বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​বিভাজন নয়, ইতিহাসের শক্তিতে অটুট থাকুক জাতীয় ঐক্য

​বিভাজন নয়, ইতিহাসের শক্তিতে অটুট থাকুক জাতীয় ঐক্য

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণের ঐক্য, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সামাজিক সম্প্রীতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ একই ভূখণ্ডে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে এসেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশের মানুষ একসঙ্গে যুদ্ধ করেছে এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, যখনই বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পর্যায় অতিক্রম করেছে অথবা জাতীয়ভাবে কোনো বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছে, তখনই এমন কিছু ইস্যু সামনে এসেছে, যা জনগণের আবেগকে উত্তেজিত করে, সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি করে এবং রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার আশঙ্কা তৈরি করে। তাই বর্তমান সময়ে কালেমাখচিত পতাকা, মূর্তি নির্মাণের আখ্যান, সংখ্যালঘু ইস্যু কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে যেসব বিতর্ক তৈরি হচ্ছে, সেগুলোকে অত্যন্ত সতর্কতা, বিচক্ষণতা এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তার ওপর সম্প্রতি হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে ভারতের নতুন খেলা ও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে ভারতের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য।

আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের ধরন অনেক বদলে গেছে। একসময় যুদ্ধ মানেই ছিল সীমান্তে সেনাবাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষ। এখন তথ্যযুদ্ধ, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি, গুজব ছড়ানো এবং পরিচয়ভিত্তিক সংঘাত উসকে দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত সামরিক সংঘাতের চেয়েও কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো, ভুয়া তথ্য প্রচার এবং মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা এখন বহু দেশের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। ফলে যেকোনো উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনার ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য যাচাই না করে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া দেখানো জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

বাংলাদেশে ধর্মীয় প্রতীক ও বিশ্বাস মানুষের জীবনের গভীরে প্রোথিত। পবিত্র কালিমা মুসলমানদের ইমানের অন্যতম মৌলিক ঘোষণা এবং কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার বিষয়। আবার দেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা এবং সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। তাই ধর্মীয় প্রতীক বা বিষয় নিয়ে যেকোনো বিতর্ক কিংবা অন্যদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে যেকোনো উদ্বেগ—উভয় ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল, আইনসম্মত এবং প্রমাণভিত্তিক অবস্থান গ্রহণ করা অপরিহার্য। কোনো পক্ষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া যেমন সমর্থনযোগ্য নয়, তেমনি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা, ভয় বা প্রতিশোধের পরিবেশ সৃষ্টি করাও রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য সমান ক্ষতিকর।

বাংলাদেশে অতীতেও দেখা গেছে, সামান্য একটি গুজব, বিকৃত ছবি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভ্রান্তিকর তথ্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ফেসবুক পোস্ট, ভুয়া আইডি, সম্পাদিত ছবি অথবা পুরোনো ঘটনার ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করার মাধ্যমে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষা দেয় যে প্রযুক্তির যুগে তথ্য যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। একটি মাত্র ভুয়া পোস্ট কখনো কখনো পুরো একটি এলাকার শান্তি বিনষ্ট করতে পারে, মানুষের জানমালের ক্ষতি করতে পারে এবং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বাংলাদেশ প্রায় ১৮ কোটির মানুষের দেশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগত সম্প্রদায় দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, সম্পদ, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্ব হলো অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করা এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়া। কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডকে পুরো একটি সম্প্রদায়ের ওপর আরোপ করা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মীয় অনুভূতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করাও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য ক্ষতিকর।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায় যে যখনই সমাজ পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অর্থনীতি ও বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে সামাজিক সম্প্রীতি, আইনের শাসন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশও গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পোশাকশিল্প, কৃষি উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই অগ্রগতিকে ব্যাহত করার মতো যেকোনো অস্থিতিশীলতা শেষ পর্যন্ত দেশের সাধারণ মানুষেরই ক্ষতি করবে।

তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যেকোনো উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনার পেছনে ‘অদৃশ্য অপশক্তি’ রয়েছে—এমন দাবি করা হলে সেটি অবশ্যই তথ্য, গোয়েন্দা অনুসন্ধান এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রকে দায়ী করা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার কাজও কঠিন করে তুলতে পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসন, স্বাধীন তদন্ত এবং প্রমাণনির্ভর বিচারই হওয়া উচিত সব ধরনের অভিযোগের ভিত্তি।

বর্তমান বিশ্বে হাইব্রিড যুদ্ধের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের মনোজগতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। কখনো ধর্মীয় প্রতীক, কখনো জাতিগত পরিচয়, কখনো সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, আবার কখনো ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়, যাতে জনগণ পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। এতে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা দুর্বল হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর চাপ বাড়ে এবং দেশের উন্নয়নের গতি বাধাগ্রস্ত হয়। এ কারণেই নাগরিকদের সচেতনতা আজ জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।

সরকারের দায়িত্ব কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়; বরং গুজব শনাক্ত করা, দ্রুত তথ্য প্রকাশ করা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা মোকাবিলা করা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, সাইবার নজরদারি শক্তিশালী করা এবং সংঘাত প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি। গণমাধ্যমেরও বড় দায়িত্ব রয়েছে। প্রতিযোগিতার কারণে যাচাইবিহীন খবর প্রচার বা উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম ব্যবহার করলে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং তথ্য-যাচাইভিত্তিক প্রতিবেদন এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজেরও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন কখনো বিদ্বেষ, সহিংসতা বা প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংযত বক্তব্য এবং শান্তিপূর্ণ আহ্বান অনেক সময় বড় ধরনের সংঘাত প্রতিরোধ করতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষেরও উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার উৎস যাচাই করা, আবেগের বশবর্তী হয়ে উসকানিমূলক পোস্টে প্রতিক্রিয়া না দেওয়া এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়া।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কতটা বিচক্ষণতার সঙ্গে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারি তার ওপর। আমাদের মনে রাখতে হবে, জাতীয় ঐক্য ভাঙতে চাইলে সবচেয়ে সহজ পথ হলো ধর্ম, পরিচয় ও আবেগকে ব্যবহার করা। কিন্তু একটি পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী জাতি কখনো গুজব, উসকানি বা পরিকল্পিত বিভাজনের ফাঁদে পা দেয় না। তারা তথ্য যাচাই করে, আইনের ওপর আস্থা রাখে এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে ব্যক্তিগত বা দলীয় আবেগের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সামাজিক সম্প্রীতি এবং উন্নয়নের ধারাকে অক্ষুণ্ন রাখতে হলে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সর্বোপরি দেশপ্রেমিক জনগণকে সর্বদা সতর্ক, সংযত ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিভাজনের রাজনীতি নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায়বিচার, সাংবিধানিক অধিকার এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz