বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​শহীদ কাদরীর কবিতায় শব্দচয়ন ও তার বিন্যাস

​শহীদ কাদরীর কবিতায় শব্দচয়ন ও তার বিন্যাস

বিজ্ঞাপন
কবি শহীদ কাদরী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। পঞ্চাশ-উত্তর বাংলা কবিতার ধারায় আধুনিক মনন ও জীবনবোধ সৃষ্টিতে যে ক’জন কবির নাম করা যায়, শহীদ কাদরী ছিলেন তাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন বাংলা কবিতার এক নিপুণ সৃষ্টিশীল অনন্য প্রতিভার অধিকারী। তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে বিশ্ব নাগরিকতাবোধ, আধুনিক শহুরে জীবনের সুখ-দুঃখ, রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটকৌশল, দেশপ্রেম, রোমান্টিকতা, অবহেলিত মানুষের মন ও মনন চেতনার বেদনাক্লিষ্ট জীবনের নিখুঁত চিত্র।

শুধু কবি হিসেবেই নয়, মানুষ হিসেবেও শহীদ কাদরীর রয়েছে আলাদা এক বিশেষ মানবিক সত্তা। সেই সত্তায় দেখা যায়, শহীদ কাদরীর বোহেমিয়ান জীবনের ছবি, দেশ-ভাগ, দাঙ্গা, বিশ্ব সাহিত্যের ওপর বিশেষ ব্যুৎপত্তি, বন্ধুদের সঙ্গে তুমুল আড্ডায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। অন্যদিকে দেখা যায়, একটি আংটির মতো কবি তাঁর স্বদেশকে হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। জীবনের দীর্ঘ সময় কবি দেশের বাইরে কাটিয়েছেন কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও তিনি তাঁর দেশকে ভুলতে পারেননি। দেশে ফিরতে না পারার এই বেদনাবোধ কবিকে আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হয়েছে। এই আগস্ট মাস একইভাবে কবির জন্ম (১৯৪২) এবং কবির মৃত্যুর (২০১৬) মাস। কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আলোচ্য নিবন্ধে কবির ‘কবিতা সমগ্র’ থেকে নির্বাচিত চারটি কবিতা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করছি।
‘উত্তরাধিকার’

‘উত্তরাধিকার’ মূলত এমন একটি প্রজন্মের কবিতা, যারা একটি সুন্দর, মানবিক পৃথিবীর উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তার বদলে পেয়েছে যুদ্ধ, রক্ত, ভয়, বিচ্ছিন্নতা এবং মূল্যবোধের সংকট।
এই ক্ষেত্রে শহীদ কাদরীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তিনি শুধু বাইরের সমাজকে অভিযুক্ত করেননি, শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরেও তাকিয়েছেন এবং নিজেকেও প্রশ্ন করেছেন। এ কারণে কবিতাটি শুধু রাজনৈতিক কবিতা নয়; এটি একই সঙ্গে বলা যায়, নগর-জীবনের কবিতা, যুদ্ধবিরোধী কবিতা, আত্মসমালোচনার কবিতা, সর্বোপরি এটি একটি বিপন্ন প্রজন্মের মানসিকতার কবিতা।
কবিতার শুরুতেই বিষাদের তীব্রতা প্রকাশ পায়। যেখানে শব্দচয়ন, প্রতীক, উপমার মাধ্যমে কবিতায় ব্যক্ত স্বর পাঠককে চেতনার গভীরে নিয়ে যায়।

“জন্মেই কুঁকড়ে গেছি মাতৃজরায়ন থেকে নেমে-
সোনালী পিচ্ছিল পেট আমাকে উগরে দিলো যেন”
‘মাতৃজঠর’ এর নিরাপত্তার বাইরে এসে জীবনের সূচনায় কবি হোঁচট খেলেন, দেখলেন পৃথিবীর নির্মম বাস্তবতা। ‘দীপহীন ল্যাম্পপোস্ট’, ‘ব্ল্যাক আউট’, ‘বিদেশী পতাকা’, ‘রক্তজবা’, ‘কাঁটা তারে ঘেরা পার্ক’, ‘সারিবদ্ধ সৈনিক’, ‘কম্পমান কম্পাস’, ‘কানামাছি খেলা’-এসব কিছুকে সারিবদ্ধ করে সাজিয়ে নিলে দেখা যায়, হতাশা, ভয়, দমন, পরাধীনতা, যুদ্ধ, নগর জীবনের সংকট, মানুষের একাকিত্ব ও মূল্যবোধের অবক্ষয়।

এসব কিছু কবির জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত।
‘উত্তরাধিকার’ কবিতার শেষাংশে কবি ধীরে ধীরে বাইরের যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজ থেকে নিজের অন্তর্জগতে ফিরে আসছেন। সেখানে তিনি কেবল পোড়খাওয়া সমাজের সমালোচনা করছেন না, নিজের দিকেও প্রশ্ন ছুড়েছেন। “নির্বোধের আলস্যে কেবল ম্যান হাস্যে.....” তিনি ভাবছেন, আমি কি শুধু চুপচাপ দেখে গেছি? অন্যায়ের বিরুদ্ধে কি যথেষ্ট প্রতিবাদ করতে পেরেছি? এই আত্মসমালোচনার কারণেই কবিতাটি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং গভীরভাবে মানবিক। “মূল্যবোধের আর যা কিছু সত্য”-এ বোধগুলো যেন হারিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি অনুভব করেন। যুদ্ধ, ক্ষমতার রাজনীতির কাছে মানবিকতা বারবার পরাজিত হয়। “এইমতো জীবনের সাথে চলে কানামাছি খেলা”Ñএ লাইনটি একটি শক্তিশালী রূপক-জীবনের অনিশ্চয়তা ও দিকনির্দেশনাহীনতাকে বোঝায়। অপরদিকে “নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাটে রক্তাক্ত জবার মতো”-“রক্তাক্ত জবা” সৌন্দর্যের সাথে রক্তের বেদনাকে মিশিয়ে দেয়। সেই সাথে “নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাট”-আধুনিক নগর-জীবনের একাকিত্বকে প্রকাশ করে।
কবিতার শেষের দিকে এসে দেখি এক গভীর বাস্তবতাবোধের শব্দচয়ন। “একজোড়া মূল্যহীন চোখ”-কবির ক্লান্তি, নিরাশা ও প্রশ্নের প্রতীক। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের মনে এক গভীর বিষণ্ন চিন্তার আবহ তৈরি করে।

পরিশেষে বলব, “উত্তরাধিকার” নামটি অত্যন্ত অর্থবহ। শহীদ কাদরী দেখাচ্ছেন, প্রজন্ম যে উত্তরাধিকার পেয়েছে তা কোনো গৌরবের ঐতিহ্য নয়, বরং যুদ্ধ, ভয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও একাকিত্বের এক ক্ষত-বিক্ষত সময়; যা আজকের দিনেও খুবই প্রাসঙ্গিক। এই কবিতা তাই যুদ্ধবিরোধী, রাজনৈতিক, নগরজীবনের ও গভীর আত্মসমালোচনার কবিতা।
‘পাশের কামরার প্রেমিক’

(উত্তরাধিকার)
এই কবিতায় কবি প্রেমিককে শুধু কোমল, রোমান্টিক অনুভূতি হিসেবে দেখেননি; বরং শরীর, কামনা, বিরক্তি, স্মৃতি, মৃত্যু, একাকিত্ব এবং মানুষের চেতনার সঙ্গে রিপুর এবং জৈবিক চাহিদাকে মিশিয়ে একধরনের তীব্র লালসার অভীপ্সাকে ব্যক্ত করেছেন। কবি আলোচ্য কবিতায় প্রেমের সৌন্দর্যের চেয়ে প্রেমের অন্তর্গত জটিলতাকে বেশি করে তুলে ধরেছেন।
কবিতার শুরুতে “গলা চিরে” কথাটির মধ্যে প্রকাশের তীব্রতা লক্ষণীয়। প্রেমিকের আকাক্সক্ষা যেন এত প্রবল যে, শরীরের স্বাভাবিক সীমা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

“শ্বাসকষ্টে যা পায় তা প্রেম, ঠান্ডা হাওয়া”, এখানে কবি প্রেমকে একটু ব্যঙ্গাত্মকভাবে দেখেছেন। অর্থাৎ এখানে প্রেমের মহত্ত্বকে রিপুর তাড়নায় শারীরিক আকাক্সক্ষার স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। “হৃৎপিণ্ডে বিরক্তিকর উৎকট নর্তন” শেষের দুটি শব্দ মিলে হৃদয়ের অস্থিরতা ও তীব্র স্পন্দনকে বোঝাতে চেয়েছেন। প্রেম এখানে আনন্দের কোমল স্পন্দন নয়, বরং এমন এক উত্তেজনা, যা একই সঙ্গে আনন্দদায়ক এবং বিরক্তিকর।

আগেই বলেছি, এই কবিতায় রয়েছে জৈবিক তাড়নার চুম্বকী জ্বালা এবং অতৃপ্ত বাসনার হাহাকার। কবিতার চতুর্থ স্তবক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ধৃতি দিচ্ছি-
“তার সামনে সর্পের বঙ্কিম, শান্ত চতুরালি, স্পষ্টত নিষ্পাপ
ফোলা-গাল সাপুড়ের ভেপু একেবারে নির্ভয়, বিপদমুক্ত”
এখানে হঠাৎ কবিতার আবহ একটু বদলে যায়। এটি ব্যর্থ প্রেমেরই একটি প্রতীক হতে পারে। প্রেমের মাধুর্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে বিষাদ, বিপদ ও যন্ত্রণার অভিঘাত। মানুষ বিপদের সঙ্গে খেলতে অভ্যস্ত। বিপদ আছে জেনেও মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেকে প্রেমের বেদিতে সমর্পণ করে। সব প্রেম সফলতার চৌকাঠ অতিক্রম করতে পারে না ঠিকই, কিন্তু যে প্রেম কিছুক্ষণ আগে ছিল উন্মত্ত, অধীর, উত্তেজনাপূর্ণ, শেষে তা পরিণত হয় নিস্তব্ধ ও নিঃসঙ্গতায়।

এই কবিতার শেষের অংশটি সবচেয়ে গভীর এবং তাৎপর্যময়। এখানে প্রথম একটি লাইনে কাব্যিক ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে উঠেছেÑ
“এ হেন অনেক কিছু, একটু আয়াসে চিনেবাদামের খোসা
ভাঙতে-ভাঙতে পার হওয়া যায় হে দীপ্ত প্রেমিক”
এখানে কবি হঠাৎ একটি অর্থালংকার শব্দ “চিনেবাদামের খোসা” নিয়ে এসেছেন। এটি শহীদ কাদরীর কবিতায় শব্দচয়নের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। কবিতার শরীরে তাঁর তীক্ষè মনন চেতনাকে যেমন শাণিত করেছেন, তেমনি কবিতার ভাঁজে ভাঁজে শব্দের নিপুণ জাল বুনেছেন। পরের অংশে দেখা যায়,
“ট্রেনে-কাটা শূকরের লালরক্ত, মৃত্যু, আর্তনাদ !” এখানে ‘লালরক্ত’, ‘মৃত্যু’, ‘আর্তনাদ’Ñএই তিনটি শব্দ কবিতাটিকে হঠাৎ এক ভয়াবহ কঠিন বাস্তবতার মধ্যে নিয়ে যায়।

সর্বশেষে কবিতার চার লাইনে বিধৃত হয়েছে,
“কিছুই শোনে না কেউ তলপেটে অনাস্বাদিত বিহ্বল কাম,
আত্মার ভেতরে ওড়ে নীলমাছির বিরক্তির, মগজে উদ্যান
দীর্ঘজীবী হোক তবু যেন তার সব স্বপ্নক্রীড়া
মাঝরাতে যে কারণে হিমহস্ত টেবিল বজায় !”
এখানেও কবি আবার শরীর ও মনের দ্বন্দ্বে ফিরে আসেন। এখানে কামনা একটি অনাবাদি জমির মতো। অর্থাৎ আকাক্সক্ষা আছে, কিন্তু পূর্ণ বিকাশ বা পরিণতি নেই। অপরদিকে খুব চমৎকার প্রতীক লক্ষ করা যায়। মাছি সাধারণভাবে অস্বস্তি, পচন, বিরক্তির সঙ্গে যুক্ত। প্রেমের আনন্দের মধ্যে তাই বিরক্তির নীলমাছিও উড়ছে!
পরিশেষে বলা যায়, এই কবিতায় শহীদ কাদরী প্রেমের সৌন্দর্যের চেয়ে মানুষের মনের অন্তর্গত জটিলতাকে বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখিয়েছেন।
আকর্ষণ, কামনা, উত্তেজনা, তৃপ্তি, বিরক্তি, স্মৃতি, শূন্যতা, মৃত্যু, আর্তনাদÑএই সবকিছু আমাদের দীর্ঘ মানসিক যাত্রার নাম। আর ‘পাশের কামরার প্রেমিক’ যেন আমাদের পাশেই থাকা সেই মানুষটি, যার ঘরের দেয়ালের ওপারে আমরা আছি, কিন্তু ভেতরের কামনা, একাকিত্ব, ব্যর্থতা ও যন্ত্রণা আমরা শুনতে পাই না।

এ কারণেই কবিতাটির শেষ পর্যায়ে এসে প্রেম আর নিছক প্রেম থাকে না, এটি হয়ে ওঠে আধুনিক মানুষের একাকিত্বের নির্মোহ প্রতীক।
‘আজ সারাদিন’
(কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই )
কবিতাটি আধুনিক বাংলা কবিতার একটা গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি।
কবি অনুভব করছেন, সারা দিনের বাতাস যেন তাঁকে নিজের সঙ্গে টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে। বাতাস কখনো চুলের মুঠি ধরে টানে, কখনো পাতার মতো তাঁকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। এখানে বাতাস কবির মনের অস্থিরতা ও মানসিক টানাপোড়েনের প্রতীক। কবি যেন নিজের ইচ্ছায় স্থির থাকতে পারছেন নাÑকোনো অদৃশ্য শক্তি তাঁকে ক্রমাগত তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

আবার হঠাৎ বজ্রপাতের মতো শব্দ হয়, মানুষের মুখের আদলে তৈরি একটি গোলাপের কাছেও যেন একই অভিযোগ শোনা যায়, ‘তুমি অপরাধী’ বৃষ্টিভেজা কাকের মুখেও একই অভিযোগের বার্তা ধ্বনিত হয়। এটি কবির অন্তরের অপরাধবোধ, একাকিত্ব বা আত্মজিজ্ঞাসারও প্রতীক হতে পারে। কবি যেন নিজের কাছেই নিজেকে প্রশ্ন করছেন।
অন্যদিকে ‘তোমার বাড়ির কিন্নরকণ্ঠ নদী’, এখানে প্রতীকী অর্থে নদী এসেছে, যেখানে দূরত্ব, বাধা, বিচ্ছিন্নতা অর্থাৎ কবি ও কাঙ্খাকিত মানুষের মধ্যে একটি মানসিক দূরত্ব রয়েছে।

কবিতার শেষের দিকে কয়েকটি লাইনে দেখা যায় আশা-নিরাশার দোলাচলে খুব সাধারণ জিনিসগুলোর মধ্যে কবি প্রিয় মানুষটির উপস্থিতি অনুভব করছেন। অর্থাৎ তার স্মৃতি এত গভীর যে প্রকৃতির দৃশ্যও প্রিয় মানুষটির স্মৃতির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। কবি এত দূর এসে মনের তীব্র বেদনা নিয়ে বলতে থাকেন, ‘তা হলে তোমার কাছে গিয়ে আর কী হবে ?’ এই কথাটি কবিতার খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ।এখানে রয়েছে আকাক্সক্ষা ও হতাশার দ্বন্দ্ব।

‘আজ সারা দিন ... গোয়েন্দার মতো’-এখানে কবির মনে নিজের চিন্তা ও স্মৃতি থেকে পালানোর উপায় নেই। তিনি যেদিকেই যান, তাঁর অতীত ও প্রিয় মানুষের স্মৃতি তাঁকে অনুসরণ করে।
শেষের দিকে কবি বলেন, তিনি যেন একজন ‘হা ঘরে উদ্ভান্ত মানুষের মতো’ গোটা শহর ঘুরে বেড়িয়েছেন। এর মধ্যে বোঝা যায়, তিনি মূলত প্রকৃতির মধ্যেই ঘুরেছেন, পাখির সঙ্গে কথা বলেছেন, নদী পার হচ্ছেন, শহরে ঘুরছেন-কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি নিজের স্মৃতি, ভালোবাসা, অপরাধবোধ, একাকিত্ব ও অস্থিরতার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছেন।
পরিশেষে বলা যায়, কবিতাটিতে কবি মানুষের অন্তর্জগতের অস্থিরতা, অপরাধবোধ, একাকিত্ব ও প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকাক্সক্ষাকে গভীরভাবে তুলে ধরেছেন।

‘ব্ল্যাক আউটের পূর্ণিমায়’
(তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা)
শহীদ কাদরীর “ব্ল্যাক আউটের পূর্ণিমায়” তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতা। কবিতার প্রথম অংশে কবি স্বদেশের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত, কোমল, প্রায় রোমান্টিক সম্পর্ক দেখান। দেশ এখানে কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং কবির দেহে, স্পর্শে, অনুভবে মিশে থাকা এক অস্তিত্ব। এই স্বদেশ কখনো প্রিয়জন, কখনো অলংকার, কখনো নিজের সত্তারই অংশ। ভাষা খুব কোমল, খুব ঘনিষ্ঠ। তারপর ধীরে এই কোমলতা সংগ্রামে রূপ নেয়। স্বদেশ হয়ে ওঠে সংগ্রামের প্রতীক। এখানে প্রকৃতি, অস্ত্র, মানুষ-সব একসঙ্গে মিশে যায়। এরপর কবি যুদ্ধের আবহ নিয়ে আসেন-সৈন্য, শিবির, কুচকাওয়াজ, সামরিক শক্তি। কিন্তু কবির জোর এই যে, বাইরের শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন-স্বদেশ অটুট। সত্যিকারের শক্তি মানুষের চেতনার মধ্যে, কোনো সামরিক শক্তির মধ্যে নয়। তারপর সবচেয়ে বেদনাময় অংশ আসে। কবি দেখান, যুদ্ধের কারণে সারা দেশ যেন এক বিশাল বধ্যভূমি। চারদিকে রক্ত, মৃত্যু, আর্তনাদ, আতঙ্ক। কিন্তু এই অন্ধকারেও কবি আশা ছাড়েন না। যে মাটিতে আজ রক্ত ঝরছে, সেই মাটিই একদিন স্বাধীনতার জোয়ারে ভরে উঠবে। এক জায়গায় তিনি জীবনানন্দ দাশকে স্মরণ করেন। জীবনানন্দের কবিতায় যে সবুজ, শান্ত বাংলা ছিল, যুদ্ধ সেই বাংলাকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। আগে ধানের গন্ধ ছিল যে বাতাসে, এখন সেই বাতাসে বারুদের গন্ধ, রক্তের গন্ধ। তারপর কবি সেই সব মানুষের কথা বলেন, যারা দীর্ঘদিন পরাধীনতার অন্ধকারে বাস করেছে। কিন্তু যুদ্ধ তাদের ভেতরে নতুন চেতনা এনেছে। তাদের রক্তে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা জেগে উঠেছে। যেখানে “ব্ল্যাক আউট”, অন্ধকার, ভয়, দমন-সবকিছুকে অস্বীকার করে কবি দিগন্তে জ্বালান “বিদ্রোহী পূর্ণিমা”। এই পূর্ণিমা কেবল আকাশের চাঁদের আলো নয়, এটা মুক্তির আলো, প্রতিরোধের আলো। শেষ দিকে কবি এমন একটি দৃশ্য কল্পনা করেন, যেখানে মানুষ আবার নিজের ঘরে ফিরছে। এই “ঘর” শুধু বাড়ি নয়, এটা স্বাধীন দেশ, নিজের পরিচয়, নিরাপদ জীবন, প্রিয়জনের কাছে ফেরা। কবিতার শুরুতে যে অন্ধকার, অনিশ্চয়তা ছিল, কবিতার শেষে আসে আলোর প্রত্যাবর্তন।
পরিশেষে কবির স্মৃতির প্রতি অতল সম্মান এবং বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
-নিউইয়র্ক।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz