নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে অনুষ্ঠিত হলো প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘১৬তম ব্রুকলিন পথমেলা’। গত ৬ জুন দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চার্চ অ্যাভিনিউয়ের লিটল বাংলাদেশ এলাকা ছিল উৎসবের রঙে রঙিন। চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড বাংলাদেশি বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের (সিএমবিবিএ) উদ্যোগে আয়োজিত এ পথমেলায় নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট থেকে আসা কয়েক হাজার বাংলাদেশি অংশ নেন। বাংলাদেশের কোনো গ্রামীণ মেলা কিংবা বৈশাখী উৎসবের আবহ যেনো একদিনের জন্য স্থান করে নেয় পথমেলায়। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদের নিয়ে মেলায় যোগ দেন প্রবাসীরা। দীর্ঘদিন পর পরিচিত মুখের সঙ্গে দেখা, আড্ডা, কেনাকাটা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগের মধ্য দিয়ে দিনভর মুখর ছিল পুরো এলাকা।
মেলায় ছিল দেশীয় পোশাক, গয়না, প্রসাধনী, হস্তশিল্প এবং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য স্টল। বিশেষ করে শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি এবং বাংলাদেশি ঐতিহ্যের বিভিন্ন পণ্য দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। অনেকেই ঈদ ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের কেনাকাটাও সেরে নেন এ মেলা থেকে।
খাবারের অংশে ছিল দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি ভিড়। ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, কাবাব, পিঠাপুলি, আম ও বরইয়ের আচারসহ বাংলাদেশি নানা মুখরোচক খাবারের স্টলগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। প্রবাসে থেকেও দেশীয় স্বাদের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান অনেকে।
মেলায় আসা দর্শনার্থীরা বলেন, এমন আয়োজন তাদেরকে শেকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধনের পরিচয় তুলে ধরতে এ ধরনের উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শুধু বিনোদন নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কমিউনিটি নেটওয়ার্কিংয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ব্রুকলিন পথমেলা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য ও সেবা প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছেন, একইসঙ্গে কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠন নিজেদের কার্যক্রম সম্পর্কে দর্শনার্থীদের অবহিত করেছে।
মেলার উদ্বোধন করেন নিউইয়র্কের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক হাজী আব্দুল কাদের মিয়া। প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ফজলুল কাদের। সভাপতিত্ব করেন ‘আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশন’-এর পরিচালক ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফখরুল আলম, বাংলাদেশ সোসাইটির আসন্ন নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ও বাংলাদেশী আমেরিকান ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির নেতা ফিরোজ আহমেদ, স্বন্দ্বীপ পৌরসভা কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও ব্যবসায়ী মো. জাফরউল্লাহ, সমাজসেবক ইঞ্জিনিয়ার ফজলুল কাদের এবং কমিউনিটি লিডার কাজী আজম। কনভেনার মামুন উর রশীদ, চিফ কো-অর্ডিনেটর আবুল এম মহিউদ্দিনসহ কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মেলায় উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সিএমবিবিএ’র প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সংগঠনের উন্নয়ন ও কার্যক্রমে নিরলস অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ সাবেক সভাপতি মহিউদ্দিন হাসানকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে সংগঠনের প্রয়াত নেতৃবৃন্দÑ আব্দুর রব, অধ্যাপক সরোয়ার বি. সালাম, ওবায়দুল হক, মিনহাজউদ্দিন বাবর, বেলায়েত হোসেন, মহিউদ্দিন মাহমুদ দুলাল, কামাল আহমেদ ও আবুল হোসেনের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
আয়োজকরা জানান, এবারের পথমেলা তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশেই উৎসর্গ করা হয়েছে।
মেলা উপলক্ষে পাঠানো এক শুভেচ্ছা বার্তায় নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি বলেন, বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় এই নগরীর উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাঙালি কমিউনিটির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন এবং তাদের অব্যাহত অবদানের জন্য অভিনন্দন জানান।
অপর এক শুভেচ্ছা বার্তায় নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল সদস্য শাহানা হানিফ বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পথমেলার মতো আয়োজন শুধু সাংস্কৃতিক বন্ধনই দৃঢ় করে না, বরং বহুজাতিক সমাজে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিচিতিও তুলে ধরে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে আব্দুল কাদের মিয়া বলেন, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করানোর পাশাপাশি কমিউনিটির মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
তিনি জানান, প্রতিবছরই পথমেলার পরিধি ও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে। ভবিষ্যতে আরো বৃহৎ পরিসরে এবং নতুন নতুন আয়োজন যুক্ত করে মেলাকে সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিএমবিবিএ সভাপতি রফিকুল ইসলাম পাটোয়ারী এবং সাধারণ সম্পাদক মঈনুল আলম বাপ্পীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে পথমেলা কমিটির কনভেনার মামুন উর রশীদ জানান, প্রবাসে বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে জীবন্ত রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে দেশপ্রেম ও সাংস্কৃতিক চেতনা ছড়িয়ে দিতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে।
তার মতে, পথমেলা শুধু একটি উৎসব নয়, এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের পরিচয়, ঐক্য এবং শেকড়ের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক।
মেলায় শিশু-কিশোরদের জন্য ছিল বিশেষ বিনোদনের ব্যবস্থা। বিভিন্ন ধরনের খেলনা, রাইড এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে তারা অংশ নেয় উৎসাহের সঙ্গে। এছাড়া শিশুদের কবিতা আবৃত্তি, নৃত্য পরিবেশনা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ দর্শকদের মুগ্ধ করে।
সন্ধ্যার পর শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মূল পর্ব। বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ। দর্শনার্থীরা প্রিয় শিল্পীদের গান উপভোগ করেন এবং অনেকেই কণ্ঠ মিলিয়ে অংশ নেন আনন্দ উৎসবে।
কমিউনিটি সার্ভিসে বিশেষ অবদানের জন্য নার্গিস আহমেদ, মো. কাদের মিয়া, ফজলুল কাদেরসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
একই অনুষ্ঠানে কমিউনিটির ইতিহাস, কর্মকাণ্ড ও স্মৃতিচারণ নিয়ে প্রকাশিত দৃষ্টিনন্দন স্মরণিকা ‘সওদাগর’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
কমিউনিটি লিডার মো. জাফরউল্লাহ অতিথি ও আয়োজকদের সঙ্গে নিয়ে স্মরণিকাটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা ঘোষণা করেন।
দিনব্যাপী নানা আয়োজনের পর র্যাফেল ড্র অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটি গাড়ি উপহার দেয়া হয়, যা দর্শনার্থীদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ সৃষ্টি করে। বিজয়ীর নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে উচ্ছ্বাস ও আনন্দের আবহে শেষ হয় ১৬তম ব্রুকলিন পথমেলা