জামায়াত এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ বিতর্কে নতুন প্রশ্ন, কাবিননামা ও নিবন্ধন নিয়ে ধোঁয়াশা
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৮
•
অনলাইন সংস্করণ
সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে কথিত দ্বিতীয় বিয়ের ঘটনা নতুন মোড় নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর পর তিনি সংশ্লিষ্ট তরুণী মরিয়ম খাতুনকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করলেও, কাবিননামা, বিয়ের নিবন্ধন এবং বিভিন্ন নথিতে পাওয়া তথ্য নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে ঢাকার মগবাজার এলাকার একটি কক্ষে গাজী নজরুল ইসলামকে এক তরুণীর সঙ্গে দেখা যায়। ভিডিও প্রকাশের পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। প্রথমদিকে তার সমর্থকদের কেউ কেউ ভিডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করলেও পরে গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী মরিয়ম খাতুন তার দ্বিতীয় স্ত্রী।
তবে বিয়ের এই দাবির পর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কাবিননামা নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এমপির দাবি, গত ১৭ জুন তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কাজী মাওলানা বি.এ.এম. বাকী বিল্লাহের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র।
কাজী দাবি করেন, বিয়ে কোথায় বা কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার গভীর রাতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানানো হয় যে ঢাকায় বিয়ে হয়েছে এবং নিবন্ধনের দায়িত্ব তাকে নিতে হবে। পরে ফোনে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি কাবিননামা প্রস্তুত করেন।
তিনি আরও জানান, কনের বাবা ফোনে বিয়ের বিষয়ে সম্মতি জানান। পরদিন সকালে কনে ও তার অভিভাবক এসে কাবিননামায় স্বাক্ষর করেন। একই সঙ্গে ১৭ জুনকে বিয়ের তারিখ হিসেবে উল্লেখ করার নির্দেশনাও তাকে ফোনে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
তবে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে কাজীর বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি দেখা যায়। একদিকে তিনি বলেন, বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করে দিতে তাকে বলা হয়েছিল, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকেই পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। পরে তিনি বলেন, “আমি যেন বিপদে না পড়ি, আমাদের কেন বিপদে ফেলছেন”—এ কথা বলে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অন্যদিকে ভিডিও ভাইরালের পর পৃথক ভিডিও বার্তায় গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম, মরিয়ম খাতুন এবং মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ দাবি করেন, পারিবারিকভাবে তিন লাখ টাকা দেনমোহরে তাদের বিয়ে হয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, ঘটনাটি নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
এদিকে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষে কয়েকজন ব্যক্তি গাজী নজরুল ইসলামকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন। সেখানে তাকে উদ্দেশ করে ‘জামায়াতের নেতা হয়ে এমন কাজ কেন করলেন’ এবং ‘আপনি কি অন্যায় করেছেন’—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি মাথা নেড়ে বলেন, “বিশ্বাস করেন, আজই প্রথম।” পরে তরুণীর পরিচয় জানতে চাইলে দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি ‘মাহি’ নাম উল্লেখ করেন। একই ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, “আপনারা ভিডিও ডিলিট করে দেন, সবকিছু বলছি।”
এদিকে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত কাবিননামায় মরিয়ম খাতুনের জন্মতারিখ ২২ মে ২০০৮ উল্লেখ রয়েছে। একই ঘটনায় নতুন প্রশ্ন তুলেছে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্ট। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মরিয়মের একটি বায়োডাটায় ২২ জুন গাজী নজরুল ইসলামের স্বাক্ষর ও সুপারিশ রয়েছে এবং সেখানে তার বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ লেখা আছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রশ্ন, যদি ১৭ জুন বিয়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে পাঁচ দিন পরের একটি বায়োডাটায় মরিয়মকে অবিবাহিত হিসেবে উল্লেখ করা হলো কেন? এ বিষয়ে গাজী নজরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ জানিয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ভিডিও, কাবিননামা, নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন নথিতে পাওয়া তথ্য নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন সামনে এলেও, পুরো ঘটনার বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে জনমনে কৌতূহল ও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।