জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অনেকটা নীরবে একটি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ (শ্যাডো ক্যাবিনেট) গঠন করেছে। দলীয় আমির ডা. শফিকুর রহমানকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী ধরে গঠিত এই কাঠামোর সদস্যদের প্রশিক্ষণ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। দলটির দাবি, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, বিকল্প নীতিপ্রস্তাব তৈরি এবং সংসদে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২৪ আগস্ট রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রথমবারের মতো বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি জানান, ছায়া মন্ত্রিসভা ইতোমধ্যে গঠন করা হয়েছে এবং সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলছে। খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যদের নাম প্রকাশ করা হবে। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, গত মাসে দলের নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তে এই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। এতে শুধু সংসদ সদস্য নন, দলের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক সিনিয়র নেতা এবং বিভিন্ন খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাও যুক্ত রয়েছেন। তার ভাষ্য, এটি কোনো প্রতীকী কাঠামো নয়; বরং সরকারের কর্মকাণ্ডের কার্যকর মূল্যায়ন ও বিকল্প নীতি প্রণয়নের একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে দেওয়া হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করবেন সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। এ ছাড়া সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান, তথ্য মন্ত্রণালয়ে অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এবং আইন মন্ত্রণালয়ে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, ধর্ম এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের জন্যও পৃথক দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। জামায়াতের নেতারা জানান, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ছায়ামন্ত্রী দায়িত্ব পালন করবেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পৃথক টিমও থাকবে। প্রয়োজনে উপমন্ত্রী পর্যায়েও দায়িত্ব বণ্টনের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রম, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড এবং বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে পর্যালোচনার কাজ শুরু করেছেন ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা।
দলটির দাবি, এই কাঠামোর তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, সরকারের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। দ্বিতীয়ত, সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ নেতৃত্ব ও সম্ভাব্য মন্ত্রী তৈরির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া। অর্থাৎ শুধু সরকারের সমালোচনা নয়, সরকার পরিচালনার বিকল্প প্রস্তুতিও এই উদ্যোগের লক্ষ্য। জামায়াতের শীর্ষ নেতা ও আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক অনুশীলন। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বিরোধী দল সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখতে এবং বিকল্প নীতিমালা উপস্থাপন করতে এ ধরনের কাঠামো গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় সমালোচনা এবং বিকল্প কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা সম্ভব হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজার মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা নতুন কোনো ধারণা নয়। এটি বিরোধী দলকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরকারের নীতি বিশ্লেষণ এবং বিকল্প প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। একই সঙ্গে সরকারের ওপর একধরনের ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি করে, যাতে নীতি নির্ধারণে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। জামায়াতের ছায়া মন্ত্রিসভা দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সদস্যদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং ভবিষ্যতে এই কাঠামো কতটা সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।