বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
♦ ব্রুকলিনে বাংলাদেশি কর্মীকে গুলি করে হত্যা ♦ দুই দিনে প্রাণ গেল দুই অভিবাসীর ♦ কুইন্সে ছুরিকাঘাতে আরেকজনের মৃত্যু

পরিসংখ্যানে অপরাধ কম, তবু নিউইয়র্কজুড়ে আতঙ্ক

পরিসংখ্যানে অপরাধ কম, তবু নিউইয়র্কজুড়ে আতঙ্ক

প্রতীকী ছবি অনাইন থেকে সংগৃহীত।

বিজ্ঞাপন
স্বপ্নের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন একটি নিরাপদ ও উন্নত ভবিষ্যতের আশায়। কেউ দাঁড়িয়েছিলেন গ্যাস স্টেশনের কাউন্টারে, কেউ রাতের শহরে খাবার পৌঁছে দিচ্ছিলেন, কেউ যাত্রী নামিয়ে আবার পরবর্তী ট্রিপের অপেক্ষায় ছিলেন, আবার কেউ রেস্তোরাঁয় নিজের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছিলেন। 
তাদের অপরাধ ছিল না। তারা শুধু কাজ করছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের কয়েক মাসের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গরাজ্যে সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত তিন বাংলাদেশি অভিবাসী। আরো অন্তত দুই বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন নিউইয়র্কে।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে- নিউইয়র্ক সিটিতে বড় ধরনের অপরাধ এবং বন্দুক সহিংসতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। অথচ মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ব্রুকলিন ও কুইন্সে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে কর্মস্থলে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁকর্মী মো. ইউসুফ আলী রাজুকে গুলি করে হত্যা এবং এর মাত্র দুই দিন আগে ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক ডেলিভারি কর্মীর গুলিতে মৃত্যুর ঘটনায় অভিবাসী কমিউনিটির মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে গত ২৩ আগস্ট রোববার মধ্যরাতের পর ব্রুকলিনের ব্রাউনসভিলে। ৮৪২ রকাওয়ে অ্যাভিনিউয়ে আমেরিকান বেস্ট উইংস অ্যান্ড পিৎজা রেস্তোরাঁয় বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন ৪৪ বছর বয়সি বাংলাদেশি কর্মী মো. ইউসুফ আলী রাজু। একই ঘটনায় ৩৯ বছর বয়সি আরেক বাংলাদেশি কর্মী রাসেল গুলিবিদ্ধ হন।
নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ বিভাগ জানায়, রাত ১২টার কিছু পর ‘অ্যাসাল্ট ইন প্রগ্রেস’-এর ৯১১ কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে রাজুকে মাথায় গুলিবিদ্ধ এবং রাসেলকে ডান পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। দুজনকেই জরুরি চিকিৎসার জন্য ওয়ান ব্রুকলিন হেলথ-ব্রুকডেল ইউভার্সিটি হসপিটাল মেডিকেল সেন্টার-এ নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা রাজুকে মৃত ঘোষণা করেন। রাসেলকে স্থিতিশীল অবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হয়।
রেস্তোরাঁর মালিকপক্ষ জানিয়েছে, নিহত ও আহত দুজনই ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছিলেন। রেস্তোরাঁর মালিক শেখ রাসেল সাংবাদিকদের জানান, তার জানা মতে হামলার আগে কর্মীদের সঙ্গে বন্দুকধারীর কোনো বাকবিতণ্ডাও হয়নি। তিনি বলেন, হামলাকারী হঠাৎ সেখানে আসে এবং গুলির ঘটনা ঘটে। নিহত রাজুকে অত্যন্ত সৎ ও বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবে বর্ণনা করে মালিকপক্ষ বলেছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিলেন।
তবে কী কারণে হামলা হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কয়েকটি বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় কমিউনিটি সূত্রের দাবি, এক ব্যক্তি খাবারের বিল পরিশোধ না করে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিবাদের সূত্রপাত হয়। ওই ব্যক্তি পরে অস্ত্র বের করে গুলি চালায় বলে তাদের দাবি। কিন্তু ঘণচউ এখন পর্যন্ত এই বক্তব্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। পুলিশ এবং মূলধারার মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী হামলার উদ্দেশ্য এখনো তদন্তাধীন।
ঘটনাস্থল থেকে রক্তাক্ত আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি রেস্তোরাঁ ও আশপাশের নজরদারি ক্যামেরার ভিডিও খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
তিন বছর আগে নিউইয়র্কে এসেছিলেন রাজু : নিহত ইউসুফ আলী রাজুর বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলায়। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে উন্নত জীবনের আশায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং গত প্রায় এক বছর ধরে ওই রেস্তোরাঁয় কাজ করছিলেন। দেশে তার প্রায় ৮০ বছর বয়সি বাবা, স্ত্রী এবং ১০ ও ৫ বছর বয়সি দুই কন্যাসন্তান রয়েছে।
প্রবাসী জীবনে পরিবার থেকে হাজার মাইল দূরে কঠোর পরিশ্রম করা রাজুর আকস্মিক মৃত্যু বাংলাদেশি কমিউনিটিতে গভীর শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও তৈরি করেছে। নিউইয়র্কের রেস্তোরাঁ, ডেলি, গ্যাস স্টেশন, কনভিনিয়েন্স স্টোর এবং ডেলিভারি ব্যবসায় বিপুল সংখ্যক দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী রাতের শিফটে কাজ করেন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই কর্মীদের নিরাপত্তার প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
রাজুর হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুই দিন আগে, ২১ আগস্ট শুক্রবার রাতে ব্রুকলিনের ইস্ট নিউইয়র্কে গুলিতে নিহত হন ২৭ বছর বয়সি গুরদীপ সিং।
পুলিশ জানায়, রাত প্রায় ১০টার দিকে ক্রিসেন্ট স্ট্রিট ও স্টেনলি অ্যাভিনিউ-এর কাছে দুই চালকের মধ্যে বিবাদের পর গুলির ঘটনা ঘটে। নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে সড়কে দুজনের মধ্যে হাতাহাতির পর গুলির ঝলক দেখা যায়। গুরদীপ সিং বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান এবং হামলাকারী গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যায়।
তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি। পুলিশ সম্ভাব্য রোড রেজ বা সড়ক বিবাদকে হত্যার কারণ হিসেবে তদন্ত করছে। এ ঘটনায়ও সর্বশেষ খবর পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
ঘটনাটি ঘটে নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ বিভাগের ৭৫তম প্রিসিঙ্কট এলাকায়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সেখানে চলতি বছর ইতোমধ্যে অন্তত ২৮টি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। একই এলাকায় এর কয়েক দিন আগে একটি রেস্তোরাঁর ভেতরে ১৭ বছর বয়সি এক কিশোরকেও গুলি করে হত্যা করা হয়।
কুইন্সেও ছুরিকাঘাতে মৃত্যু : একই সপ্তাহান্তে কুইন্সেও প্রাণঘাতী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। মেরিক বুলেভার্ড এলাকায় একটি লন্ড্রির সামনে ঝগড়াকে কেন্দ্র করে ৩৩ বছর বয়সি হোসে স্কটকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই নিউইয়র্কের বিভিন্ন বরোতে বন্দুক ও ছুরি হামলায় একাধিক প্রাণহানির ঘটনা নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অথচ পুলিশ বলছে-নিউইয়র্ক আগের চেয়ে নিরাপদ। 
সাম্প্রতিক কয়েকটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের চিত্রের বিপরীতে নিউইয়র্ক পুলিশের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা।
৩ আগস্ট নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নিউইয়র্ক সিটিতে সাতটি প্রধান অপরাধের সম্মিলিত সংখ্যা ২০২৫ সালের জুলাইয়ের তুলনায় ১২.৭ শতাংশ কমেছে। জুলাই ২০২৫-এ যেখানে ১১,৩৬৭টি গুরুতর অপরাধ রেকর্ড হয়েছিল, চলতি বছরের জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়ায় ৯,৯১৯টিতে।
শুধু সামগ্রিক অপরাধ নয়, জুলাইয়ে- হত্যা কমেছে ৩২.৩ শতাংশ, ৩১টি থেকে ২১টিতে; ডাকাতি কমেছে ১৪.৯ শতাংশ, ১,৪৫১টি থেকে ১,২৩৫টিতে;বার্গলারি কমেছে ১৪.৭ শতাংশ, ১,০৮৯টি থেকে ৯২৯টিতে; গ্র্যান্ড লার্সেনি কমেছে ১১.৮ শতাংশ; গাড়ি চুরি কমেছে ২৪.৬ শতাংশ; ফেলোনি অ্যাসাল্ট কমেছে ৬.৪ শতাংশ; গোলাগুলির ঘটনা কমেছে ২১.৩ শতাংশ, ৭৫টি থেকে ৫৯টিতে।
পুলিশ-এর দাবি, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে নিউইয়র্কে গোলাগুলির ঘটনা ও গুলিবিদ্ধ এবং হত্যা, তিনটিই রেকর্ড রাখার ইতিহাসে একই সময়ের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শহরে ৩৮১টি গোলাগুলির ঘটনা রেকর্ড হয়েছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪১২টি। একই সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ৪৬২ জন, আগের বছর ছিলেন ৪৮৯ জন। হত্যাকাণ্ড হয়েছে ১৪৯টি, যা গত বছরের একই সময়ের ১৯৩টির তুলনায় ২২.৮ শতাংশ কম।
পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ এই পরিসংখ্যানকে এনওয়াইপিডির-এর ‘ডাটা ড্রাইভেন প্রিসিশন পুলিশিং কৌশলের ফল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সব সূচক অবশ্য কমেনি : পরিসংখ্যানের ভেতরেও উদ্বেগের কিছু জায়গা রয়েছে। জুলাইয়ে সাবওয়ে বা ট্রানজিট সিস্টেমে বড় ক্রাইম আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১০.৯ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে পাবলিক হাউজিং -এ মেজর ক্রাইম বেড়েছে ৩.৫ শতাংশ। এছাড়া প্রথম সাত মাসে নিশ্চিত হেইট ক্রাইম বেড়েছে ৯.৪ শতাংশ, ২০২৫ সালের ৩২৯টি থেকে চলতি বছর ৩৬০টিতে। এর মধ্যে মুসলিম-বিরোধী নিশ্চিত হেইট ক্রাইম ১৬টি থেকে বেড়ে ২৬টিতে পৌঁছেছে, অর্থাৎ প্রায় ৬২.৫ শতাংশ বৃদ্ধি।

সংখ্যায় নিরাপদ শহর, অনুভূতিতে কেন ভয়?
এখানেই নিউইয়র্কের সাম্প্রতিক অপরাধ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। একদিকে সরকারি হিসাবে শহরে হত্যা এবং গুলির ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে। অন্যদিকে রাজুর মতো একজন অভিবাসী কর্মী নিজের কর্মস্থলের কাউন্টারের পেছনে গুলিতে মারা যাচ্ছেন; দুই দিন আগে আরেক অভিবাসী রাস্তায় একটি বিবাদের জেরে প্রাণ হারাচ্ছেন; একই সময়ে ছুরিকাঘাতেও ঘটছে মৃত্যু।
অপরাধের পরিসংখ্যান শহরের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে। কিন্তু একটি পরিবারের জন্য একটি হত্যাকাণ্ডই শতভাগ বিপর্যয়। আর যখন কাছাকাছি সময়ে একই ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটে, বিশেষ করে রাতের শিফটে কাজ করা অভিবাসীদের লক্ষ্য করে বা তাদের কর্মস্থলে, তখন সরকারি পরিসংখ্যানের উন্নতি মানুষের বাস্তব নিরাপত্তাবোধে সবসময় প্রতিফলিত হয় না। রাজুর হত্যাকাণ্ড সেই ব্যবধানটিই আরও স্পষ্ট করেছে।
নিউইয়র্কে হাজার হাজার বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ, ডেলি, গ্রোসারি, গ্যাস স্টেশন, রাইডশেয়ার ও ডেলিভারি পেশায় কাজ করেন। তাদের অনেককেই গভীর রাত পর্যন্ত নগদ অর্থ লেনদেন করতে হয় এবং তুলনামূলক নির্জন সময়ে কর্মস্থলে থাকতে হয়।
রাজুর মৃত্যুর পর তাই শুধু খুনিকে গ্রেপ্তারের দাবি নয়—রাতের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা, প্যানিক বাটন ও সার্ভেল্যান্স সিস্টেম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি এবং অভিবাসী ব্যবসায়ী ও কর্মীদের জন্য বিশেষ সেফটি আউটরিচ-এর দাবিও সামনে আসতে পারে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-ইউসুফ আলী রাজুর হত্যাকারী কে, কেন তাকে হত্যা করা হলো এবং কত দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনতে পারবে পুলিশ?
পরিসংখ্যানে নিউইয়র্ক হয়তো আরও নিরাপদ হচ্ছে। কিন্তু রাজুর পরিবার এবং আতঙ্কিত প্রবাসী কর্মীদের কাছে নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হবে, রাস্তায় ও কর্মস্থলে তারা সত্যিই কতটা নিরাপদ, এবং হত্যাকারীরা কত দ্রুত বিচারের মুখোমুখি হয়।
চলতি বছর আরো তিন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন : ফ্লোরিডায় গ্যাস স্টেশনে হামলায় নিহত হয়েছেন নিলুফা ইয়াসমিন, পেনসিলভ্যানিয়ায় খাবার সরবরাহ করতে গিয়ে গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন মোহাম্মদ মাহফুজুল হক এবং টেনেসি অঙ্গরাজ্যের বেলস শহরে সশস্ত্র ডাকাতির সময় গুলিতে নিহত হয়েছেন ৩৮ বছর বয়সী বাংলাদেশি মহসিন রানা। সর্বশেষ নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে রেস্টুরেন্টে বন্দুক হামলায় নিহত হয়েছেন রাজু। একই সময়ে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন।
এপ্রিলের শুরুতে ফ্লোরিডার ফোর্ট মায়ার্সে গ্যাস স্টেশনের বাইরে হামলার শিকার হন বাংলাদেশি নারী নিলুফা ইয়াসমিন। পুলিশ জানায়, তাকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়। তদন্তে সন্দেহভাজন ব্যক্তি হত্যার উদ্দেশ্যেই সেখানে গিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেছেন বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে উঠে আসে। দুই কন্যার মা নিলুফার মৃত্যু বাংলাদেশি কমিউনিটিতে গভীর শোক তৈরি করে।
এরপর ৭ জুলাই পেনসিলভ্যানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় প্রাণ হারান ৪৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ মাহফুজুল হক। তিনি খাবার সরবরাহের কাজ করতেন। কিংসেসিং এলাকায় গুলির খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে গাড়ির পাশে পড়ে থাকতে দেখে। তার মাথার পেছনে গুলি লাগে। গাড়ির ইঞ্জিন তখনও চালু ছিল। পাশে পড়ে ছিল খাবার সরবরাহের ব্যাগ।
পুলিশ জানায়, খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করা হয়েছিল। ঘটনাস্থল থেকে রাইফেলের গুলির খোসাও উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীরা প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে পরিকল্পিত বা লক্ষ্যভিত্তিক হামলা হিসেবে দেখছিলেন এবং তিনজন মুখোশধারী সন্দেহভাজনের কথা জানিয়েছিলেন। রাজশাহীর বাসিন্দা মাহফুজুল স্ত্রী ও ১৪ বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেন।
নিউইয়র্কেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২৪ জুলাই বাংলাদেশি যাত্রী পরিবহন চালক রুহুল আমিন নাসির ব্রুকলিনের ফোর্ট গ্রিন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন। যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার পর একটি গাড়ির সঙ্গে তার গাড়ির সামান্য সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে এক ব্যক্তি তার গাড়ির জানালার কাছে গিয়ে খুব কাছ থেকে মুখে গুলি করে পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর অস্ত্রোপচার করা হয়। বর্তমানে তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন বলে জানা গেছে।
টেনেসিতে বাংলাদেশি নিহত : টেনেসি অঙ্গরাজ্যের বেলস শহরে সশস্ত্র ডাকাতির সময় গুলিতে নিহত হয়েছেন ৩৮ বছর বয়সী বাংলাদেশি মহসিন রানা। রোববার ভোরে ৫০৫৪ হাইওয়ে ৪১২ সাউথে অবস্থিত এক্সন সাফারি কর্নার মার্কেটে এ ঘটনা ঘটে। হামলার পর পালিয়ে যাওয়া সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে ঘটনার তদন্ত এখনো চলছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ভোরে এক বন্দুকধারী দোকানে ঢুকে ডাকাতি শুরু করে। এ সময় দোকানের এক কর্মীকে গুলি করা হয়। পরে সন্দেহভাজন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
ভোর আনুমানিক সাড়ে ২টার দিকে এক ক্রেতা দোকানে ঢোকেন। তিনি মেঝেতে গুলিবিদ্ধ এক কর্মীকে পড়ে থাকতে দেখেন। সঙ্গে সঙ্গে জরুরি সহায়তার জন্য ৯১১ নম্বরে ফোন করেন।
খবর পেয়ে ক্রকেট কাউন্টি জরুরি সেবা, শেরিফের ডেপুটি ও তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। গুরুতর আহত মহসিনকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। টেনেসি ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
পরিবার ও পরিচিতজনদের সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাত বছর আগে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যান মহসিন রানা। তাঁর বাড়ি ঢাকার সাভারে। টেনেসির ওই গ্যাস স্টেশনের দোকানে কর্মরত ছিলেন তিনি।
মহসিনের পরিবার বাংলাদেশে। তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে। ছেলেদের বয়স ১২ ও ৫ বছর বলে জানা গেছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
ঘটনার পর বেলস পুলিশ, ক্রকেট কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়, টেনেসি ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, জ্যাকসন পুলিশ, ম্যাডিসন কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়, মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এবং কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থলে কাজ করেন।
তদন্তকারীরা ডাকাতির পুরো ঘটনা, হামলার ধরন এবং গুলি চালানোর কারণ খতিয়ে দেখছেন। ঘটনার পর কিছু সময়ের জন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রাখা হয়। তদন্তের স্বার্থে সাধারণ মানুষকে ওই এলাকা এড়িয়ে চলার অনুরোধ জানানো হয়।
মহসিন রানা নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর টেনেসিতে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে শোক নেমে এসেছে। স্বজন ও পরিচিতজনেরা তাঁর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz