১০.১ মিলিয়ন ডলারের নতুন চুক্তি; জেনেটিক তথ্যের গোপনীয়তা ও ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগে দাবি করা পারিবারিক সম্পর্ক যাচাই করতে দ্রুতগতির ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবহার আরও বাড়াতে যাচ্ছে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট—আইস।
এ লক্ষ্যে ভার্জিনিয়াভিত্তিক এসএনএ ইন্টারন্যাশনাল এলএলসিকে ১০.১ মিলিয়ন ডলারের একটি নতুন টাস্ক অর্ডার দিয়েছে সংস্থাটি। এক বছরের এই চুক্তি ২০২৬ সালের ১০ আগস্ট কার্যকর হয়েছে এবং চলবে ৯ আগস্ট ২০২৭ পর্যন্ত। আইসের এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড রিমুভাল অপারেশনস বা ইআরওর বিভিন্ন ফিল্ড অফিসে ‘জৈবিক আত্মীয়তার সম্পর্ক’ যাচাইয়ে র্যাপিড ডিএনএ পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট সেবা দেওয়াই এর উদ্দেশ্য।
নিউজউইকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসের এই উদ্যোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালেও একই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৬.২৪ মিলিয়ন ডলারের একটি টাস্ক অর্ডার করা হয়েছিল। দুটি টাস্ক অর্ডার মিলিয়ে র্যাপিড ডিএনএ কর্মসূচিতে ফেডারেল সরকারের আর্থিক অঙ্গীকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬.৩৪ মিলিয়ন ডলারে। বৃহত্তর চুক্তিটির আওতায় ভবিষ্যতে আরও টাস্ক অর্ডার দেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
র্যাপিড ডিএনএ পরীক্ষায় সাধারণত মুখের ভেতরের গাল থেকে সোয়াবের মাধ্যমে কোষের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। প্রচলিত পরীক্ষায় নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে ফল পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হলেও র্যাপিড ডিএনএ প্রযুক্তি অনেক কম সময়ে দুই ব্যক্তির মধ্যে জৈবিক সম্পর্ক যাচাই করতে পারে।
ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির অফিস অব ইন্সপেক্টর জেনারেলের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আ আগের র্যাপিড ডিএনএ পাইলট কর্মসূচিতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও একটি শিশুর ডিএনএ প্রোফাইল তুলনা করে প্রায় ৯০ মিনিটে ফল দেওয়া হতো।
অভিবাসন ব্যবস্থায় এ ধরনের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল কয়েক বছর আগেই। ২০১৯ সালের মে মাসে আইস ‘অপারেশন ডাবল হেলিক্স’ নামে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের ১১টি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে র্যাপিড ডিএনএ প্রযুক্তি চালু করে। উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের মা-বাবা ও সন্তান হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রকৃত জৈবিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা দ্রুত যাচাই করা।
ইন্সপেক্টর জেনারেলের হিসাবে, ২০১৯ সালের জুন থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইস ৩ হাজার ৫১৬টি র্যাপিড ডিএনএ পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ৩০০টি—অর্থাৎ ৮.৫ শতাংশ পরীক্ষায়—দাবি করা মা-বাবা ও সন্তানের জৈবিক সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে আইসের পাইলট শেষ হওয়ার পর পারিবারিক সম্পর্ক যাচাইয়ের পরীক্ষার দায়িত্ব মূলত কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশন—সিবিপির হাতে যায়।
তবে ২০২৫ সালের ডিএইচএস ইন্সপেক্টর জেনারেলের নিরীক্ষায় দেখা যায়, পরবর্তী তিন বছরে সিবিপি এই প্রযুক্তি খুব সীমিত পরিসরে ব্যবহার করেছে।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২৭ লাখ মানুষ দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে নিজেদের কোনো ‘ফ্যামিলি ইউনিটের’ সদস্য হিসেবে পরিচয় দিলেও সিবিপি মাত্র ৩১৪টি পারিবারিক ডিএনএ পরীক্ষা চালায়—যা মোট সংখ্যার প্রায় ০.০১ শতাংশ। ওই সীমিত পরীক্ষার মধ্যেও ১৪ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে দাবি করা জৈবিক সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
ইন্সপেক্টর জেনারেল আরও জানিয়েছে, সিবিপির ক্ষেত্রে এ ধরনের পরীক্ষা সম্মতিনির্ভর ছিল এবং নিরীক্ষার সময় দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের ৯৫টি স্থাপনার মধ্যে মাত্র নয়টিতে পারিবারিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের মে মাসে পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণের জন্য ব্যবহৃত একটি বেসরকারি ঠিকাদারি ব্যবস্থাও শেষ হয়ে যায় এবং তখন তার বিকল্প ব্যবস্থা ছিল না।
নতুন চুক্তির মাধ্যমে এবার আইসের ইআরও ফিল্ড অফিসগুলোতে আবার সরাসরি এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
ফেডারেল সরকারের যুক্তি হচ্ছে, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কোনো শিশুকে নিজের সন্তান বা আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিলে দ্রুত জৈবিক সম্পর্ক যাচাইয়ের মাধ্যমে ভুয়া ‘ফ্যামিলি ইউনিট’ শনাক্ত করা সম্ভব। সীমান্তে শিশুদের ব্যবহার করে মানব চোরাচালান বা অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতেও এটি সহায়ক হতে পারে।
২০২৫ সালের একটি সিদ্ধান্তে গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস—জিএও জানিয়েছে, আইসের কর্মসূচিটির উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী বা প্রবেশের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের মধ্যে ভুয়া পারিবারিক সম্পর্কের দাবি শনাক্ত করা। প্রয়োজনীয় সেবার মধ্যে রয়েছে ডিএনএ পরীক্ষার যন্ত্র, টেস্ট কিট, সোয়াব, সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তা।
আইসের ইআরও নিউইয়র্কের সাবেক ডেপুটি ফিল্ড অফিস ডিরেক্টর স্কট মেচকোভস্কি বলেন, অভিবাসন ব্যবস্থায় র্যাপিড ডিএনএ পরীক্ষা নতুন কোনো বিষয় নয়; বহু বছর ধরেই পারিবারিক সম্পর্ক যাচাইয়ে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। তার বক্তব্য, এর উদ্দেশ্য হলো কোনো শিশুর অভিভাবক বা আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তির দাবি যাচাই করা।
তবে ডিএনএ পরীক্ষায় জৈবিক সম্পর্ক পাওয়া না গেলেই যে কোনো পারিবারিক বা অভিভাবকত্বের সম্পর্ক মিথ্যা—তা নয়। দত্তক সন্তান, সৎ মা-বাবা কিংবা বৈধ অভিভাবকের মতো সম্পর্ক জৈবিক নাও হতে পারে। এ কারণেও অভিবাসী অধিকারকর্মীরা পরীক্ষার ফল কীভাবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালার দাবি তুলেছেন।
কর্মসূচিটির পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে সংগৃহীত জেনেটিক তথ্যের গোপনীয়তা, সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে।
জর্জটাউন ল স্কুলের সেন্টার অন প্রাইভেসি অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি পরিচালক স্টিভি গ্ল্যাবারসন বলেন, অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সময় অনেক মানুষই পুরোপুরি বুঝতে পারেন না কেন তাদের ডিএনএ নেওয়া হচ্ছে এবং সেটি কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে।
তার মতে, ডিএনএ আঙুলের ছাপের মতো সাধারণ বায়োমেট্রিক তথ্যের চেয়ে ভিন্ন; একজন ব্যক্তির জেনেটিক তথ্য তার পরিবারের অন্য সদস্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পর্কেও তথ্য প্রকাশ করতে পারে।
এই বিতর্কের মধ্যেই আগস্টে ওয়্যার্ডের একটি অনুসন্ধান আরও বড় আকারে ডিএনএ সংগ্রহের বিষয়টি সামনে আনে। জর্জটাউন ল-এর গবেষকেরা এফবিআই-এর তথ্য এবং সিবিপির-এর রেকর্ড বিশ্লেষণ করে ধারণা করেছেন, ২০২৫ সালে আইস সর্বোচ্চ প্রায় ৯১৯,৯০৮টি নতুন ডিএনএ প্রোফাইল এফবিআই-এর কম্বাইন্ড ডিএনএ ইনডেক্স সিস্টেম-এ যুক্ত হওয়ার জন্য দায়ী হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি আইস-এর প্রকাশিত সরকারি সংখ্যা নয়; এফবিআই-ও কোন সংস্থা ঠিক কতটি প্রোফাইল জমা দিয়েছে, সেই বিভাজন প্রকাশ করে না।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কম্বাইন্ড ডিএনএ ইনডেক্স সিস্টেম-এর জন্য আটক ব্যক্তিদের ডিএনএ সংগ্রহ এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যাচাইয়ের র্যাপিড ডিএনএ কর্মসূচি এক ব্যবস্থা নয়। ওয়্যার্ডকে দেওয়া বক্তব্যেও ডিএইচএস দুটি কর্মসূচিকে পৃথক বলে উল্লেখ করেছে। ফলে কম্বাইন্ড ডিএনএ ইনডেক্স সিস্টেম-সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে নতুন র্যাপিড ডিএনএ চুক্তির নমুনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এফবিআই-এর অপরাধভিত্তিক ডেটাবেজে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি এখনো নেই।
নিউজউইকের পর্যালোচনা করা চুক্তির নথি এবং জিএওর সিদ্ধান্তে নতুন ইআরও কর্মসূচির ক্ষেত্রে কার কাছ থেকে, কোন পরিস্থিতিতে এবং কী ধরনের সম্মতিতে নমুনা নেওয়া হবে; নমুনা বা ফল কতদিন রাখা হবে; কখন ধ্বংস করা হবে; কিংবা তা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত নীতিমালা পাওয়া যায়নি।
আরও একটি প্রশ্ন হলো, পরীক্ষায় দাবি করা জৈবিক সম্পর্ক প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কী ধরনের প্রশাসনিক বা আইনি সুযোগ পাবেন। প্রকাশ্য চুক্তির নথিতেও সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়ায় নিয়ম ভিন্ন। সেখানে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য নথিপত্র না থাকলে কনস্যুলার কর্মকর্তা জৈবিক সম্পর্ক প্রমাণে ডিএনএ পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন, কিন্তু পররাষ্ট্র দপ্তর স্পষ্টভাবে বলেছে—এ ধরনের পরীক্ষা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক। আইসের আইন প্রয়োগমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে সেই কনস্যুলার প্রক্রিয়াকে এক করে দেখা যাবে না।
ফলে আইসের নতুন ১০.১ মিলিয়ন ডলারের চুক্তিটি শুধু নতুন প্রযুক্তি কেনার ঘটনা নয়। অভিবাসন আইন প্রয়োগে কার জেনেটিক তথ্য সংগ্রহ করা যাবে, কীভাবে সেই তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হবে এবং জৈবিক সম্পর্কের পরীক্ষার ফল কোনো ব্যক্তির অভিবাসন মামলায় কতটা প্রভাব ফেলবে—নতুন করে সেই প্রশ্নগুলোও সামনে এনেছে।
-নিউজউইক অবলম্বনে।