বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

দালাল ছাড়া কেন গতি নেই, প্রশ্ন জাইমা রহমানের

দালাল ছাড়া কেন গতি নেই, প্রশ্ন জাইমা রহমানের

ছবি সংগৃহীত

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ড্রাইভিং টেস্ট দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দেশের সড়কব্যবস্থা, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রক্রিয়া ও সরকারি সেবায় দালালের দৌরাত্ম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।

বুধবার (১২ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব প্রশ্ন তোলেন। পোস্টের সঙ্গে শৈশবে খেলনা গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসা একটি ছবিও যুক্ত করেন তিনি।

জাইমা রহমান জানান, ১০ বছরেরও বেশি আগে লন্ডনে প্রথমবার ড্রাইভিং পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। গত সপ্তাহে বাংলাদেশে গাড়ি চালানোর অনুমতির জন্য জীবনের দ্বিতীয় ড্রাইভিং টেস্ট দেন। দুটি পরীক্ষাতেই তিনি প্রথমবারে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

তবে দুই দেশের ড্রাইভিং পরীক্ষার অভিজ্ঞতা তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, গাড়ি চালানোর বাস্তবতার জন্য একটি পরীক্ষা তাকে যতটা প্রস্তুত করেছে, অন্যটি ততটা করেনি।

জাইমা রহমান বলেন, বিআরটিএর পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে গিয়ে শুধু ড্রাইভিং টেস্ট বা লাইসেন্স নিয়ে ভাবেননি, বরং সড়ক ব্যবহারের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা এবং সড়ক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থার সঙ্গে নাগরিকদের সম্পর্ক নিয়েও ভেবেছেন।

তার ভাষ্য, অনেক তরুণ বাংলাদেশির, বিশেষ করে ঢাকার তরুণদের মধ্যে মৌলিক হতাশা রয়েছে। তাদের কাছ থেকে নিয়ম মেনে চলার প্রত্যাশা করা হলেও সেই ব্যবস্থা সব সময় নিরাপদ বা অনুমানযোগ্য মনে হয় না।

পথচারীদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত ক্রসিং না থাকায় অনেক সময় দ্রুতগতির সড়ক পার হতে হয়। ফুটপাত কোথাও হঠাৎ শেষ হয়ে যায়, কোথাও দখল হয়ে থাকে। এর মধ্যে বাস, মোটরসাইকেল, রিকশা ও প্রাইভেট কারের ভিড়ের মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়, যেগুলো অনেক সময় ভিন্ন ভিন্ন অলিখিত নিয়মে চলে।

যাত্রীদের অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। একটি বাস যাত্রী তুলতে অন্য বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে কি না, হঠাৎ ব্রেক করবে কি না, গাড়িটির যান্ত্রিক ফিটনেস আছে কি না কিংবা চালক যথাযথ প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম পেয়েছেন কি না—এসব বিষয়ে একজন যাত্রীর নিয়ন্ত্রণ থাকে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নতুন চালক হিসেবে নিয়ম মেনে চলতে গেলে নানা প্রশ্ন সামনে আসে উল্লেখ করে জাইমা রহমান বলেন, ‘নিয়মগুলো আসলে কী? কেন সেগুলো একেকজনের জন্য একেক রকম মনে হয়? সঠিক পদ্ধতিটা কী? অনলাইন প্রক্রিয়া কেন সব সময় যথেষ্ট নয়? দালাল ধরলে কেন কাজটা দ্রুত হয়ে যায়?’

তিনি আরও প্রশ্ন করেন, পরীক্ষায় পাস করার পরও কেন মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় সেই কাগজটির জন্য, যা প্রমাণ করে একজন পরীক্ষার্থী পাস করেছেন।

বিআরটিএর অনেক সেবা ডিজিটাল করার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে জাইমা রহমান বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থা তখনই কার্যকর, যখন তা মানুষের জীবন সহজ করে। অনলাইনে শুরু হওয়া কোনো সমস্যার সমাধান যদি শেষ পর্যন্ত ‘অফিসে এসে কথা বলুন’ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে, তাহলে সেটিকে প্রকৃত সমাধান বলা যায় না।

তার মতে, প্রতিটি অপ্রয়োজনীয় সরাসরি যোগাযোগ দেরি, পক্ষপাত কিংবা ‘লেনদেনের নতুন সুযোগ’ তৈরি করে। দালালেরা এই ব্যবস্থার ফাঁকফোকরের সুযোগ নেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাইমা রহমান বলেন, মানুষ আইন ভাঙতে চায় বলেই দালালের কাছে যায়—বিষয়টি এমন নয়। বরং সরকারি প্রক্রিয়া এত কঠিন হয়ে ওঠে যে একজন মধ্যস্থতাকারীই অনেকের কাছে সহজ পথ হয়ে দাঁড়ায়। এতে দুর্নীতি ব্যতিক্রম না থেকে কাজ আদায়ের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, লাইসেন্স, ফিটনেস, প্রশিক্ষণ ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে ভালো নিয়ম করা হলেও সেগুলো যদি বেছে বেছে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে মানুষ দ্রুতই আইনের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে।

দুর্নীতির সমস্যা শুধু অন্যায় সংঘটিত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভিযোগ করার পর প্রতিকার পাওয়া যাবে কি না—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ করলে উল্টো ভোগান্তি বাড়বে এমন ধারণা তৈরি হলে মানুষ চেনাজানা কাউকে দিয়ে কাজ করানোর পথ বেছে নেয়।

সড়ক নিরাপত্তাকে শুধু গাড়ি, লাইসেন্স ও শাস্তির বিষয় হিসেবে না দেখে প্রতিদিনের সড়ক ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানান জাইমা রহমান।

বিশ্ববিদ্যালয়ে হেঁটে যাওয়া শিক্ষার্থী, সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরা নারী, খাবার সরবরাহকারী রাইডার, দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো বাসচালক, ব্যস্ত সড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কিংবা জীবিকার জন্য রিকশা চালানো ব্যক্তি—সবার জন্য সড়কের অভিজ্ঞতা ভিন্ন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ভালো নীতিমালাকে এসব বাস্তবতা বুঝতে হবে। তা না হলে নিয়ম দরিদ্র ও বেশি ঝুঁকিতে থাকা সড়ক ব্যবহারকারীদের আরও গভীরভাবে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা শোষণ ও ঘুষের নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কথাও তুলে ধরেন জাইমা রহমান। তিনি বলেন, ওই সময় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে যানবাহনের লাইসেন্স ও ফিটনেস পরীক্ষা করেছিল এবং লাইসেন্সহীন চালক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। আট বছর পরও সেই উদ্বেগগুলোর অনেকটাই রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জাইমা রহমান বলেন, এখন প্রশ্ন শুধু ‘সড়ক নিরাপদ নয়’—এমন হওয়া উচিত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, সমস্যাগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা সেগুলো সমাধান করতে পারেনি কেন।

তিনি আরও বলেন, নাগরিকদের কীভাবে নিয়ম মানানো যাবে—শুধু সেই প্রশ্ন না তুলে সংযোগ থাকুক বা না থাকুক সবাই কীভাবে একই সেবা পাবে, আইন প্রয়োগ কীভাবে ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায় এবং অভিযোগ ও অন্যায়ের বিষয়ে জানানো কীভাবে নিরাপদ ও কার্যকর করা যায়—এসব বিষয় নিয়েও ভাবতে হবে।

সড়ক এমনভাবে নকশা করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি, যাতে একটি সাধারণ ভুলের কারণে কারও জীবনহানি না ঘটে।

পোস্টের শেষে জাইমা রহমান বলেন, পরিবর্তন যদি সত্যিই চাওয়া হয়, তাহলে চিন্তার কাঠামোও নতুন করে সাজাতে হবে।

ঠিকানা/এনআই

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz