উত্তর আমেরিকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের একত্রিত করার প্রত্যয় নিয়ে চার দশক আগে যাত্রা শুরু করেছিল ফোবানা। নামের মধ্যেই রয়েছে সেই ঐক্যের দর্শন- ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশর ইন নর্থ আমেরিকা, যা সংক্ষেপে ফোবানা নামে অধিক পরিচিত। অথচ ৪০ বছর পূর্তির বছরে এসে সেই ফোবানাই যেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাংগঠনিক বিভক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি।
আগামী ৪, ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের লেবার ডে উইকেন্ডকে ঘিরে একই সময়ে নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, অরল্যান্ডো, এবং কানাডার টরন্টোতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চারটি পৃথক আয়োজন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়- প্রায় প্রত্যেক পক্ষই নিজেদের সম্মেলনকে বলছে ‘৪০তম ফোবানা সম্মেলন’।
ফলে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহান্তে প্রবাসীদের সামনে শুধু বিনোদনের পছন্দ নয়, তৈরি হয়েছে পরিচয়ের এক অস্বস্তিকর প্রশ্নও- চারটির মধ্যে আসল ফোবানা কোনটি?
একদিকে তারকাবহুল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট, ব্যবসায়ী সম্মেলন, তরুণদের অনুষ্ঠান, সেমিনার ও পুনর্মিলনী; অন্যদিকে একই সংগঠনের নাম ও ঐতিহ্যের দাবিদার একাধিক পক্ষ। ফলে এবারের ফোবানা যতটা উৎসবের, ততটাই বিভক্তির গল্প।
নিউইয়র্কে ৪০তম ফোবানা সম্মেলন : নিউইয়র্কের ৪০তম ফোবানা অনুষ্ঠিত হবে ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর কুইন্সের অ্যাস্টোরিয়ায় ইভানজেল ক্রিশ্চিয়ান সেন্টারে। আয়োজনের সঙ্গে রয়েছে এনআরবি অ্যাসোসিয়েশন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন জাকারিয়া চৌধুরী, এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি দেওয়ান মনিরুজ্জামান এবং হোস্ট কমিটির আহ্বায়ক নুরুল আমিন বাবু ও সদস্যসচিব মনজুর কাদের।
নিউইয়র্কের আয়োজনের মূল স্লোগানে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ইতিহাসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, তিন দিনের সম্মেলনে থাকবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আলোচনা, বিশেষ সেমিনার, সাহিত্য ও কবিতা অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ব্যবসা ও নেটওয়ার্কিং, নারীর ক্ষমতায়ন, অভিবাসনবিষয়ক সেমিনার এবং নতুন প্রজন্মের জন্য বিভিন্ন ইন্টারঅ্যাকটিভ আয়োজন। উত্তর আমেরিকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা প্রবাসীদের সম্মাননাও দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নিউইয়র্কের আয়োজকেরা বিশেষভাবে বলছেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশিদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
এই বক্তব্যের তাৎপর্যও কম নয়। কারণ নিউইয়র্কেই উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীগুলোর একটি বসবাস করে। ফলে লেবার ডে উইকেন্ডে কুইন্সে ফোবানা মানে শুধু একটি কনভেনশন নয়, নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, কানেকটিকাট, পেনসিলভানিয়াসহ আশপাশের রাজ্য থেকে পরিবার ও পরিচিতজনদের মিলনমেলারও সুযোগ।
তবে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত নিউইয়র্ক আয়োজনে অংশ নেওয়া সব তারকা শিল্পী ও প্রতিটি সাংস্কৃতিক পর্বের পূর্ণাঙ্গ ঘণ্টাভিত্তিক তালিকা অন্য কয়েকটি ফোবানার মতো প্রকাশ্য প্ল্যাটফর্মে বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায়নি।
লস অ্যাঞ্জেলেসে ৪০তম ফোবানা সম্মেলন : উত্তর আমেরিকায় প্রবাসী বাঙালিদের অন্যতম বৃহৎ মিলনমেলা ৪০তম ফোবানা সম্মেলন আগামী ৪, ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, লেবার ডে উইকেন্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে। হলিউডের অন্যতম আকর্ষণ ইউনিভার্সাল স্টুডিওসের একেবারে কাছেই হিলটন লস অ্যাঞ্জেলেস/ইউনিভার্সাল সিটিতে বসবে এবারের তিন দিনের এই বর্ণাঢ্য আয়োজন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়ার আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন শহর থেকে প্রবাসী বাংলাদেশি সংগঠন, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি-আমেরিকান ও বাংলাদেশি-কানাডিয়ান অংশ নেবেন।
দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালির বসতি গড়ে উঠলেও তাঁদের হৃদয়ে আজও গভীরভাবে ধারণ করা আছে বাংলাদেশের ভাষা, ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। প্রবাসে সেই পরিচয়কে ধরে রাখা এবং বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শিকড় ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখার লক্ষ্যে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় গত চার দশক ধরে ফোবানা হয়ে উঠেছে উত্তর আমেরিকায় বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
৪০তম সম্মেলনকে স্মরণীয় করে রাখতে এবার নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। তিন দিনের আয়োজনে থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সমসাময়িক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ভিত্তিক সেমিনার, ইয়ুথ প্রোগ্রাম, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নবিষয়ক অনুষ্ঠান, কাব্যজলসা, স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনা, আমেরিকার মূলধারায় প্রবাসীদের অংশগ্রহণ নিয়ে সেমিনার এবং ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ নেটওয়ার্কিং ইভেন্ট।
সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার পরিচালনা ও সঞ্চালনা করবেন ঠিকানা টিভির প্রধান সম্পাদক ও জনপ্রিয় টেলিভিশন টক শো উপস্থাপক খালেদ মুহিউদ্দীন। সমসাময়িক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তাঁর সঞ্চালনায় এই আলোচনা সম্মেলনের সেমিনার পর্বে বিশেষ মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা।
এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে দ্বিতীয় প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ। উত্তর আমেরিকায় জন্ম নেওয়া কিংবা বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিদের ফোবানার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত করতে তাদের জন্য থাকছে বিভিন্ন বিশেষ আয়োজন।
নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণে আলাদা মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনা ও সেমিনার। সেখানে তাদের অভিজ্ঞতা, পরিচয়, শিক্ষা, ক্যারিয়ার, নেতৃত্ব এবং আমেরিকার মূলধারায় এগিয়ে যাওয়ার নানা বিষয় উঠে আসবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও এসব আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
প্রবাসে জন্ম নেওয়া একটি প্রজন্ম কীভাবে একই সঙ্গে নিজেদের বাংলাদেশি শিকড়কে ধারণ করে এবং আমেরিকার মূলধারায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে, এবারের ফোবানায় তারও একটি প্রাণবন্ত প্রতিফলন দেখা যাবে। ফলে সম্মেলনটি শুধু প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীদের মিলনমেলা নয়, বরং প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবেও উঠে আসবে।
এবারের সম্মেলনের সাংস্কৃতিক আয়োজনও হবে ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহর থেকে অংশ নেওয়া ৩০টির বেশি সংগঠন তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করবে। হোস্ট কমিটির স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনার পাশাপাশি বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে থাকবে বিশেষ সংগীতানুষ্ঠান।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের তালিকায় রয়েছেন কণা, ইমরান, মুজা, লুইপা, ঝিলিক এবং বিশ্বকাপখ্যাত জনপ্রিয় শিল্পী সঞ্জয়। সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা পরিবেশনায় তিন দিন ধরে সম্মেলন প্রাঙ্গণ পরিণত হবে প্রবাসী বাঙালিদের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।
সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি এবারের সম্মেলনে গুরুত্ব পাচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যবসা ও পেশাগত যোগাযোগ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে বিজনেস নেটওয়ার্কিং ইভেন্ট।
এই আয়োজনের মাধ্যমে বিভিন্ন শহর ও দেশের ব্যবসায়ী এবং পেশাজীবীদের মধ্যে নতুন যোগাযোগ তৈরি, অভিজ্ঞতা বিনিময়, সম্ভাব্য ব্যবসায়িক সহযোগিতা এবং নতুন সুযোগ তৈরির একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে।
এবারের সম্মেলনের ভেন্যুটিও অংশগ্রহণকারীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে হিলটন লস অ্যাঞ্জেলেস/ইউনিভার্সাল সিটিতে, যা বিশ্বখ্যাত ইউনিভার্সাল স্টুডিওস হলিউডের একেবারে কাছাকাছি।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন শহর থেকে পরিবার নিয়ে যারা তিন দিনের সম্মেলনে যোগ দিতে লস অ্যাঞ্জেলেসে আসবেন, তাঁরা চাইলে সফরের সঙ্গে হলিউড ভ্রমণের আনন্দও যোগ করতে পারবেন। সম্মেলনের কর্মসূচির ফাঁকে কিংবা সফরের সময় বাড়িয়ে ইউনিভার্সাল স্টুডিওস হলিউডসহ আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সুযোগ নিতে পারবেন অতিথিরা।
বিশেষ করে লেবার ডে উইকেন্ড হওয়ায় অনেকের জন্য ফোবানা সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি পরিবার নিয়ে কয়েকটি দিন লস অ্যাঞ্জেলেস ও হলিউডে কাটানোরও একটি সুন্দর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে এবারের ফোবানা অনেক পরিবারের জন্য একই সঙ্গে সম্মেলন, পুনর্মিলন এবং হলিউড ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে।
আয়োজকদের মতে, ফোবানা সম্মেলন কেবল তিন দিনের একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়। এটি উত্তর আমেরিকায় ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে যোগাযোগ, সহযোগিতা, বন্ধুত্ব ও ঐক্যের সেতুবন্ধন তৈরির একটি বৃহৎ উদ্যোগ। একই সঙ্গে প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত এবং সম্পৃক্ত রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
চার দশকের পথচলায় ফোবানা তাই শুধু একটি বার্ষিক সম্মেলনের নাম নয়। এটি উত্তর আমেরিকায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘ পথচলা, অর্জন, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।
ফোবানা সেন্ট্রাল কমিটি এবং আয়োজক সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়ার পক্ষ থেকে উত্তর আমেরিকার সর্বস্তরের প্রবাসী বাংলাদেশিদের ৪, ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বরের এই তিন দিনব্যাপী সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য সাদর আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সংস্কৃতি ও বিনোদন, নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ, গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিং এবং দেশ-বিদেশের প্রবাসী বাংলাদেশিদের মিলন—সব মিলিয়ে হলিউডের প্রাণকেন্দ্রে এবারের ৪০তম ফোবানা সম্মেলন হয়ে উঠবে একটি বর্ণাঢ্য, আনন্দময় ও স্মরণীয় আয়োজন, এমনটাই প্রত্যাশা আয়োজকদের।
টরন্টো ফোবানা : সীমান্তের ওপারে কানাডাতেও একই দিন শুরু হচ্ছে আরেক ‘৪০তম ফোবানা’। টরন্টোর ডন অ্যালি হোটেল আন্ড সুইটস-এ ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর তিন দিনের সম্মেলন আয়োজন করেছে আরেক ফোবানা পক্ষ। এর স্টিয়ারিং কমিটি-এর চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন গিয়াস আহমেদ। আয়োজকদের দাবি, তিন দিনে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের উপস্থিতি হতে পারে।
৪ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মূল আয়োজন শুরু হওয়ার কথা। বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ভারত থেকে শিল্পী ও অতিথিরা অংশ নেবেন বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন।
টরন্টোর তারকাদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য নাম জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, প্রতীক হাসান ও ডলি সায়ন্তনী। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও উত্তর আমেরিকার আরও শিল্পীদের অংশগ্রহণের ঘোষণা রয়েছে।
টরন্টো আয়োজনেও তরুণ প্রজন্মকে বাংলাদেশি পরিচয় ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করা, ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হবে।
অরল্যান্ডো ফোবানা : ফ্লোরিডার হলিডে ইন রিসোর্ট কিসিমি বাই দ্য পার্কস-এ ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে তাদের তিন দিনের সম্মেলন। আয়োজকদের ভাষায় এটি হবে সংস্কৃতি, ব্যবসা, বিনোদন এবং প্রবাসীদের পুনর্মিলনের আয়োজন। ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিকেল ৪টায় রেজিস্ট্রেশন ও এক্সপো উদ্বোধনের মাধ্যমে শুরু হবে কার্যক্রম। সন্ধ্যা ৬টায় কালচারাল প্যারেড ও ফ্ল্যাগ সিরিমনি এবং রাত ৮টায় থাকবে বিজনেস লিডারশিপ প্যানেল।
৫ সেপ্টেম্বর শনিবার সকাল ১০টায় ইয়ুথ ইনোভেশন সামিট দুপুর ১টায় উইমেন ইন লিডারশিপ এবং রাত ৮টায় বিশাল কনসার্ট নাইট।
শেষ দিন ৬ সেপ্টেম্বর রবিবার সকাল ১১টায় কমিউনিটি অ্যাওয়ার্ড, দুপুর ২টায় ভেন্ডর স্পটলাইট এবং বিকেল ৪টায় ফেয়ারওয়েল মধ্যাহ্নভোজ নির্ধারিত রয়েছে।
অরল্যান্ডোর মূল আকর্ষণ অবশ্য এর শিল্পী তালিকা। ঘোষিত তারকাদের মধ্যে রয়েছেন- সানিয়া সুলতানা লিজা, পরীমনি, ইমরান মাহমুদুল, দিনাত জাহান মুন্নি, প্রতীক হাসান, শ্রাবস্তী তিন্নি, দিলশাদ নাহার কনা, আরজিন কামাল, তমা মির্জা, অনন্যা ইয়াসমিন অংকন, সাজু খাদেম এবং রফিক আহমেদ মিল্টন। অর্থাৎ এক মঞ্চে চলচ্চিত্র, সংগীত ও টেলিভিশনের একাধিক পরিচিত মুখকে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শকেরা।
তবে নির্ভরযোগ্য এটি সূত্র জানিয়েছে, শেষদিকে এসে অগোছালো ও এলোমেলো অবস্থায় পড়েছে অরল্যান্ডো ফোবানা। আগাম পেমেন্ট না দিলে জনপ্রিয় বেশকয়েকজন শিল্পী অনুষ্ঠানে নাও যেতে পারেন। দর্শক ধরে রাখতে আয়োজকরা এক ডজনের বেশী শিল্পীর নাম প্রচার করছেন বলে জানা গেছে।
বিস্ময়করভাবে চারটি সম্মেলনের প্রচারণাতেই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি হলো-ঐক্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো-ঐক্যের কথা বলতে গিয়ে একই সপ্তাহান্তে চারটি আলাদা মঞ্চে দাঁড়াতে হচ্ছে চার পক্ষকে। এখানেই এবারের ফোবানার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
সাংগঠনিক বিভক্তির প্রভাব শুধু নেতৃত্বের কক্ষে সীমাবদ্ধ থাকছে না। একই তিন দিনে চারটি অনুষ্ঠান হওয়ায় প্রথমেই ভাগ হয়ে যাচ্ছে দর্শক। নিউইয়র্কে বসবাসকারী কেউ হয়তো কুইন্সের ফোবানায় যাবেন; আবার তার পরিচিতজন অরল্যান্ডোর তারকাবহর দেখে ফ্লোরিডার টিকিট কিনছেন। পশ্চিম উপকূলের প্রবাসীরা লস অ্যাঞ্জেলেসে, কানাডার বাংলাদেশিরা টরন্টোয়।
শিল্পীদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বাংলাদেশের শিল্পীদের আলাদা আলাদা আয়োজক নিজেদের অনুষ্ঠানে নিচ্ছেন। এমনকি প্রতীক হাসানের নাম অরল্যান্ডো ও টরন্টো - দুই আয়োজনের প্রচারণাতেই দেখা যাচ্ছে, যা শিল্পীদের সময়সূচি ও উপস্থিতি নিয়েও সাধারণ দর্শকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তারপর রয়েছে স্পন্সর। উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি বাজারে কাজ করা ব্যাংক, রেমিট্যান্স প্রতিষ্ঠান, রিয়েল এস্টেট কোম্পানি, টেলিকম, এয়ারলাইনস, ট্রাভেল এজেন্সি এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছেও এখন একটির বদলে একাধিক ‘ফোবানা’র প্রস্তাব যাচ্ছে। অর্থাৎ যে সম্মিলিত শক্তি একটি বিশাল উত্তর আমেরিকান বাংলাদেশি সম্মেলনকে অনেক বেশি শক্তিশালী করতে পারত, সেটিই চার দিকে ভাগ হয়ে যাচ্ছে।
তাহলে ‘আসল’ ফোবানা কোনটি? এ প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। প্রত্যেক পক্ষেরই নিজস্ব নেতৃত্ব আছে। প্রত্যেকেরই নিজস্ব সাংগঠনিক ইতিহাস ও বৈধতার দাবি আছে। প্রত্যেক পক্ষই তাদের আয়োজনকে ধারাবাহিক ফোবানা হিসেবেই প্রচার করছে। কিন্তু সাধারণ প্রবাসীর কাছে সাংগঠনিক কাগজপত্র, বোর্ডের ইতিহাস কিংবা কোন সময় কোন কমিটি ভেঙেছে, এসবের চেয়ে অনেক সহজ একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: একই বছরে একই সপ্তাহান্তে চারটি ‘৪০তম ফোবানা’ কীভাবে হয়? একটি সংগঠনের ৪০তম বার্ষিকী তো একবারই হওয়ার কথা। আর যদি চার পক্ষই নিজেদের ৪০তম সম্মেলন বলে দাবি করে, তাহলে বিভক্তির মাত্রা কোথায় পৌঁছেছে সেটি বোঝার জন্য আর আলাদা ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।
ফোবানা শুধু একটি তিন দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়। চার দশকে এটি উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের একটি পরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।নেতৃত্বের লড়াইয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে একটি ব্র্যান্ড
একসময় একটি শহরে ফোবানা হওয়া মানে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও প্রদেশ থেকে প্রবাসীদের সেখানে যাওয়া, কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি, সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ, শিল্পীদের আগমন এবং বছরের একটি বড় মিলনমেলা। আজ একই নামের চারটি বড় সম্মেলন একই সময়ে হওয়ার অর্থ—ফোবানা নামটির নিজস্ব পরিচয়ই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
এ অবস্থা চলতে থাকলে নতুন প্রজন্মের একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান বা বাংলাদেশি-কানাডিয়ান হয়তো আগামী দিনে জিজ্ঞেস করবে, ফোবানা কোন সংগঠন? তার বাবা-মাকে হয়তো পাল্টা প্রশ্ন করতে হবে- “কোন ফোবানা?”
চার দশকের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এর চেয়ে বড় সংকেত আর কী হতে পারে? তবু বিতর্কের বাইরে লেবার ডে উইকেন্ডে হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির কাছে এই চার আয়োজনই আনন্দের উপলক্ষ। কোথাও ইমরান-কনা-লিজার গান, কোথাও জুয়েল আইচের জাদু, কোথাও হলিউডের পাশেই বাংলা সংস্কৃতির উৎসব, আবার নিউইয়র্কে নিজের শহরেই পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে তিন দিনের মিলনমেলা।
শাড়ি-পাঞ্জাবি, দেশি খাবার, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, বাংলাদেশের গান, সন্তানদের বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়, এসব আবেগ কোনো সাংগঠনিক বিরোধে শেষ হয়ে যায় না। বরং হয়তো এ কারণেই ফোবানা নামটি এখনো এত মূল্যবান এবং সেই কারণেই এর বিভক্তিও এত হতাশাজনক।
৪০তম বছরে ফোবানার সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কোন শহরের হলে বেশি দর্শক হলো, কোন পক্ষ বেশি স্পন্সর পেল বা কোন মঞ্চে সবচেয়ে বড় তারকা উঠলেন, সেটি নয়।প্রশ্ন আরও মৌলিক। যে ফোবানার জন্ম হয়েছিল উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের এক ছাতার নিচে আনতে, নেতৃত্বের বিভক্তি পেরিয়ে সেই ফোবানা কি কখনো আবার সত্যিই এক হতে পারবে?
লেবার ডে উইকেন্ডের চার শহরের চার মঞ্চ হয়তো এবার তার উত্তর দেবে না। কিন্তু ৪০ বছরের ফোবানাকে যদি আরও ৪০ বছর টিকিয়ে রাখতে হয়, উত্তরটি একদিন দিতেই হবে।