বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে জাতি ও জনগণের প্রত্যাশা
মে. জে. এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.)
প্রকাশ : ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১৮:৫৫
•
অনলাইন সংস্করণ
মে. জে. এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.)
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের ৮৮ ভোটের বিপরীতে ২৫৫ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সালের পর এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ৭৮ বছর বয়সে তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, শিক্ষকতা, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, সংসদীয় রাজনীতি ও মন্ত্রিত্বের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা নিয়ে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেছেন। তাই তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়াকে শুধু একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক জীবনের সর্বোচ্চ অর্জন হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদটির কার্যকরতা, মর্যাদা ও জনসম্পৃক্ততা নতুনভাবে প্রতিষ্ঠার একটি বড় সুযোগ। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণকারী মির্জা ফখরুল একটি সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন দেশের একজন সুপরিচিত রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রী। তিনি দীর্ঘদিন ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। পারিবারিক রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে মির্জা ফখরুল শৈশব থেকেই জনজীবন, রাজনৈতিক বিতর্ক, নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব সম্পর্কে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে তাঁর নিজের কর্মজীবনও গড়ে উঠেছে শিক্ষা, শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার এবং জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে। ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা কলেজ ও ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্বেও কাজ করেছেন।
মির্জা ফখরুলের প্রত্যক্ষ জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক জীবনের সূচনা স্থানীয় পর্যায়ে। তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগ দেন। তিনি বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি, জাতীয় সংসদ সদস্য এবং কৃষি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সময় অতিক্রমের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখপাত্র, নীতিনির্ধারক ও সংগঠকে পরিণত হন। ২০১১ সালে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরবর্তী সময়ে মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন তিনি অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজনৈতিক মামলা, কারাবরণ, আন্দোলন, দমন-পীড়ন এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি তুলনামূলকভাবে সংযত ও পরিমিত ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার জন্য পরিচিতি অর্জন করেন। বিরোধী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর অতীত অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তিনি নিজে রাজনৈতিক নিপীড়ন, কারাবরণ, মামলা এবং বিরোধী মতপ্রকাশের প্রতিবন্ধকতা প্রত্যক্ষ করেছেন। সুতরাং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, হয়রানি বা অপমান করার কাজে ব্যবহার করলে তার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারেÑএ বিষয়ে তাঁর উপলব্ধি থাকার কথা। এখন তাঁর দায়িত্ব হবে, অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিশ্চিত করা যে কোনো নাগরিক শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা ভিন্নমতের কারণে রাষ্ট্রীয় অবিচারের শিকার না হন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এত দিন তিনি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন এবং কয়েক দশক ধরে সেই দলের কর্মসূচি, সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে সেই দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। তিনি আর শুধু বিএনপি, সরকার কিংবা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতিনিধি নন। তিনি এখন প্রায় ১৭ কোটি বাংলাদেশির রাষ্ট্রপতি-বিএনপির সমর্থক, বিরোধী দলের সমর্থক, দলনিরপেক্ষ নাগরিক, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং দেশের ভেতরে ও বাইরে অবস্থানকারী সব বাংলাদেশির অভিভাবকসুলভ রাষ্ট্রপ্রধান। তাঁর এই রাজনৈতিক রূপান্তর কেবল কাগজে-কলমে বা দলীয় পদ থেকে পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তাঁর কথা, কাজ, সিদ্ধান্ত, সাক্ষাৎ, নিয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় আচরণের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকতে হবে। বঙ্গভবনকে কোনোভাবেই ক্ষমতাসীন দলের কার্যালয়ের সম্প্রসারিত অংশে পরিণত করা যাবে না। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ শুধু মন্ত্রী, সরকারি দলের নেতা ও ক্ষমতাসীনদের সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বিরোধী দলের নেতা, ছোট রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, নারী, তরুণ, শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, সাংবাদিক, পেশাজীবী এবং অন্যায়-অবিচারের শিকার মানুষের জন্যও বঙ্গভবনের দরজা উন্মুক্ত থাকতে হবে। দেশের প্রত্যেক নাগরিকের মনে এই বিশ্বাস সৃষ্টি করতে হবে যে প্রয়োজনের সময় রাষ্ট্রপতি তাঁদের কথা শুনবেন এবং সাংবিধানিক সীমার মধ্যে তাঁদের পাশে দাঁড়াবেন।
রাষ্ট্রপতির প্রধান দায়িত্বগুলোর একটি হওয়া উচিত সংবিধান ও সাংবিধানিক নৈতিকতার অভিভাবক হিসেবে কাজ করা। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংবিধান ও আইন তাঁকে যেসব ক্ষমতা ও দায়িত্ব দিয়েছে, তিনি সেগুলো প্রয়োগ ও পালন করবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হলেও তার অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রপতির পদটি সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন বা শুধু আনুষ্ঠানিক। রাষ্ট্রপতি সংবিধান সংরক্ষণ, রক্ষা ও সমর্থনের শপথ গ্রহণ করেন। এই শপথ শুধু আনুষ্ঠানিক বাক্য নয়; এটি একটি গুরুতর নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হলেও রাষ্ট্রপতি প্রস্তাবিত কোনো সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি, সাংবিধানিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সম্ভাব্য জাতীয় পরিণতি সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তিনি ব্যাখ্যা চাইতে পারেন, পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিতে পারেন এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করতে পারেন। একজন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম না করেও দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গতিপথে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারেন। তিনি ব্যক্তিগত বৈঠকে সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারেন, কোনো সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করতে পারেন এবং জাতীয় সংকটের সময় সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিতে পারেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে গণতন্ত্র, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সৎ প্রশাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেন।
রাষ্ট্রপতিকে সরকার ও সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া কিংবা সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সীমাহীন ক্ষমতার অনুমোদন নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দল রাষ্ট্রের শত্রু নয়; বরং বিরোধী দল জবাবদিহি, ভারসাম্য ও বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তার অপরিহার্য অংশ। একইভাবে, সরকারের সমালোচনা করা রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। একজন কার্যকর রাষ্ট্রপতি এ ধরনের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় নৈতিক নেতৃত্ব দিতে পারেন। বিভিন্ন সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। যেসব নিয়োগে তাঁর আনুষ্ঠানিক, সাংবিধানিক কিংবা পরামর্শমূলক ভূমিকা রয়েছে, সেখানে দলীয় আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রকাশ্যে দলীয়, বিতর্কিত কিংবা অযোগ্য ব্যক্তিদের বসানোর কোনো প্রচেষ্টা হলে তাঁর উচিত তা যাচাই করা এবং প্রয়োজনবোধে পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেওয়া। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরকে প্রতিটি সরকারি প্রস্তাবের স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনে পরিণত করা উচিত নয়। সাংবিধানিকভাবে কোনো পরামর্শ মানতে বাধ্য হলেও তিনি তার আইনগত ভিত্তি ও জনস্বার্থের দিকটি পরীক্ষা করতে পারেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসে তাঁর দায়িত্ব শুধু নথিতে স্বাক্ষর করা নয়; তাঁর দায়িত্ব হলো নিশ্চিত হওয়া যে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো সংবিধান, আইন ও জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমা প্রদর্শন, দণ্ড স্থগিত, হ্রাস বা পরিবর্তনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষমতা অত্যন্ত সতর্কতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। দলীয়ভাবে প্রভাবশালী অপরাধী, ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক কিংবা বিশেষ মহলের স্বার্থরক্ষায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের সুযোগ ব্যবহার করা হলে বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রতিটি আবেদন অপরাধের প্রকৃতি, আদালতের পর্যবেক্ষণ, মানবিক পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষা করা উচিত।
সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে বাহিনীগুলোর পেশাদারত্ব, শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে। কোনোভাবেই সশস্ত্র বাহিনীকে দলীয় রাজনীতিতে জড়ানো কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা হবে বাহিনীর সাংবিধানিক আনুগত্য, পেশাগত দক্ষতা, আধুনিকায়ন ও গণতান্ত্রিক বেসামরিক কর্তৃত্বের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রপতির উচিত প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী অন্য দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। গুরুতর রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে তিনি বঙ্গভবনকে নিরপেক্ষ আলোচনার স্থান হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তিনি হয়তো নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারবেন না, কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন। সব পক্ষের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সমঝোতার পথ খুঁজতে সহায়তা করা একজন রাষ্ট্রপতির অত্যন্ত মূল্যবান অবদান হতে পারে।
নতুন রাষ্ট্রপতিকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হতে হবে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক বিভাজনে আক্রান্ত। এখানে অনেক জাতীয় প্রশ্নকেও দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হয়। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের উচিত মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে স্বীকৃত জাতীয় অবদানকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট দলের সম্পত্তিতে পরিণত না করে মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক এবং সাধারণ মানুষের ত্যাগকে সম্মান জানাতে হবে। জাতীয় দিবস ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলো যেন বিভাজনের পরিবর্তে নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ করে, সেদিকে তাঁকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, গণপিটুনি, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, দুর্নীতি, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাতের বিরুদ্ধে তাঁকে সুস্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায় আক্রান্ত হলে তাদের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, জাতিগত কিংবা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে রাষ্ট্রপতির উচিত পাশে দাঁড়ানো। নির্বাহী ক্ষমতা অন্যত্রÑএই অজুহাতে নীরব থাকলে চলবে না। রাষ্ট্রপতির সময়োচিত বক্তব্য জনগণকে আশ্বস্ত করতে, প্রশাসনকে দায়িত্বশীল করতে এবং জাতির সামনে একটি নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে।
একই সঙ্গে তাঁকে কয়েকটি বড় বিপদ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, দলীয় মনোনয়ন বা পদবণ্টনে প্রভাব বিস্তার, দলীয় সমর্থকদের জন্য রাষ্ট্রীয় নিয়োগ নিশ্চিত করা, সরকারের প্রতিটি কাজকে নির্বিচারে সমর্থন করা কিংবা বিরোধী দলকে আক্রমণ করা থেকে তাঁকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। সরকারের অস্বস্তি হতে পারেÑশুধু এই আশঙ্কায় সংবিধান ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে নীরব থাকাও উচিত নয়। আবার নিজের সাংবিধানিক এখতিয়ার অতিক্রম করে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত সৃষ্টি করাও সমীচীন হবে না। তাঁর সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো-সক্রিয় থাকবেন, কিন্তু ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করবেন না; স্বাধীন বিবেচনার পরিচয় দেবেন, কিন্তু অযথা সংঘাত সৃষ্টি করবেন না; প্রভাবশালী হবেন, কিন্তু দলীয় পক্ষপাত করবেন না। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলেই তিনি রাষ্ট্রপতি পদের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবেন। একজন রাষ্ট্রপতিকে কার্যকর হতে সীমাহীন নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না। নৈতিক কর্তৃত্ব, সাংবিধানিক জ্ঞান, ব্যক্তিগত সততা, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং সংকটময় মুহূর্তে সত্য কথা বলার সাহসÑএসব গুণ রাষ্ট্রপতির পদকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে পারে। যে রাষ্ট্রপতি কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া শুধু কাগজে স্বাক্ষর করেন, তিনি হয়তো ‘কাগুজে বাঘ’ হিসেবেই বিবেচিত হবেন। কিন্তু একজন বিবেকবান ও সাহসী রাষ্ট্রপতি জাতির সাংবিধানিক বিবেক হয়ে উঠতে পারেন। তিনি কঠিন প্রশ্ন তুলতে পারেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেন, সংলাপ উৎসাহিত করতে পারেন এবং ক্ষমতাসীনদের স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন যে রাষ্ট্র ও সরকার মানুষের সেবার জন্য।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি সময় গণতন্ত্র, সুষ্ঠু নির্বাচন, জবাবদিহিমূলক সরকার এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে কাটিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে এখন তাঁর সামনে সেই নীতিগুলো দলমত-নির্বিশেষে বাস্তবে ধারণ করার সুযোগ ও দায়িত্ব এসেছে। তিনি বঙ্গভবনের জাঁকজমক, আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি কিংবা দীর্ঘ বক্তৃতার জন্য ইতিহাসে মূল্যায়িত হবেন না। মানুষ তাঁকে বিচার করবেÑতিনি সংবিধান ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন কি না, দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে থাকতে পেরেছিলেন কি না, সংকটে মানুষের পাশে ছিলেন কি না এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন কি না। মির্জা ফখরুল যদি দলীয় আনুগত্যের সীমা অতিক্রম করে একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিক, মানবিক, নিরপেক্ষ ও সাংবিধানিকভাবে সাহসী রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারেন, তাহলে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারবেন। তিনি প্রমাণ করতে পারেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো নির্বাহী ক্ষমতাকেন্দ্র নন; আবার রাষ্ট্রের নীরব অলংকার কিংবা শুধুই আনুষ্ঠানিক পদধারীও নন। তিনি সংবিধানের সম্মানিত অভিভাবক, জাতীয় সংকটে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী এবং বাংলাদেশের সব নাগরিকের সম্মিলিত মর্যাদা, আশা ও আকাক্সক্ষার প্রতীক।