লেখার শিরোনামে ব্যবহৃত বাক্যটি আমার নয়, এটি ভারতের সংসদের রাজ্যসভার কংগ্রেস এমপি রেনুকা চৌধুরীর। ২০ জুলাই নয়াদিল্লির যন্তরমন্তর এলাকায় ‘ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমাবেশে উপস্থিত হয়ে দলের আন্দোলনে ছাত্র-জনতার উপস্থিতি দেখে অভিভূত হয়ে তিনি এই বাক্যটি উচ্চারণ করেন। তার ভাষায়, ‘I can sense a revolution in the air. Democracy is thriving, it’s heart is beating. পরে রেনুকার সেন্টিমেন্টের সঙ্গে আরও কয়েকজন বিরোধীদলীয় নেতা একাত্মতা প্রকাশ করেন, যাদের মধ্যে ছিলেন রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এমপি, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খারগে, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, কংগ্রেস নেতা শারদ পাওয়ার, তার কন্যা সুপ্রিয়া পাওয়ার সুলে এমপি, তৃণমূল কংগ্রেস এমপি মহুয়া মৈত্র প্রমুখ। তথ্যমতে, গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মনোনীত ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এক মামলার শুনানিকালে সমাজমাধ্যমের কর্মীদের বেকার উল্লেখ করে তাদেরকে ব্যঙ্গ করে ককরোচ বা তেলাপোকা ও পরগাছার (প্যারাসাইট) সঙ্গে তুলনার প্রয়াস পান, যদিও পরে তিনি তার উক্তির ব্যাখ্যা দিয়ে ভুয়া ডিগ্রিধারী বেকারদের উদ্দেশ করে ওই উক্তি করেন বলে জানান। বেকার তরুণদের সম্পর্কে তার এহেন অবমাননাকর উক্তি ভারতের তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের জন্ম দেয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী অভিজিৎ দিপকেসহ বিদেশে (যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ইত্যাদি) শিক্ষা গ্রহণকারী আরও কতিপয় ভারতীয় ছাত্র ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে মিল (প্যারোডি) রেখে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) নামে একটি ইন্টারনেটভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর এটি ভারতীয় তরুণদের মধ্যে বিপুল সাড়া তোলে এবং কিছুদিনের মধ্যে লাখ লাখ তরুণ এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হন। প্রধানত, ভারতীয় আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক সিস্টেমে বিরাজমান নানা ধরনের অনিয়মের অবসান ও সকল পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পক্ষে এই প্ল্যাটফর্ম আওয়াজ তোলে। ককরোচ পার্টি মনে করে, তরুণেরা নিজের ইচ্ছায় বেকার নন, বরং রাষ্ট্র কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদেরকে বেকার থাকতে হচ্ছে এবং তারা মোটেও তেলাপোকা বা পরগাছা নন। তেলাপোকার মতো তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ময়লা-আবর্জনার মধ্যে নয়।
গত ৪ মে ভারতের পাবলিক মেডিকেল কলেজে ভর্তির National Eligibility cum Entrance test (NEET) অনুষ্ঠিত হয়। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হাজার হাজার ভারতীয় তরুণ এই পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু পরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠলে ১২ মে পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করে পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। এর ফলে দরিদ্র অভিভাবক, যারা জমিজমা বিক্রি এবং সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করে সন্তানদের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করেন, তারা নিদারুণ বিপাকে পড়েন এবং নতুন করে সন্তানদের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে চরম আর্থিক দুর্ভোগে পতিত হন। যেসব ছাত্র পূর্বের বাতিল পরীক্ষায় ভালো করায় মেডিকেলে ভর্তি নিশ্চিত মনে করেছিলেন, তারা পরীক্ষা বাতিলের কারণে সীমাহীন হতাশায় নিমজ্জিত হন। হতাশাগ্রস্ত বেশ কয়েকজন তরুণ (তথ্যমতে, প্রায় ২০ জন) আত্মহননের পথ বেছে নেন। যদিও সরকার-সমর্থক কিছু মিডিয়া (রিপাবলিক টিভি ইত্যাদি) আত্মহত্যাকারী তরুণের সংখ্যা চারজনের অধিক নয় বলে প্রচার করে। পত্রিকান্তরে পরীক্ষা বিপর্যয়ের কারণে একটি পরিবারের এক সন্তানের আত্মহত্যার পর সেই সন্তানের বাবার আহাজারি তুলে ধরা হয়। বাবা তার পুত্রের বইগুলো বুকে নিয়ে আর্তচিৎকার করে তার পুত্রকে ফিরে আসতে বলে বইগুলো তার ডাক্তার পুত্রকে বুঝিয়ে দিতে চাইছেন। বইগুলো নিয়ে তিনি কী করবেন, তা তিনি বুঝতে অক্ষম বলে মাতম করছেন।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষায় ঘন ঘন প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ, জবাবদিহি, সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের (Overhaul) দাবিতে পেশায় প্রকৌশলী, শিক্ষা সংস্কার ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুর অ্যাকটিভিস্ট সোনম ওয়াংচুক (৫৯) গত ২৮ জুন থেকে নয়াদিল্লির যন্তরমন্তর এলাকায় মঞ্চ স্থাপন করে আমরণ অনশন শুরু করেন। ৯ জুলাই তার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ২০ জুলাই সেখান থেকে ‘সংসদ মার্চ’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়।
উল্লেখ্য, ২০ জুলাই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিন। পুলিশ কর্মসূচি পালনের অনুমতি না দিয়ে সেদিন সেখানে ৫ জনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। ওই এলাকায় লোকসমাগম বাধাগ্রস্ত করতে এলাকা-সংলগ্ন একাধিক মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধসহ সংসদে যাওয়ার প্রায় সব রাস্তার প্রবেশমুখে লৌহনির্মিত ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দিল্লিতে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে এলাকায় বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। এর মধ্যে ১৮ জুলাই চিকিৎসার অজুহাতে ২১ দিন ধরে অনশনরত সোনম ওয়াংচুককে পুলিশ জোরপূর্বক সাদা চাদরে ঢেকে একপ্রকার চ্যাংদোলা করে অনশন মঞ্চ থেকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ দাবি করে অনশন চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করেন। বিভিন্ন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল এ ঘটনাকে মানুষের প্রতিবাদ জানানোর গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ বলে তীব্র ধিক্কার জানায়। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ২০ জুলাই বিপুলসংখ্যক ছাত্র-জনতা (প্রায় ২০-৩০ হাজার) যন্তরমন্তরে জমায়েত হয়ে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে সংসদ অভিমুখে মার্চ শুরু করে। এ সময় ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে পুরো এলাকা রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। পুলিশের লাঠিচার্জে বহুসংখ্যক ছাত্র-জনতা আহত হয়ে সড়কে বসে পড়ে। ছাত্রদের ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া দিয়ে গণপিটুনিতে শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হন। পুলিশ প্রায় ৭০ জন ছাত্র-জনতাকে আটক করে। সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ কয়েকজন ছাত্রনেতাকে সংসদ ভবনে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নড্ডার বৈঠকে ছাত্রনেতারা তাদের তিন দফা দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো হলো : ক. জবাবদিহি নিশ্চিত করে শিক্ষাব্যবস্থার আশু সংস্কার, খ. শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং গ. আত্মহত্যাকারী ছাত্রদের প্রতিটি পরিবারের জন্য ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ। মন্ত্রী ছাত্রদেরকে আন্দোলন থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
পরদিন ২১ জুলাই রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ আরও কয়েকজন নেতা যন্তরমন্তরে এসে ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ওই এলাকা-সংলগ্ন লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন। ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের বর্বরোচিত আচরণ (Police Brutality) এবং এ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর নীরবতার নিন্দা করে নেতৃবৃন্দ তার পদত্যাগ দাবি করেন। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে একপর্যায়ে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ অন্য দু-একজন নেতাকে পুলিশ আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর অবশ্য তাদের সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে অবশ্য আন্দোলন স্তিমিত না হয়ে বরং তা দিল্লি ছাড়িয়ে কলকাতা, মুম্বাইসহ দেশের আরও অনেক শহরে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে সেসব শহরে সরকার ও সরকারবিরোধী পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে দেশজুড়ে এক নৈরাজ্যকর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সরকার ও সরকার-সমর্থক মিডিয়া আন্দোলনকারীদের অছাত্র আখ্যা দিয়ে তাদেরকে দেশবিরোধী চীন-মার্কিন দালাল ও পেশাদার দুষ্কৃতকারী বর্ণনা করে তাদের দমনে সরকারের প্রতি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানায়। আন্দোলনের পেছনে তথাকথিত মার্কিন অদৃশ্য শক্তি তথা ডিপ স্টেটের ইন্ধন রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়, যার আলামত হিসেবে দিল্লি এলাকায় মার্কিন দূতাবাসের ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি ইস্যু ও যন্তরমন্তর এলাকায় কয়েকজন বিদেশির উপস্থিতির বিষয় তুলে ধরা হয়। ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিতে ভারতের স্বাক্ষরদানে কথিত অনীহা এবং ভারত কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ে অনাগ্রহের কারণে মার্কিন ডিপ স্টেট ভারতের প্রতি ক্ষুব্ধ বলে অভিযোগ করা হয়। ডিপ স্টেট বাংলাদেশ ও নেপালের মতো পরিস্থিতি ভারতে Replicate করতে চাইছে বলে ধারণা দেওয়া হয়।
ককরোচ পার্টি ও সরকারবিরোধীদের সহিংস আন্দোলনের ব্যাপকতা দেখে সরকারের মন্ত্রী জেপি নড্ডার নেতৃত্বে কতিপয় বিজেপি নেতা ২৩ জুলাই হাসপাতালে অনশনরত সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করে তার দাবিগুলোর বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দিলে ২৬ দিনের মাথায় তিনি অনশন ভঙ্গ করেন। অনুরূপভাবে বিজেপি নেতৃবৃন্দ একই দিন ককরোচ পার্টির নেতাদের সঙ্গেও একাধিকবার বৈঠক করেন, যদিও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও অন্য দাবিসমূহ পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন প্রত্যাহারে রাজি হননি। বড় ধরনের আন্দোলন দানা বাঁধার পূর্বে তিন দিনের মাথায় ওয়াংচুকের অনশন ভঙ্গের ঘটনা আন্দোলনে momentum সৃষ্টির সম্ভাবনার পথে একটি বড় ধাক্কা হয়ে দেখা দেয়। পরে ২৪ জুলাই ছাত্রদের দাবি মেনে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলে ককরোচ পার্টি তাদের আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়, যদিও বহু মহল ২০ জুলাই পরবর্তী সময়ে আন্দোলন যেভাবে বেগবান হচ্ছিল, তা দেখে আন্দোলন কেবল একটি ট্রেলারে (Traile) সীমিত না থেকে তা একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে রূপলাভের সমূহ সম্ভাবনা লক্ষ করেছিলেন।
কয়েক হাজার কর্মী-সমর্থক নিয়ে সংসদ মার্চ জাতীয় কর্মসূচি পালন করে রাজনীতির মাঠ সাময়িকভাবে উত্তপ্ত করা সম্ভব হলেও সরকার বা রেজিম পরিবর্তনের আন্দোলনে সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ একটি অত্যাবশ্যক উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়; যেমনটি বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল।
স্পষ্টত, বর্তমান আন্দোলনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বস্তরের জনগণের পক্ষ থেকে তেমন স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া না পাওয়ায় আন্দোলনকারীদের জন্য আন্দোলনের মাঝপথে রণে ভঙ্গ দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। এর ফলে যারা ভারতে আন্দোলনে সহসাই হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক, প্রভুত্ববাদী শক্তির পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখেছিলেন, আখেরে সে রকম কিছু না ঘটায় তারা স্বভাবতই বেশ আশাহত হন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বলা বাহুল্য, বিপ্লবের গন্ধ আর বিপ্লব এক কথা নয়।
লেখক : কলামিস্ট