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিবাচক ইতিহাস ও অর্জন বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
দেশে বিনিয়োগে প্রবাসীদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে তাঁর মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগেরও পরামর্শ দেন তিনি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে লস অ্যাঞ্জেলেসসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরের বাংলাদেশি কমিউনিটির সমাজসেবী, মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ, ব্যবসায়ী, শিল্পী, গণমাধ্যমকর্মী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, পৃষ্ঠপোষক এবং ফোবানার সাবেক ও বর্তমান নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ফোবানার ৪০তম সম্মেলনের আয়োজক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়া। সম্মেলনের হোস্ট কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন ড. জয়নুল আবেদীন, সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইকবাল এবং প্রেসিডেন্ট মোয়াজ্জেম চৌধুরী।
ফোবানার ২০২৫-২৬ এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারপারসন ছিলেন রবিউল করিম বেলাল (পেনসিলভানিয়া), ভাইস চেয়ারপারসন এম রহমান জহির (ফ্লোরিডা), এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি খালেদ রউফ (শিকাগো), জয়েন্ট এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি অ্যান্থনি পিয়ুস গোমেজ (ভার্জিনিয়া) এবং ট্রেজারার মহিন উদ্দিন দুলাল (আটলান্টা)।
সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তিন দিনের বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক আয়োজন। স্থানীয় শিল্পী ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও প্রবাসের জনপ্রিয় শিল্পীদের পরিবেশনায় প্রতিদিনই মুখর ছিল সম্মেলনস্থল। প্রথম দিনের সাংস্কৃতিক আয়োজনে ভাবনা, অ্যাপোলো, পুলে বালা, কুতুবী, উর্মি আথার, মিতালী, সিম্মি ও ঋতুপর্ণাসহ বিভিন্ন শিল্পী ও ব্যান্ড অংশ নেয়।
দ্বিতীয় দিনে স্থানীয় এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে আসা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনার পর মঞ্চে আসেন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিবেশনা করা তরুণ প্রজন্মের শিল্পী সঞ্জয় এবং চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠের ঝিলিক। তাঁদের পরিবেশনায় দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উচ্ছ্বাস দেখা যায়। সমাপনী দিনেও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরের সংগঠনগুলোর সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পর সংগীত পরিবেশন করেন এ প্রজন্মের জনপ্রিয় শিল্পী ইমরান, কণা ও মুজা। তাঁদের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তিন দিনের সাংস্কৃতিক উৎসব পূর্ণতা পায়।
এবারের ফোবানা সম্মেলন শুধু সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিন দিনের কর্মসূচিতে ব্যবসা, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ক্ষমতায়ন এবং নতুন প্রজন্মকে ঘিরে অনুষ্ঠিত হয় একাধিক আলোচনা ও সেমিনার। ছিল কাব্য ও সাহিত্য আসর, ফোবানা গ্রন্থমেলা, ইয়ুথ ফোরাম ও নেটওয়ার্কিং, অনাবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের আলোচনা, তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপ প্রদান এবং কারুপণ্যের প্রদর্শনী।
শনিবার ও রোববার বিশিষ্ট সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত হয় দুটি বিশেষ সেমিনার। শনিবারের সেমিনারের বিষয় ছিল ‘আর নয় অভিযোগ, এবার বলুন সমাধানের কথা’। এতে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং ক্যালিফোর্নিয়ার বিশিষ্ট রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ও একাধিক হাসপাতালের কর্ণধার ডা. কালী প্রদীপ চৌধুরীসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরের বিশিষ্টজনেরা।
রোববার অনুষ্ঠিত হয় ‘এদেশে নতুন প্রজন্মের ভাবনায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনার। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশকে কীভাবে দেখে এবং মাতৃভূমির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কীভাবে আরও গভীর করা যায়—সেই ভাবনাই উঠে আসে আলোচনায়।
নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে বিশেষ সেমিনারের পাশাপাশি ছিল তরুণদের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি, চিকিৎসাবিষয়ক সেমিনার এবং বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ নিয়েও ছিল বিশেষ আলোচনা। সম্মেলনের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হয় ‘এআইয়ের বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর’ শীর্ষক একটি সেমিনার।
ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে ছিল পৃথক নেটওয়ার্কিং ও বিজনেস সেশন। দ্বিতীয় দিনের সকালে অনুষ্ঠিত হয় ফোবানা অ্যালামনাইদের আলোচনা সভা। পরে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে আগত ব্যবসায়ী, পৃষ্ঠপোষক, ফোবানা কর্মকর্তা ও অতিথিদের অংশগ্রহণে আয়োজন করা হয় রেড কার্পেট মধ্যাহ্নভোজ।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে প্রদান করা হয় ফোবানা স্কলারশিপ। এ বছর আটজন শিক্ষার্থীকে স্কলারশিপ দেওয়া হয়। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে এ কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের কয়েক শ শিক্ষার্থীকে কয়েক লাখ ডলারের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রতিবছর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন করে শিক্ষার্থীকে এ কর্মসূচির আওতায় স্কলারশিপ দেওয়া হয় বলে আয়োজকেরা জানান।
সম্মেলনের তৃতীয় ও শেষ দিন ৬ সেপ্টেম্বর রোববার অনুষ্ঠিত হয় ফোবানার বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম)। সভায় বিদায়ী এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারপারসন রবিউল করিম বেলাল সংগঠনকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কাঠামোর বদলে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, নেতৃত্বের পরিবর্তন হবে, কিন্তু নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে যেন সংগঠনের অভিজ্ঞতা, আর্থিক শৃঙ্খলা, নীতিমালা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হারিয়ে না যায়। তাঁর ভাষায়, ‘ফোবানা কোনো চেয়ারপারসন, কোনো নির্বাহী সচিব কিংবা কোনো একটি নির্বাহী কমিটির সংগঠন নয়; ফোবানা একটি প্রতিষ্ঠান।’
এজিএম শেষে অনুষ্ঠিত হয় ফোবানার ২০২৬-২৭ মেয়াদের নির্বাচন। এতে বিভিন্ন শহরের ৬৭টি সংগঠনের কাউন্সিলররা অংশ নেন। নির্বাচন শেষে ঘোষণা করা হয় ৩১ সদস্যবিশিষ্ট নতুন নির্বাহী কমিটি।
নতুন কমিটিতে ফ্লোরিডার এম রহমান জহির চেয়ারপারসন, নিউইয়র্কের আবীর আলমগীর ভাইস চেয়ারপারসন, ভার্জিনিয়ার ড. প্রিয়লাল কর্মকার এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি, ভার্জিনিয়ার অ্যান্থনি পিয়ুস গোমেজ জয়েন্ট এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি এবং হিউস্টনের নাহিদা নাসের ইয়াসমি ট্রেজারার নির্বাচিত হয়েছেন।
এ ছাড়া নয়জন আউটস্ট্যান্ডিং মেম্বার এবং ১৭টি এক্সিকিউটিভ মেম্বার সংগঠন নির্বাচিত হয়েছে। আগামী এক বছর নতুন কমিটি সংগঠনটির নেতৃত্ব দেবে। নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে ফোবানাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক, স্বচ্ছ ও নতুন প্রজন্মমুখী সংগঠনে পরিণত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা।
চার দশক আগে উত্তর আমেরিকায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করা ফোবানা সময়ের সঙ্গে পরিণত হয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বড় বার্ষিক মিলনমেলায়।
এবারের সম্মেলনেও তাই শুধু বিনোদন নয়, সমান গুরুত্ব পেয়েছে নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেওয়া, প্রবাসী পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে প্রবাসীদের সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়গুলো।
তিন দিনের আলোচনা, সেমিনার, সংগীত, সাহিত্য, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিং ও সাংস্কৃতিক আয়োজন শেষে রোববার রাতে পর্দা নামে লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত ৪০তম ফোবানা সম্মেলনের।
চার দশকের পথচলার মাইলফলক ছুঁয়ে এবারের সম্মেলন যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—নেতৃত্ব বদলাবে, প্রজন্ম বদলাবে, সময়ও বদলাবে; কিন্তু উত্তর আমেরিকার মাটিতে বাংলাদেশি পরিচয়, সংস্কৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে প্রবাসীদের বন্ধন আরও দৃঢ় করার যে যাত্রা, তা চলবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

 
© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz