মক্কা চুক্তি জোট ও ইরানের ঐতিহাসিক বৈঠক : বিশ্ব রাজনীতির নয়া সমীকরণ
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:২৮
•
অনলাইন সংস্করণ
তেহরানে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বৈঠকে বসেন সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক ও ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক হামলা ও অর্থনৈতিক অবরোধের হুমকির মুখে মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত হয়েছে নজিরবিহীন চারপক্ষীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশীদার তিন দেশ— সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষ প্রতিনিধিরা তেহরানে ইরানি প্রশাসনের সঙ্গে এই রুদ্ধদ্বার আলোচনায় অংশ নেন। খবর আলজাজিরার। ইরানে মার্কিন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের প্রধান প্রধান দিক ও গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
১. শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি
বৈঠকে মক্কা চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এবং তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা প্রধান ইব্রাহিম কালিন। ইরানি পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মহসেন রেজাই ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
২. মক্কা চুক্তি জোটের প্রথম যৌথ উদ্যোগ
গত আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কার্যকরের পর এই প্রথম এই তিন দেশ যৌথভাবে ইরানের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা বৈঠকে বসল। গত সপ্তাহে পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের তেহরান সফরের পরপরই এই যৌথ বৈঠকের প্রস্তাব উঠে আসে।
৩. প্রধান আলোচনার বিষয়বস্তু
মার্কিন নৌ-অবরোধ ও হরমুজ প্রণালি : বিশ্ববাজারে ইরানের তেল রপ্তানি কার্যত থমকে দেওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একইসঙ্গে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক ও নিরাপদ রাখার বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিনিধিরা জোর দেন।
হুথিদের হামলা বন্ধের চাপ : সৌদি আরবের পক্ষ থেকে লোহিত সাগর ও তাদের বাণিজ্যিক স্থাপনায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের রকেট ও ড্রোন হামলা বন্ধে ইরানের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান বা তুরস্ক সরাসরি ইয়েমেন সীমান্তে সৈন্য পাঠাবে না, তবে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের হামলা থামানোর বিনিময়ে তেহরানকে আঞ্চলিক ছাড় দিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও মার্কিন শর্ত : ওয়াশিংটন চাচ্ছে তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ও সর্বোচ্চ সীমা আরোপ করতে। অন্যদিকে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা কোনো নতুন শর্তে রাজি হবে না।
৪. ইরানি পক্ষের প্রতিক্রিয়া ও সিদ্ধান্ত
বৈঠক শেষে ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মহসেন রেজাই একে ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও ইতিবাচক’ বলে অভিহিত করেছেন। তেহরান আবারও পুনর্ব্যক্ত করেছে, বহিরাগত কোনো দেশের (যেমন যুক্তরাষ্ট্রের) হস্তক্ষেপ ছাড়া কেবল আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির সময়সূচি বা পরবর্তী বৈঠকের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি, তবে তেহরানের এই চারপক্ষীয় বৈঠক মার্কিন-ইসরায়েলি ব্লকের বাইরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন আঞ্চলিক জোট ও কূটনৈতিক ভারসাম্য তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে।