আমেরিকা-স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশায় পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের কাছে যে দেশটি আজও আকর্ষণের কেন্দ্র, সেই দেশেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনে নতুন এক উদ্বেগ ক্রমেই জায়গা করে নিচ্ছে। হঠাৎ গুলির শব্দ, রাস্তায় সংঘটিত সহিংসতা, কর্মস্থলে হামলা, ডাকাতি কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে প্রাণহানির ঘটনা এখন আর একেবারে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। কখনো কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে, কখনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে, কখনো নিজ বাসার আশপাশে কিংবা জনসমাগমপূর্ণ স্থানে-অতর্কিত সহিংসতার শিকার হচ্ছেন বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা। বাংলাদেশিরাও এর বাইরে নন।
একজন প্রবাসী যখন হাজার হাজার মাইল দূরে নিজের পরিবার, স্বজন ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন দেশে জীবন গড়তে আসেন, তখন তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাগুলোর একটি হলো নিরাপত্তা। কিন্তু সেই নিরাপত্তাবোধ যদি বারবার আতঙ্কে পরিণত হয়, তাহলে শুধু একজন মানুষ নয়, একটি পরিবার, একটি কমিউনিটি এবং একটি প্রজন্মের মানসিক স্থিতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো-প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠন থাকলেও কমিউনিটির নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও জরুরি সহায়তার বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। সংগঠন আছে, কমিটি আছে, পদ-পদবি আছে, ব্যানার আছে, সভা আছে, সংবর্ধনা আছে, পিকনিক আছে, ইফতার পার্টি আছে; কিন্তু বিপদের মুহূর্তে একজন বাংলাদেশির পাশে দাঁড়ানোর জন্য কতগুলো সংগঠনের বাস্তব প্রস্তুতি আছে-এই প্রশ্নটি আজ গুরুত্বের সঙ্গে করা দরকার।
সংগঠন কি শুধু অনুষ্ঠান করার জন্য? : কমিউনিটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য কখনোই শুধু অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতে পারে না। একটি সংগঠন মানুষের প্রয়োজন থেকে জন্ম নেয়, মানুষের পাশে থাকার জন্য টিকে থাকে এবং মানুষের কল্যাণে তার কার্যকারিতা প্রমাণ করে। কিন্তু আমাদের অনেক সংগঠনের কার্যক্রম দেখলে মনে হয়, সংগঠন যেন সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কে সভাপতি, কে সাধারণ সম্পাদক, কার অনুষ্ঠানে কত মানুষ, কার ব্যানার বড়, কার অনুষ্ঠানে কতজন অতিথি, কোন সংগঠন কত বড় হল ভাড়া করেছে-এসব প্রতিযোগিতা যেন অনেক ক্ষেত্রেই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে ফেলছে। প্রতিবছর পিকনিক, ইফতার, বনভোজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংবর্ধনা কিংবা অভিষেক আয়োজন করা নিঃসন্দেহে সামাজিক বন্ধন তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এসব অনুষ্ঠানের প্রয়োজনও আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-একজন বাংলাদেশি যখন গভীর রাতে দুর্ঘটনার শিকার হন, গুলিবিদ্ধ হন, গ্রেফতার হন, অভিবাসন-সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েন, চাকরি হারান, বাসা হারান কিংবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারান, তখন কোন সংগঠন তার পাশে দাঁড়ায়? যদি সেই উত্তর অস্পষ্ট হয়, তাহলে আমাদের সংগঠন সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
বিপদের সময়েই সংগঠনের পরিচয় : একটি সংগঠনের প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় উৎসবের দিনে নয়, সংকটের দিনে। আনন্দের অনুষ্ঠানে হাজার মানুষ জড়ো করা সহজ; কিন্তু একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো কঠিন। ছবি তোলা সহজ; কিন্তু একটি বিপদগ্রস্ত পরিবারের কয়েক মাসের দায়িত্ব নেওয়া কঠিন। মঞ্চে বক্তৃতা দেওয়া সহজ; কিন্তু হাসপাতালে ছুটে যাওয়া, পুলিশ স্টেশনে যোগাযোগ করা, আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা কিংবা মৃতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো কঠিন। তাই কমিউনিটি সংগঠনগুলোর উচিত নিজেদের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন নতুন করে করা।
আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য প্রতিটি সংগঠনের অন্তত একটি জরুরি সহায়তা কাঠামো থাকা প্রয়োজন। কোনো বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হলে, গুরুতর দুর্ঘটনায় পড়লে, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করলে কীভাবে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো হবে-তার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। কেবল ফেসবুকে শোকবার্তা কিংবা ‘আমরা গভীরভাবে শোকাহত’ লিখে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না।
নিরাপত্তা সচেতনতা হতে পারে প্রথম পদক্ষেপ : প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত কর্মসূচি হতে পারে। পুলিশ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কমিউনিটি সেফটি সেমিনার আয়োজন করা যেতে পারে। কীভাবে জরুরি পরিস্থিতিতে ৯১১-এ যোগাযোগ করতে হয়, ডাকাতি বা হামলার সময় কীভাবে নিরাপদ থাকতে হয়, কর্মস্থলে নিরাপত্তাঝুঁকি কীভাবে চিহ্নিত করতে হয়, শিশু-কিশোরদের কীভাবে নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা যায়Ñএসব বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ব্যবসায়ী, ট্যাক্সি ও রাইডশেয়ার চালক, ডেলিভারি কর্মী, গ্যাস স্টেশন কর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, রেস্টুরেন্ট কর্মী এবং রাতের শিফটে কাজ করা প্রবাসীরা অনেক সময় তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তাদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রয়োজন।
কমিউনিটি সংগঠনগুলো স্থানীয় পুলিশ প্রিসিন্ট, ফায়ার ডিপার্টমেন্ট, হাসপাতাল, আইনজীবী ও সামাজিক সেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারে। এতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সহায়তা পৌঁছাতে সময় কমবে। নতুন অভিবাসীদের জন্য ‘কমিউনিটি হেল্প ডেস্ক’ : প্রতিবছর অসংখ্য বাংলাদেশি নতুন করে আমেরিকায় আসছেন। কেউ শিক্ষার্থী, কেউ কর্মী, কেউ পরিবারের মাধ্যমে, কেউ অন্য কোনো বৈধ অভিবাসন-প্রক্রিয়ায়। নতুন দেশে এসে তারা নানা সমস্যার মুখোমুখি হন-কাজ কোথায় পাওয়া যায়, বাসা কীভাবে খুঁজতে হয়, পরিবহন-ব্যবস্থা কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, স্বাস্থ্যসেবা, ট্যাক্স, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রের অধিকার-এসব বিষয়ে অনেকেই অজ্ঞ থাকেন।
কমিউনিটি সংগঠনগুলো চাইলে একটি কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় Newcomer Help Desk চালু করতে পারে। সেখানে স্বেচ্ছাসেবকেরা নতুনদের প্রাথমিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। কোনো বিষয়ে সরকারি বা পেশাদার সহায়তা প্রয়োজন, কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, কী ধরনের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকতে হবে-এসব তথ্য বিনামূল্যে দেওয়া যেতে পারে। কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ, সবচেয়ে বড় সহযোগিতা : প্রবাসীদের একটি বড় সমস্যা কর্মসংস্থান। অনেকে দেশে ভালো অবস্থানে থাকলেও আমেরিকায় এসে নতুন করে জীবন শুরু করতে বাধ্য হন। ভাষাগত দুর্বলতা, দক্ষতার স্বীকৃতি না পাওয়া কিংবা আমেরিকার কর্মসংস্কৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেকে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় থাকেন।
কমিউনিটি সংগঠনগুলো যদি সত্যিকার অর্থে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়, তাহলে কর্মসংস্থান সহায়তা কেন্দ্র চালু করতে পারে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চাকরিদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চাকরির সুযোগের তথ্য সংগ্রহ করা যায়। ইংরেজি ভাষা, কম্পিউটার, কাস্টমার সার্ভিস, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, ট্রেড স্কিল, ড্রাইভিং, রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নামমাত্র খরচে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব।
একজন মানুষকে এক দিনের খাবার দেওয়া মানবিক কাজ; কিন্তু তাকে একটি দক্ষতা শেখানো এবং চাকরির সুযোগ করে দেওয়া তার ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
আইনি সহায়তার জন্য সংগঠিত উদ্যোগ : ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত জটিলতা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, মজুরি না পাওয়া, বাসাবাড়ির সমস্যা, পারিবারিক বিরোধ কিংবা অন্য কোনো আইনি সমস্যায় অনেক প্রবাসী অসহায় হয়ে পড়েন।
এখানে কমিউনিটি সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। সংগঠন নিজে আইনজীবী না হলেও স্থানীয় লাইসেন্সধারী আইনজীবীদের নিয়ে একটি রেফারেল নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যের আইনি পরামর্শের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিশেষ করে, ইমিগ্রেশন বিষয়ে ভুয়া পরামর্শদাতা ও প্রতারকদের হাত থেকে নতুন অভিবাসীদের রক্ষা করা জরুরি। ‘নিশ্চিত গ্রিন কার্ড’, ‘নিশ্চিত কাগজ’, ‘মামলা তুলে দেওয়া’, ‘দ্রুত নাগরিকত্ব’Ñএ ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অনেকে। সংগঠনগুলো সচেতনতা কর্মসূচি চালাতে পারে।
দূতাবাস-সংক্রান্ত সমস্যায় সহযোগিতা : বাংলাদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, কনস্যুলার সেবা কিংবা অন্যান্য সরকারি কাগজপত্র নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমস্যায় পড়তে হয়।
কমিউনিটি সংগঠনগুলো চাইলে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি মিশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তথ্যভিত্তিক সহায়তা দিতে পারে। কোনো সদস্য জটিলতায় পড়লে তাকে সঠিক দপ্তর ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানানো যেতে পারে। এখানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার নয়, বরং নাগরিক সেবা সহজ করার মানসিকতা প্রয়োজন।
মৃত্যুর পরও যেন পরিবার একা না থাকে : প্রবাসে একজন বাংলাদেশির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো কমিউনিটির জন্য একটি বড় সংকট। মৃতদেহের আনুষ্ঠানিকতা, হাসপাতাল, পুলিশ, কাগজপত্র, জানাজা, দাফন কিংবা পরিবারের প্রয়োজনীয় সহায়তা-সবকিছু একসঙ্গে সামলানো অনেক পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতিটি বড় কমিউনিটি সংগঠনের একটি Emergency Burial Assistance Fund থাকতে পারে। সদস্যদের স্বেচ্ছা অনুদান, বার্ষিক চাঁদা কিংবা দাতাদের সহযোগিতায় একটি তহবিল তৈরি করা যায়। একইভাবে কমিউনিটির বিভিন্ন এলাকায় মুসলিম কবরস্থান ও দাফন-ব্যবস্থার তথ্যভান্ডার তৈরি করা যেতে পারে। কোনো মৃত্যু ঘটলে পরিবারের সদস্যদের যেন শূন্য থেকে সবকিছু খুঁজতে না হয়।
গুলির ঘটনায় শুধু শোক নয়, প্রতিরোধও চাই : প্রবাসী বাংলাদেশি কেউ গুলিতে নিহত হলে আমরা সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করি। পরিবারটির জন্য দোয়া করি। কখনো তহবিল সংগ্রহ করি। এরপর কিছুদিন পর বিষয়টি ভুলে যাই।
এভাবে চলতে পারে না। যদি কোনো এলাকায় বাংলাদেশিরা বারবার সহিংসতার শিকার হন, তাহলে কমিউনিটি সংগঠনগুলোকে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বসতে হবে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। কোথায় ঝুঁকি বেশি, কোন সময় ঝুঁকি বেশি, কী ধরনের অপরাধ ঘটছে-এসব নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যৌথ কর্মসূচি নিতে হবে।
নেতৃত্বের প্রয়োজন ভিশন, মিশন ও জবাবদিহি : একটি সংগঠনের নেতৃত্ব শুধু পদ-পদবির বিষয় নয়। নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব। নেতৃত্ব মানে সংকটের সামনে দাঁড়ানো। নেতৃত্ব মানে নিজের স্বার্থের আগে মানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া। তাই প্রতিটি কমিউনিটি সংগঠনের একটি লিখিত Vision, Mission এবং Five-Year Action Plan থাকা উচিত।
প্রতিবছর সংগঠনকে বলতে হবে-গত এক বছরে আমরা কী করেছি? কতজন নতুন অভিবাসীকে সহায়তা করেছি? কতজনকে চাকরির তথ্য দিয়েছি? কতজনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি? কতটি পরিবারকে দুর্যোগে সহায়তা করেছি? কতজনকে আইনি সহায়তার কাছে পৌঁছে দিয়েছি? কতটি নিরাপত্তা সচেতনতা কর্মসূচি করেছি?
এই হিসাব সদস্য ও কমিউনিটির সামনে প্রকাশ করা উচিত।
নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা নয়, সেবার প্রতিযোগিতা হোক : আমাদের কমিউনিটিতে নেতৃত্বের জন্য প্রতিযোগিতা থাকবেÑএটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন হয় সেবার। কে বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দিলেন-তার প্রতিযোগিতা হোক। কে বেশি অসহায় পরিবারকে সহায়তা করলেনÑতার প্রতিযোগিতা হোক। কে বেশি নতুন অভিবাসীকে চাকরির সুযোগ করে দিলেনÑতার প্রতিযোগিতা হোক। কে বেশি মানুষের আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করলেন-তার প্রতিযোগিতা হোক। ব্যানার বড় করার প্রতিযোগিতার চেয়ে মানবিকতার পরিধি বড় করার প্রতিযোগিতা অনেক বেশি প্রয়োজন।
এখনই সময় নতুন করে ভাবার : আমেরিকায় বাংলাদেশি কমিউনিটি আজ আর ছোট কোনো কমিউনিটি নয়। ব্যবসা, পেশা, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, আইনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। এই অর্জনের সঙ্গে আমাদের সামাজিক দায়িত্বও বেড়েছে।
আমাদের সংগঠনগুলোকে এখন উৎসবকেন্দ্রিকতা থেকে সেবাকেন্দ্রিকতায় যেতে হবে। পিকনিক হবে, ইফতার হবে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে-এসব বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এগুলোর পাশাপাশি থাকতে হবে একটি কার্যকর মানবিক কাঠামো।
প্রতিটি সংগঠনের একটি জরুরি ফোন নম্বর থাকতে পারে। প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল থাকতে পারে। আইনজীবী, চিকিৎসক, মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, চাকরিদাতা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি সহযোগী নেটওয়ার্ক থাকতে পারে। বিপদে পড়া মানুষের জন্য জরুরি তহবিল থাকতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-এই উদ্যোগগুলো যেন শুধু কাগজে-কলমে না থাকে।
আমেরিকার মাটিতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব একা কোনো ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা সরকারের নয়। এটি একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে কমিউনিটি সংগঠনগুলো যেহেতু মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করে, তাই তাদের দায়িত্ব অন্যদের তুলনায় বেশি।
আজ যদি একজন বাংলাদেশি গুলিতে নিহত হন, কাল আরেকজন দুর্ঘটনায় পড়তে পারেন। আজ কেউ ইমিগ্রেশন জটিলতায় পড়ছেন, কাল অন্য কেউ চাকরি হারাতে পারেন। আজ একটি পরিবার শোকের মধ্যে আছে, কাল অন্য একটি পরিবার একই বিপদের মুখোমুখি হতে পারে। তাই বিপদ আসার পর সংগঠন তৈরি করার সুযোগ নেই। বিপদের আগেই প্রস্তুতি নিতে হয়।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি কমিউনিটি, যেখানে একজন নতুন প্রবাসী আমেরিকায় পা রাখার পর নিজেকে একা মনে করবেন না; চাকরি হারালে পাশে কাউকে পাবেন; আইনি সমস্যায় পড়লে সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারবেন; দুর্ঘটনায় পড়লে দ্রুত সহায়তা পাবেন; আর মৃত্যুর পর তার পরিবারও যেন অসহায় হয়ে না পড়ে।
কমিউনিটি সংগঠনগুলোর আসল সাফল্য কত বড় অনুষ্ঠান করেছে, কতজন অতিথি এসেছে কিংবা কতটি ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছেÑতার মধ্যে নয়। আসল সাফল্য হলো-কতজন মানুষের দুঃসময়ে সংগঠনটি পাশে দাঁড়িয়েছে।
আজ সময় এসেছে আত্মপ্রচার থেকে আত্মসমালোচনায় যাওয়ার। পদ-পদবির অহংকার থেকে দায়িত্ববোধে যাওয়ার। অনুষ্ঠানকেন্দ্রিকতা থেকে সেবাকেন্দ্রিকতায় যাওয়ার।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠনগুলো যদি সত্যিই কমিউনিটির নেতৃত্ব দিতে চায়, তাহলে তাদের সামনে এখন একটি পরিষ্কার প্রশ্ন-আমরা কি শুধু আনন্দের দিনে একসঙ্গে থাকব, নাকি বিপদের দিনেও একজন বাংলাদেশির পাশে দাঁড়াব? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতৃত্বের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করবে।
সংগঠন হোক মানুষের জন্য, নেতৃত্ব হোক সেবার জন্য আর কমিউনিটি হোক বিপদের দিনে আশ্রয়ের ঠিকানা।