জ্যাকসন হাইটসের সেভেনটি থার্ড স্ট্রিট আর বাংলাদেশ স্ট্রিটের মোড়টা চিরকালই এক চঞ্চল জনসমুদ্র। জীবনের তাগিদে ছুটে চলা কোলাহল আর কোলাকুলি সেখানে অবিরাম। কিন্তু গত পৌনে এক ঘণ্টা ধরে সেই চেনা ব্যস্ততার বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবয়সী লোকটাকে দেখলে মনে হয়, তিনি যেন এক নিস্পন্দ, স্থির দ্বীপ। চারপাশের প্রবহমান জীবন তাকে স্পর্শ করছে না। সাদার ওপর কালো ডোরার সূক্ষ্ম কারুকাজ করা হাফহাতা শার্ট, নিখুঁত ফিটিংয়ের জিন্স আর পায়ে সযত্নে পালিশ করা চামড়ার জুতো-দূর থেকেই তার মার্জিত রুচিবোধের বিজ্ঞাপন দিচ্ছিল। বাঁ হাতে আভিজাত্যের স্মারক হয়ে চকচক করছে একটি রোল্যাক্স ঘড়ি। তিনি কিছুক্ষণ পরপরই বেশ কায়দা করে কব্জি ঘুরিয়ে সময় দেখছেন, আর বারবার ভিড়ের গোলকধাঁধায় তীব্র চোখে কাউকে খুঁজছেন। চোখের চশমার আড়ালে লুকানো সেই চঞ্চলতা আর অস্থিরতা বলে দিচ্ছিল-তিনি শুধু কোনো সাধারণ প্রতীক্ষায় মগ্ন নন, তিনি হয়তো এক হারিয়ে যাওয়া অতীতের মুখোমুখি দাঁড়ানোর গোপন প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
লোকটার নাম ফাহাদ। আজ থেকে ঠিক পনেরো বছর আগে, এই মোড়টাতেই তিনি শেষবারের মতো দেখেছিলেন নিতুকে। তখন এই জনপদের বুকে ‘বাংলাদেশ স্ট্রিট’ নামের কোনো আবেগ-জড়ানো ফলক ছিল না, আর ফাহাদের ডানপিটে যৌবনে রোল্যাক্সের মতো কোনো বিলাসী ভূষণও ছিল না। পোশাক-আশাক ছিল ভীষণ সাদামাটা, যাপিত জীবন ছিল যান্ত্রিক। কাজ করতেন ‘খাবার বাড়ি’ নামের একটি চিরচেনা বাঙালি রেস্টুরেন্টে। নয়টা-পাঁচটা হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে এই মোড়টায় দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওড়ানো একটা সিগারেটই ছিল তার সারা দিনের ক্লান্তি মুক্তির একমাত্র অবলম্বন। কাছেই ছিল আস্তানা; একচিলতে বাঙালি পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া সাবলেটের ঘর।
এভাবেই কাটছিল তার নির্বাসিত প্রবাস-জীবন-সাদামাটা, তবু স্বপ্নের আবছায়ায় আংশিক রঙিন। মধ্যবিত্তের চিরাচরিত দায়বদ্ধতা পিঠে নিয়ে স্টুডেন্ট ভিসা জড়িয়ে আমেরিকায় পাড়ি দেওয়া ফাহাদের পক্ষে শেষ পর্যন্ত পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হয়নি। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশচুম্বী টিউশন ফি, অন্যদিকে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখে দেশের বুকে অপেক্ষারত বাবার কাছে অর্থ পাঠানো। ফাহাদের সংসারে তখন থমকে ছিল পঙ্গুপ্রায় বাবা-মা, বিয়ের উপযুক্ত দুটি বোন আর কলেজপড়ুয়া ছোট ভাই। সব মিলিয়ে নিজের আকাশছোঁয়া স্বপ্নগুলোকে জলাঞ্জলি দিয়ে ফাহাদ রেস্টুরেন্টের চর্বি-কালির জীবনটাই বেছে নিয়েছিলেন।
ঠিক তেমনই এক পড়ন্ত বিকেলে আকস্মিক ধূমকেতুর মতো ফাহাদের জীবনে নিতুর আগমন। নিতুও উচ্চশিক্ষার খাতা বগলে নিয়ে এই করপোরেট সভ্যতায় পা রেখেছিল, তবে ফাহাদের মতো তার পায়ে কোনো অদৃশ্য শিকল ছিল না। সে উঠেছিল তার খালু-খালার আশ্রয়ে, যিনি বহু বছর আগে ডিভি লটারি নামের এক জাদুকরি সনদে সপরিবারে নিউইয়র্কের নাগরিক হয়েছিলেন। পড়াশোনার বাঁধন বাদে নিতু ভালোবাসত মুক্ত বিহঙ্গের মতো এই অচেনা শহরের অলিতে-গলিতে নিজের পদচিহ্ন এঁকে দিতে।
সেদিন আকাশজুড়ে ছিল মেঘের ঘনঘটা। নিউইয়র্কের আবহাওয়া এমনিতেই খামখেয়ালি রূপসীর মতো, কখন রোদ আর কখন কান্না বোঝা দায়। রেস্টুরেন্টের কাজ শেষ করে ফাহাদ যখন এই মোড়ে এসে থমকে দাঁড়িয়েছেন, তখনই টিপটিপ করে নামল অসময়ের বৃষ্টি। পকেটে হাত দিয়ে ব্যর্থ চেষ্টা করে দেখলেন, লাইটারটা আর্দ্রতায় অকেজো। ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়াল ছাতা মাথায় এক অনিন্দ্য তরুণী। পরনে সাধারণ সালোয়ার-কামিজ, চোখে একরাশ কৌতূহল আর ঠোঁটে একচিলতে হাসি। ফাহাদের অসহায়ত্ব দেখে মেয়েটি নিজের ব্যাগ থেকে একটি লাইটার বের করে বাড়িয়ে দিয়ে কৌতুকের সুরে বলেছিল, ‘নিন, বাঙালি ভাইয়েরা দেখছি দেশ ছাড়লেও পকেটে নষ্ট লাইটার রাখার মায়াটা ছাড়তে পারে না!’
ফাহাদ চমকে উঠেছিলেন। যান্ত্রিক পরবাসের বুকে এমন খাঁটি বাঙালি ঘরানার ঠাট্টা! লাইটারটা নেওয়ার মুহূর্তে দুজনের আঙুল আলতো করে ছুঁয়ে গিয়েছিল একে অপরকে। মেয়েটিই ছিল নিতু। সেই জলছাপ বিকেলেই শুরু হয়েছিল তাদের অলিখিত এক আত্মিক বন্ধনের অমলিন সূত্রপাত।
ধীরে ধীরে জ্যাকসন হাইটসের এই ব্যস্ত মোড়টা হয়ে উঠল তাদের প্রতিদিনের এক টুকরো নিজস্ব স্বর্গ। ফাহাদের ছুটির পর নিতু এসে দাঁড়াত। ফাহাদ শোনাতেন তার ভাঙাচোরা জীবনের দিনলিপি-দেশে থাকা অসুস্থ বাবা, বোনদের বিয়ে আর ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে কীভাবে তার নিজস্ব সত্তা রেস্টুরেন্টের প্লেটে ধুয়ে গেছে। নিতু মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত, আর বিনিময়ে ফাহাদকে রাঙিয়ে দিত তার বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্পে, রঙিন স্বপ্নের আবদারে। নিতু ছিল ফাহাদের এই ধূসর, একঘেয়ে প্রবাস-জীবনের একমাত্র জ্যান্ত ক্যানভাস। ফাহাদ একসময় আবিষ্কার করলেন, তিনি নিতুর মায়ায়, নিতুর প্রেমে আকণ্ঠ ডুবে গেছেন। কিন্তু নিজের শূন্য পকেট আর পারিবারিক জোয়াল টানার অপূর্ণতা তাকে কোনো দিন মুখ ফুটে সেই সত্য উচ্চারণের সাহস দেয়নি। নিতু হয়তো নীরব চোখে সেই অব্যক্ত হাহাকার পড়ত, তাই কখনো অবহেলায় ফাহাদের শার্টের কলারটা সোজা করে দিতে দিতে বলত, ‘সবকিছু একদিন ঠিক হয়ে যাবে ফাহাদ, মানুষ তো আসলে তার স্বপ্নের চেয়েও বড়।’
সম্পর্কটা যখন এক নিবিড় মায়ায় জড়িয়ে গেছে, ঠিক তখনই নিয়তি তার নিষ্ঠুর পাশা উল্টে দিল। নিতুর পরিবার দেশে এক প্রতিষ্ঠিত, সম্ভ্রান্ত পাত্রের সঙ্গে তার বিয়ের পাকা কথা সম্পন্ন করল। সেই আভিজাত্যের খাঁচায় বন্দী হতে নিতুর মন সায় দেয়নি। সে তার আপত্তির কথা খালা-খালুকে স্পষ্ট জানিয়েছিল, কিন্তু তারা ছিলেন নিতুর মা-বাবার অনুগত এবং সামাজিক আভিজাত্যের অন্ধ প্রতিনিধি। ফলে নিতুর ওপর নেমে এল মানসিক নিষ্পেষণের অলঙ্ঘ্য পাহাড়।
সেদিন কালবৈশাখীর মতো এক রাতে এই মোড়টাতেই শেষ দেখা হয়েছিল দুজনের। নিতুর চোখে ছিল শ্রাবণের জল, আর ফাহাদের বুকে ছিল এক মহাসমুদ্রের পাথরচাপা নীরবতা। নিতু ফাহাদের হাত দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আকুল হয়ে বলেছিল, ‘ফাহাদ, তুমি শুধু একটিবার বলো যে তুমি আমাকে চাও। আমি এই মুহূর্তেই সব ছেড়ে তোমার ওই সাবলেটের ছোট ঘরে চলে যাব। আমরা দুজনে মিলে জীবনের সঙ্গে লড়াই করব।’
ফাহাদ সেদিন নিতুর সেই আর্তিভরা চোখের দিকে সোজা তাকাতে পারেননি। তার চোখের সামনে তখন ভেসে উঠেছিল দেশে থাকা প্রায় কর্মঅক্ষম বাবার করুণ মুখ আর দুই বোনের অবিবাহিত ভবিষ্যৎ। রেস্টুরেন্টের সামান্য বেতনে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে নিতুকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো বিলাসিতা করার ক্ষমতা তখন তার ছিল না। ভালোবাসা যে মাঝেমধ্যে বাস্তবতার কঠিন কষ্টিপাথরে কতটা অসহায় ও তুচ্ছ হতে পারে, ফাহাদ সেদিন মর্মে মর্মে অনুধাবন করেছিলেন।
ফাহাদ আলতো করে নিতুর নরম হাতের বাঁধন আলগা করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘নিতু, বাস্তব বড় কঠিন। আমার ওই সাবলেটের ঘরের জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায় না, শুধু পাশের বাড়ির ইট-কাঠের দেয়াল দেখা যায়। সেই অবরুদ্ধ খাঁচায় এনে আমি তোমাকে বন্দী করতে পারব না। তুমি চলে যাও।’
‘ফাহাদ, তুমি কি বুঝতে পারছ কী বলছ? আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমিও আমাকে ভালোবাসো। আমাদের দুটি হৃদয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নিটল প্রেমের স্বপ্নস্রোত। তুমি “চলে যাও” বললেই কি এই স্রোত থেমে যাবে? এটা হয় না, ফাহাদ। তুমি একটু ভরসা দাও, আমি খালার বাসা ছেড়ে দেব। দরকার হয় আমিও একটা জব নেব। আমাদের কোনো সমস্যা হবে না। তুমি একা তোমার পরিবারের কথা ভাবছ তো, এর পর থেকে আমরা দুজন মিলে ভাবব।’
তবু সাহস পাননি ফাহাদ। মধ্যবিত্তের মেরুদণ্ড সেদিন প্রেমের চেয়ে কর্তব্যের ভারে নুয়ে পড়েছিল। ফাহাদের এই চূড়ান্ত পাথরমনস্কতা বুঝতে পেরে নিতু আর একটি কথাও বলেনি। শুধু একজোড়া ভাঙা মন আর অপমানের তীব্র গ্লানি নিয়ে সে জ্যাকসন হাইটসের ভিড়ে কর্পূরের মতো মিলিয়ে গিয়েছিল। তারপর ঘড়ির কাঁটায় কেটে গেছে দীর্ঘ পনেরোটি বছর।
সময় বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু কিছু দীর্ঘশ্বাস হাহাকার হয়ে রয়ে যায় মনের কোনো এক গোপন মহাফেজে। এই পনেরো বছরে ফাহাদের জীবনে এক বিপুল রূপান্তর এসেছে, যা তার জীবনের সব আর্থিক খরা দূর করে দিয়েছে। দিন-রাত এক করে উদয়াস্ত পরিশ্রম করেছেন তিনি। রেস্টুরেন্টের চাকরি ছেড়ে একসময় ছোট একটি ক্যাফেটেরিয়ার মালিকানা, তারপর ধীরে ধীরে আবাসন ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সাম্রাজ্য বিস্তারÑআজ তিনি নিউইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটির একজন সফল ব্যবসায়ী। দুই বোনের ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছেন, ছোট ভাই এখন টেক্সাসের এক নামী করপোরেট ফার্মে উচ্চপদস্থ ইঞ্জিনিয়ার। ফাহাদের আজ দামি শার্ট, নিখুঁত জিন্স আর হাতের রোল্যাক্স ঘড়িÑসব প্রতিপত্তিই আছে, নেই শুধু সেই চঞ্চল চোখের জাদুকরি মেয়েটি।
অন্যদিকে নিতুর জীবনটা কেটেছিল সম্পূর্ণ অন্য এক কৃষ্ণগহ্বরে। ফাহাদের সেই প্রত্যাখ্যানের অভিমানে আর পরিবারের নিষ্ঠুর চাপে সে দেশে ফিরে গিয়ে বাধ্য হয়েছিল সেই জৌলুশপূর্ণ বিয়েতে বসতে। কিন্তু টাকা আর বাহ্যিক আভিজাত্যের আড়ালে যে এক কুৎসিত, বিকৃত রূপ লুকিয়ে ছিল; তা নিতু টের পেয়েছিল বিয়ের কয়েক মাসের মাথায়। স্বামী ছিল চরম আত্মকেন্দ্রিক, মাদকাসক্ত এবং পরনারীভোগী। নিতুর স্বাধীনচেতা মনকে সে প্রতিনিয়ত বুটের তলায় পিষে মারতে চেয়েছিল। তিন বছর এক তীব্র নরকযন্ত্রণা সহ্য করার পর এক কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে নিতুকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও একাকী ফেলে রেখে ওর স্বামী অন্য এক নারীর হাত ধরে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।
নিতু ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু তার ভেতরের তেজ ফুরিয়ে যায়নি। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অদম্য জেদ নিয়ে সে খালার সাহায্য ছাড়াই আবার ফিরে আসে আমেরিকার মাটিতে। একা লড়াই করে শেষ করে উচ্চশিক্ষা। আজ সে ম্যানহাটনের একটা নামী ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউটের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সে ফাহাদকে খুঁজেছে স্মৃতির পাতায়, কিন্তু অভিমানের প্রাচীর ডিঙিয়ে সামনে আসার সাহস পায়নি। আজ এত বছর পর, যেন এক অলৌকিক টানে এই পুনর্মিলনের ক্ষণ।
হঠাৎ ফাহাদের স্মৃতির মিছিলে ছেদ পড়ল। সাবলীল একটা চন্দন রঙের শাড়ি পরা এক ভদ্রমহিলা আপনা বাজার গ্রোসারি শপের দিক থেকে এই মোড়ের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছেন। সময়ের আবর্তে শরীরে কিছুটা ভারিক্কি ভাব এলেও তার হাঁটার অণুকাব্যিক ধরন আর চোখের সেই চেনা চঞ্চলতা একটুও ম্ল্যান হয়নি।
নিতু এসে দাঁড়াল ফাহাদের মুখোমুখি।
দুজনের চোখেই এক মুহূর্তের জন্য পনেরো বছরের এক মহাসমুদ্রের নীরবতা এসে থমকে দাঁড়াল। ফাহাদ চোখের চশমাটা খুলে সযত্নে পকেটে রাখলেন। নিতু ফাহাদের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলÑসেই পরিচিত অমলিন হাসি, তবে তাতে আজ মিশে আছে এক দীর্ঘ পরিপক্বতার অবয়ব।
‘অনেক বদলে গেছ, ফাহাদ,’ নিতুই প্রথম নীরবতার বরফ ভাঙল। ‘এখন আর সস্তা শার্ট পরো না, হাতে দামি ঘড়ি। সময় দেখতে আর অসুবিধা হয় না নিশ্চয়? চলো, কোথাও বসি। ওইদিকটায় গাড়ি পার্কিং করে এসেছি।’ আঙুলের মৃদু ইশারায় নিতু তার গাড়ির অবস্থান দেখাল।
ফাহাদ একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিতুর চোখের গভীরে তাকালেন। বললেন, ‘ঘড়িটা দামি ঠিকই নিতু, কিন্তু সময়টা বড্ড সস্তা হয়ে গেছে রে। যখন সময় দেওয়ার মতো জীবনের শ্রেষ্ঠ ঋতুটা ছিল, তখন পকেটে ঘড়ি কেনার পয়সা ছিল না। আর আজ ঘড়ি আছে, কিন্তু দেওয়ার মতো সেই অমূল্য সময়টাই হারিয়ে গেছে।’
‘এখানে দাঁড়িয়েই কথা বলবে?’ নিতু আলতো করে শুধাল।
‘ও তাই তো! আমার গাড়িতে ওঠো। আজ রোজবেল্ট আইল্যান্ড লাইট হাউসের দিকে যাব।’
‘আমার গাড়িটা...?’ ‘থাকুক ওখানেই। আমরা তো আবার একসাথেই ফিরব...’ ফাহাদের কণ্ঠস্বরে এক দৃঢ় অধিকারবোধ। মোড়ের কাছেই ফাহাদের রাজকীয় গাড়িটা পার্ক করা ছিল। ওরা দুজনে গিয়ে নিঃশব্দে গাড়িতে উঠে বসল।
রোজবেল্ট আইল্যান্ডের লাইট হাউস এলাকায় যখন ওরা এসে বসল, তখন আকাশজুড়ে গোধূলির আবির খেলা করছে। নিতু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাডসনের বহমান জলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি তখন বলছিলে না ফাহাদ, সময় হারিয়ে গেছে? হারায়নি। কিছু মায়া কখনো হারায় না। এই যে আজকে আমরা আবার এই বাংলাদেশ স্ট্রিটের মোড়ে নতুন করে সাক্ষাৎ করতে পারলাম, তোমার গাড়িতে চড়ে এখানে এলামÑএটাই কি কম? আমরা হয়তো এক হতে পারিনি, কিন্তু আমাদের প্রেমটা তো খাঁটি ছিল। ছিল বলেই এত বছর পর আমি তোমাকে খুঁজে বের করেছি আর তুমিও এক ডাকে সাড়া দিলে। এতে কি প্রমাণ হয় না আমাদের ভালোবাসা এখনো ফুরিয়ে যায়নি? এই অনুভূতিটাই আমাদের বাকি জীবন বাঁচিয়ে রাখবে।’
ফাহাদ একটু ঝুঁকে নিতুর মুখের দিকে তাকালেন। শান্ত, নিঝুম বিকেলের নীরবতায় নিতুর কণ্ঠস্বরও একসময় স্তব্ধ হয়ে গেল। নিতুর চোখের কোণে জমে থাকা সূক্ষ্ম বিষাদের দীর্ঘ রেখাগুলো ফাহাদের তীক্ষè চোখ এড়াতে পারল না। সে ফিসফিস করে বলল, ‘আমি তোমার জীবনের সব খবর জানি, নিতু। তোমার সেই তিন বছরের বন্দিজীবন, তারপর তোমার স্বামীর সেই কাপুরুষোচিত প্রস্থান...সব শুনেছি। কেন আমাকে একটিবারও জানালে না?’
নিতু অপরাধীর মতো চোখ নামিয়ে নিল। আইল্যান্ডের নির্জনতা আর হাডসনের শীতল জলের প্রলেপমাখা কনকনে বাতাসে ওর শাড়ির আঁচলটা ডানা-কাঁপানো পাখির মতো উড়ছিল। ‘কী লাভ হতো, ফাহাদ? তুমি তো বাস্তবতার দোহাই দিয়ে একদা হাত ছেড়েছিলে। যে হাত একবার মাঝনদীতে ছেড়ে দেয়, তাকে আবার আঁকড়ে ধরতে বড্ড ভয় লাগে।’
ফাহাদ এবার আর কোনো সামাজিক বা মানসিক দ্বিধার কাছে মাথা নত করলেন না। পনেরো বছর আগে নিজের জীবনের যে অপূরণীয় ভুল করেছিলেন, আজ আর তার পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া যায় না। তিনি পরম মমতায় নিতুর কাঁপা কাঁপা হাতটা নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় টেনে নিলেন। রোল্যাক্স ঘড়ির নীলচে ডায়ালে বিকেলের শেষ রশ্মিটা প্রতিফলিত হয়ে নিতুর চোখের পাতায় এক মায়াবী আলো ফেলল।
‘সেদিন আমি কাপুরুষ ছিলাম, নিতু। ভেবেছিলাম অভাব বোধ হয় ভালোবাসাকে গিলে খায়। কিন্তু এই পনেরো বছরে কোটি টাকা কামিয়েও আমি এক ছটাক শান্তি পাইনি। আমার এই শূন্য প্রাসাদে এখন আকাশ দেখা যায় সত্যি, কিন্তু সেই মুক্ত আকাশ ভাগ করে নেওয়ার মতো পাশে কেউ নেই। আজ আমার কোনো পারিবারিক পিছুটান নেই, কোনো অর্থের অভাব নেই। তুমি কি আবার আমার সেই জানালা-ভাঙা ঘরের নিজস্ব আকাশ হবে?’
নিতু চমকে ফাহাদের চোখের গভীর অতলতার দিকে তাকাল। সেখানে কোনো কৃত্রিমতার ছোঁয়া ছিল না, ছিল এক মহাসমুদ্রের আকুল আর্তি। নিতুর চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল চন্দন শাড়ির আঁচলে। পনেরো বছরের জমানো সব অভিমান, সব একাকিত্ব আর লাঞ্ছনা যেন ওই এক ফোঁটা অশ্রুতেই ধুয়ে মুছে পবিত্র হয়ে গেল।
নিতু ফাহাদের হাতটা আরও শক্ত, আরও নিবিড় করে আঁকড়ে ধরে ভাঙা গলায় বলল, ‘যদি এবারও মাঝরাস্তায় হাত ছেড়ে দাও, ফাহাদ?’
ফাহাদ মৃদু হেসে নিতুর চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, ‘এবার হাত ছাড়লে সময় নিজেই থমকে যাবে, নিতু। আমাদের আর হারানোর কিছু নেই।’
শেষ বিকেলের ম্যান আলো এসে ওদের অবয়বে লেপ্টে রইল। আইল্যান্ডে ঘুরতে আসা দু-একজন মানুষ যে যার মতো আপন গতিতে ফিরছে। কিন্তু হাডসনের তীরে, দুই প্রাক্তনের মাঝে এক টুকরো নতুন জীবনের বীজ বোনা হয়ে গেল। দীর্ঘ পনেরোটি বছরের দীর্ঘশ্বাস পেরিয়ে, তাদের মরে যাওয়া সম্পর্কটা আজ এক বসন্তের ফাগুন চেনা আকাশের দিকে ডানা মেলল, যার কোনো শেষ নেই।