রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফর সংক্ষিপ্ত, বাতিল হয়েছে নাগরিক সংবর্ধনাসহ কয়েকটি কর্মসূচি
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে সামনে রেখে তাঁর নামে কথিত ‘ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা’ থাকার যে প্রচারণা চলছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির নেতারা। তারা বলেছেন, তারেক রহমানের নামে কোনো ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নেই। এ ধরনের প্রচারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ‘ফ্যাসিস্টদের অপপ্রচার’।
১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে একটি রেস্টুরেন্ট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি নেতারা এ কথা বলেন। তারা জানান, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও ব্যস্ততার কারণেই প্রধানমন্ত্রীর এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফর সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। সফরের সময় কমে যাওয়ায় নিউইয়র্কে পূর্বনির্ধারিত নাগরিক সংবর্ধনাসহ বেশ কয়েকটি কর্মসূচি বাতিল করতে হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমও জানিয়েছে, তারেক রহমানের সফর পূর্বপরিকল্পনার তুলনায় সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। তিনি ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে আসবেন, ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেবেন এবং পরদিন দেশে ফেরার কথা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাঁর ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান এবং সানফ্রান্সিসকো সফরের পরিকল্পনাও ছিল।
‘ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কথা ভিত্তিহীন’ : সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সফর হঠাৎ সংক্ষিপ্ত করা এবং নাগরিক সংবর্ধনা বাতিলের সঙ্গে কোনো ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার সম্পর্ক রয়েছে কি না—ঠিকানার সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি নেতারা বিষয়টি সরাসরি নাকচ করে দেন।
তারা বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নামে কোনো ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নেই। এটি ফ্যাসিস্টদের অপপ্রচার। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকার কারণেই তিনি সফর সংক্ষিপ্ত করেছেন।”
বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, সফরের সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এসব প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য তারা প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি আহ্বান জানান।
তারেক রহমানের সফর সংক্ষিপ্ত হওয়ার বিষয়টি অবশ্য সরকারি সূত্রেও নিশ্চিত করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমে ২১ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সফরের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা কমিয়ে আনা হয় এবং সানফ্রান্সিসকো সফর বাদ দেওয়া হয়।
লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আনোয়ার হোসেন খোকন : সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সাংগঠনিক সমন্বয়ক আনোয়ার হোসেন খোকন।
লিখিত বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে স্বাগত জানানোর কথা বলা হয়।
বক্তব্যে বলা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে আসছেন এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবেন। বাংলাদেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর এবারের জাতিসংঘ সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে উল্লেখ করেন বিএনপি নেতারা।
লিখিত বক্তব্যে তারেক রহমানের পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়, তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছেন। এবার তারেক রহমানের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একই পরিবারের আরেক সদস্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন।
‘প্রবাসীদের জন্য গৌরবের মুহূর্ত’ : লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ এবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী এই বিশ্বমঞ্চে একজন বাংলাদেশির সভাপতিত্বের ঘটনাকে বাংলাদেশের জন্য ‘গৌরবের অধ্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করেন বিএনপি নেতারা।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরা হয়।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গ : লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গও আসে।
বিএনপি নেতারা দাবি করেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তারেক রহমান বিদেশে অবস্থান করেও আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিরা সেই আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ও সহিংসতায় হতাহতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করা হয়।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের স্বার্থে প্রবাসীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়।
শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির আহ্বান : প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নিউইয়র্কে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির প্রস্তুতির মধ্যেই বিএনপি নেতারা তাদের নেতা-কর্মীদের শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ ও পাল্টা কর্মসূচির অনুমতি নিয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর জেএফকে বিমানবন্দর এবং ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরের আশপাশেও কর্মসূচির প্রস্তুতি রয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে বিএনপি নেতারা বলেন, “শান্তি-পরিস্থিতি-বিতাড়িত-ফ্যাসিস্ট চক্র দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে বিদেশে বিভিন্ন দেশে বসে দেশের বিরুদ্ধে যত ষড়যন্ত্রই করুক না কেন, আমরা গণতন্ত্রকামী প্রতিটি প্রবাসী বাংলাদেশিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই।”
তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্দেশনা মেনে সংযম ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রবাসীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুবিধা বাড়ানোর প্রত্যাশা : লিখিত বক্তব্যে প্রবাসীদের কল্যাণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন বিএনপি নেতারা। কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও স্পোর্টস কার্ডসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় সুবিধার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে প্রবাসীদের জন্যও দেশে বিশেষ সুবিধা বাড়ানো হবে।
তারা বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের বিনিয়োগ, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন।
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক শুরু হচ্ছে ২২ সেপ্টেম্বর এবং ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। সফরকালে জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার প্রস্তুতিও চলছে।
আগে ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে তারেক রহমানকে বড় পরিসরে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তবে পরিবর্তিত সূচিতে তাঁর সফর সংক্ষিপ্ত হওয়ায় সেই সংবর্ধনা বাতিল হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিউইয়র্কে স্বাগত জানিয়ে তাঁর জাতিসংঘ সফরের সাফল্য কামনা করেন বিএনপি নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য আব্দুল লতিফ সম্রাট, গিয়াস আহমেদ, জিল্লুৃর রহমান জিল্লুর, মিজানুর রহমান ভুঁইয়া মিল্টন, মোস্তফা কামাল পাশা বাবুল প্রমুখ।
অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপি নেতা শরাফত হোসেন বাবু, সোলায়মান ভুঁইয়া, মঞ্জুর আহমদ চৌধুরী, মো. গিয়াস উদ্দন, মোশাররফ হোসেন সবুজ, আব্দুস সবুর, আনোয়ারুল ইসলাম আনোয়ার, আক্তার হোসেন বাদল, গোলাম ফারুক শাহীন, হেলাল উদ্দীন, জসিম ভূঁইয়া, সৈয়দা মাহমুদা শিরীন, হজরত আলী, ইমরান শাহ রণ, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নেতা মাকসুদ চৌধুরী, যুবদল নেতা তোফায়েল চৌধুরী লিটন, যুবদল কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আবু সাঈদ আহমদ, যুবদল নেতা আমানত হোসেন আমান, আতিকুল হক আহাদ, মিজানুর রহমান মিজান, নিউইয়র্ক স্টেট বিএনপির সভাপতি অলিউল্লাহ আতিকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান, নিউইয়র্ক মহানগর (উত্তর) বিএনপির আহ্বায়ক আহবাব চৌধুরী খোকন, দেওয়ান কাওসার, মাজহারুল ইসলাম জনি প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও দেখতে লিংকে ক্লিক করুন -
নিউইয়র্কে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন