বাংলাদেশ সোসাইটির আসন্ন নির্বাচন
নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ ও আমব্রেলা সংগঠন হিসাবে পরিচিত বাংলাদেশ সোসাইটির আসন্ন ত্রি-বার্ষিক নির্বাচনকে সামনে রেখে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। গত নির্বাচনে ২১টি পদের সবকটিতে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশভাবে সোসাইটির নেতৃত্বে আসা সেলিম-আলী প্যানেলের ছয় কর্মকর্তা এবার তাদের সঙ্গে থাকছেন না। এর মধ্যে সহ-সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম ভূঁইয়া ও কোষাধ্যক্ষ মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া রুমীসহ পাঁচজন ইতোমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলে যোগ দিয়েছেন। ক্রীড়া সম্পাদক আশরাফ আলী খান লিটন নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অন্যরা হলেন- সমাজকল্যাণ সম্পাদক জামিল আনসারী, সাহিত্য সম্পাদক মো. এ আখতার বাবুল এবং কার্যকরী সদস্য মো. এ সিদ্দিক। গত নির্বাচনে ২১-০ ব্যবধানে জয়ী একটি প্যানেল থেকে একসঙ্গে এতজন কর্মকর্তার সরে দাঁড়ানোকে ঘিরে এখন বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তোলপাড় চলছে।
প্রশ্ন উঠেছে- মাত্র একটি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কেন বর্তমান নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কর্মকর্তা নিজেদের পুরোনো প্যানেলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন? এটি কি কেবল নির্বাচনী কৌশল, নাকি গত দুই বছরের কর্মকাণ্ড নিয়ে ভেতরে জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ?
আগামী ২৫ অক্টোবর রোববার অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ সোসাইটির ত্রি-বার্ষিক নির্বাচন। কার্যত দুটি প্যানেল ইতোমধ্যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়ে সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ ও মতবিনিময় শুরু করেছে। তবে নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সেলিম-আলী প্যানেলের এই ভাঙন।

নিউইয়র্ক : আমরা ভবিষ্যতে কেমন বাংলাদেশ সোসাইটি চাই-শীর্ষক আলোচনা সভায় নেতৃবৃন্দ।
বর্তমান কমিটির সাহিত্য সম্পাদক মো. এ আখতার বাবুল ঠিকানাকে জানিয়েছেন, গত নির্বাচনের আগে সেলিম-আলী প্যানেল যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় চেষ্টা করা হয়নি। তার মতে, এটিই প্যানেল থেকে সরে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
ক্রীড়া সম্পাদক আশরাফ আলী খান লিটন ঠিকানাকে জানান, আমি চট্টগ্রামের মানুষ। চট্টগ্রামের একটি অংশ কুনু-ফিরোজ প্যানেলকে সমর্থন দিয়েছে। বিবদমান আরেকটি অংশ সমর্থন দিয়েছে সেলিম-আলী প্যানেলকে। তার মতে, এ বিষয়টি কিছুটা সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, আমি সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে চাই। এ কারণে এবার নির্বাচন করবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এদিকে, কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো কয়েকজন বিভিন্নভাবে বর্তমান কমিটির বিরুদ্ধে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির অভিযোগ তুলেছেন। বিশেষ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, সংগঠনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সদস্যদের কাছে নিয়মিত ও পূর্ণাঙ্গ হিসাব তুলে ধরা হয়েছে কি না, এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশ সোসাইটির গত নির্বাচনে সেলিম-আলী প্যানেলের নিরঙ্কুশ বিজয়ের কারণে সংগঠন পরিচালনায় তাদের সামনে কার্যত কোনো বিরোধী বাধা ছিল না। ফলে গত দুই বছরের সাফল্য ও ব্যর্থতার দায়ও সরাসরি বর্তমান নেতৃত্বের ওপরই পড়ছে বলে মনে করছেন কমিউনিটির অনেকে।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে বাংলাদেশ সোসাইটির নিজস্ব ভবন। নির্বাচনের আগে নিজস্ব ভবন নিয়ে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হলেও এখনো সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়নি। এ নিয়ে বর্তমান নেতৃত্বের সমালোচনা করছেন প্রতিপক্ষ ও কমিউনিটির একটি অংশ।
একই সঙ্গে সোসাইটির তহবিলের বর্তমান অবস্থা নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। সমালোচকদের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, সংগঠনের তহবিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বা প্রায় শূন্যের দিকে চলে গেছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণের জন্য সোসাইটির হালনাগাদ ব্যাংক হিসাব, আয়-ব্যয়ের বিবরণী এবং অডিট রিপোর্ট প্রকাশ হওয়া জরুরি। এখানেই এবারের নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে, সেলিম-আলী প্যানেলের সঙ্গে গত দুই বছর দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তারাই যখন এখন প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে গিয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির কথা বলছেন, তখন ভোটাররা কোন বক্তব্যকে কতটা গুরুত্ব দেবেন? বিশেষ করে কোষাধ্যক্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তির প্যানেল পরিবর্তন আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলমান আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ সংগঠনের আয়-ব্যয়, তহবিল ও আর্থিক অবস্থার সঙ্গে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত।
তবে বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলার পাশাপাশি সরে যাওয়া কর্মকর্তাদের কাছেও প্রশ্ন রয়েছে। গত দুই বছর তারা একই কমিটির অংশ ছিলেন। কোনো সিদ্ধান্ত বা আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপত্তি থাকলে তারা কখন, কোথায় এবং কীভাবে সেই আপত্তি তুলেছিলেন, এ প্রশ্নও এখন কমিউনিটিতে উঠছে।
অর্থাৎ এবারের নির্বাচনে শুধু বর্তমান নেতৃত্ব নয়, বিদ্রোহী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলে যোগ দেওয়া সাবেক সহকর্মীদেরও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।
অন্যদিকে সেলিম-আলী প্যানেলও নির্বাচনী মাঠ ছাড়ছে না। ছয় কর্মকর্তার সরে দাঁড়ানোর পর নতুন সমন্বয়ে তারা আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে এবারের লড়াই শুধু দুটি প্যানেলের মধ্যে ক্ষমতা দখলের লড়াই হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি গত দুই বছরের নেতৃত্বের কার্যক্রমের ওপর এক ধরনের গণরায়ে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশ সোসাইটির দীর্ঘ ইতিহাসে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, প্যানেল পরিবর্তন কিংবা নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব নতুন নয়। কিন্তু ২১টি পদের সবকটিতে জয়ী একটি কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ছয় সদস্যের পরবর্তী নির্বাচনেই আলাদা হয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী ঘটনা।
এখন ভোটারদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- গত নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কতটা পূরণ হয়েছে? নিজস্ব ভবনের উদ্যোগ কোথায় গিয়ে থেমেছে? সোসাইটির বর্তমান তহবিল কত? গত দুই বছরের পূর্ণাঙ্গ আয়-ব্যয়ের হিসাব কি সদস্যদের সামনে প্রকাশ করা হবে? অডিট রিপোর্ট কী বলছে? আর যে কর্মকর্তারা আজ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন, দায়িত্বে থাকার সময় তারা কী ভূমিকা পালন করেছিলেন?
কমিউনিটির অনেকেই মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচনের আগে উভয় পক্ষেরই এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দেওয়া উচিত।
কারণ আগামী ২৫ অক্টোবরের নির্বাচন শুধু কে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হবেন, সেই সিদ্ধান্ত নয়। এবারের ভোটে বিচার হবে ২১-০ ব্যবধানে ক্ষমতায় যাওয়া একটি নেতৃত্বের দুই বছরের কর্মকাণ্ডের, একই সঙ্গে পরীক্ষা হবে সেই নেতৃত্ব ছেড়ে বেরিয়ে আসা কর্মকর্তাদের অভিযোগ ও নতুন অঙ্গীকারেরও।
বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনী মাঠ তাই এবার শুরু থেকেই উত্তপ্ত। সামনে প্রচারণা যত এগোবে, ততই ভবন, তহবিল, হিসাব, প্রতিশ্রুতি এবং ছয় কর্মকর্তার প্যানেল ছাড়ার প্রকৃত কারণ নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আভাস মিলছে।