প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ৪০০ মিলিয়ন ডলারের হোয়াইট হাউজ বলরুম প্রকল্পের নির্মাণকাজ আপাতত চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস।
২১ আগস্ট শুক্রবার দেওয়া এক অন্তর্বর্তী আদেশে তিনি নিম্ন আদালতের সেই সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে স্থগিত করেন, যার ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রকল্পটির মাটির ওপরের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি আবেদনের ওপর সুপ্রিম কোর্ট আরও বিস্তারিত সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত রবার্টসের এই আদেশ কার্যকর থাকবে। এক পাতার আদেশে সিদ্ধান্তের বিস্তারিত কারণ উল্লেখ করা হয়নি এবং পরবর্তী আদেশ কবে দেওয়া হবে, সে বিষয়েও কিছু জানানো হয়নি।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আসা জরুরি আপিলগুলো প্রধান বিচারপতি রবার্টসের এখতিয়ারভুক্ত হওয়ায় তিনি প্রাথমিকভাবে এ আদেশ দেন। তবে মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পুরো সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
ট্রাম্পের স্বস্তি
শুক্রবার সাউথ ক্যারোলাইনায় এক রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
তিনি বলেন, আদালত যখন কাজ চালিয়ে যেতে বলেছে, তখন সেটি অবশ্যই ইতিবাচক বিষয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেন, প্রকল্পটির কাজ নির্ধারিত সময়ের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে এবং বাজেটের মধ্যেই নির্মাণ চলছে।
প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা নিয়ে বড় প্রশ্ন
বলরুম প্রকল্পটিকে ঘিরে মামলাটি এখন শুধু একটি ভবন নির্মাণের বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই। হোয়াইট হাউস ও অন্যান্য ফেডারেল স্থাপনায় প্রেসিডেন্ট এককভাবে কতটা পরিবর্তন করতে পারেন—সেই সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্নও সামনে এসেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, প্রেসিডেন্টের সরকারি ভবন সংস্কার ও পরিবর্তনের ব্যাপারে ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। প্রশাসন আরও বলছে, বলরুম প্রকল্পের কিছু অংশ জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় দ্রুত কাজ শেষ করা জরুরি।
তবে প্রকল্পটি প্রথম ঘোষণা করার সময় জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আনেননি ট্রাম্প। সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত অনুদানের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় বহন করা হবে এবং তিনি নিজেও অর্থ দেবেন।
ইস্ট উইং ভাঙা নিয়ে আপত্তি
ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে কাজ করা ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর হিস্টোরিক প্রিজারভেশন প্রকল্পটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
সংস্থাটির বক্তব্য, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্টের হোয়াইট হাউসের ঐতিহাসিক অংশ ভেঙে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের একক ক্ষমতা নেই। বলরুম নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে হোয়াইট হাউজের ইস্ট উইং ভেঙে ফেলা হয়েছে।
সংস্থাটির আইনজীবীরা আদালতে অভিযোগ করেন, মামলা চলমান থাকা অবস্থায় দ্রুত নির্মাণ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে প্রশাসন কার্যত আদালতের সিদ্ধান্তকে অকার্যকর করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
রবার্টসের শুক্রবারের আদেশকে চূড়ান্ত জয় হিসেবে দেখছে না ন্যাশনাল ট্রাস্ট। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
৯০ হাজার বর্গফুটের বিশাল বলরুম
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন বলরুমটির আয়তন প্রায় ৯০ হাজার বর্গফুট বা প্রায় ৮ হাজার ৪০০ বর্গমিটার।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, প্রকল্পটির প্রায় ৬৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বিচার বিভাগের আদালতে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, নির্মাণকাজে প্রতিদিন প্রায় ২০ ঘণ্টা করে সপ্তাহের সাত দিনই শ্রমিকেরা কাজ করছেন।
এ পর্যন্ত প্রকল্পটির জন্য প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের ব্যক্তিগত অনুদান ব্যয় বা প্রতিশ্রুত হয়েছে।
নিম্ন আদালতে বাধার মুখে পড়েছিল প্রকল্প
গত এপ্রিলে ওয়াশিংটনের একটি ফেডারেল জেলা আদালত প্রকল্পটির মাটির ওপরের নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল। পরে সেই আদেশ সাময়িকভাবে স্থগিত হলেও একটি আপিল আদালতের প্যানেল আবারও নিম্ন আদালতের অবস্থান বহাল রাখে।
ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জজ রিচার্ড লিওন শুধু মাটির নিচে বাংকার ও সামরিক অবকাঠামোসংশ্লিষ্ট কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন।
পরবর্তী আপিলে তিন বিচারকের প্যানেলের দুই সদস্য মত দেন, এ ধরনের বড় প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়টি কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের আওতাভুক্ত এবং নির্বাহী বিভাগ একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
তবে ট্রাম্পের নিয়োগ দেওয়া তৃতীয় বিচারক মনে করেন, মামলাকারী সংস্থাটির আদালতে এ বিষয়ে মামলা করার প্রয়োজনীয় আইনগত অধিকার বা ‘স্ট্যান্ডিং’ নেই।
ট্রাম্প প্রশাসনও সুপ্রিম কোর্টে সেই যুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সলিসিটর জেনারেল ডি. জন সাওয়ার নিম্ন আদালতের নির্মাণ বন্ধের সিদ্ধান্তকে অস্বাভাবিক ও বেআইনি বলে উল্লেখ করেন এবং প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন করা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করেন।
এবার নজর পূর্ণাঙ্গ সুপ্রিম কোর্টের দিকে
প্রধান বিচারপতি রবার্টসের শুক্রবারের আদেশে ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত বড় ধরনের স্বস্তি পেলেও মামলার মূল প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
সুপ্রিম কোর্ট পরবর্তী ধাপে যদি দীর্ঘমেয়াদে নির্মাণ চালু রাখার অনুমতি দেয়, তাহলে মামলা চলাকালীনও দ্রুতগতিতে বলরুমের কাজ শেষ করার সুযোগ পাবে প্রশাসন।
অন্যদিকে আদালত যদি নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল করে, তাহলে প্রকল্পের মাটির ওপরের নির্মাণ আবারও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ফলে হোয়াইট হাউজের ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল ও বিতর্কিত সংস্কার প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
ঠিকানা/শই
নিউজটি শেয়ার করুন