Thikana News
১৯ মে ২০২৪
  1. ই-পেপার
  2. চলতি সংখ্যা
  3. বিশেষ সংখ্যা
  4. প্রধান সংবাদ
  5. আমেরিকার অন্দরে
  6. বিশ্বচরাচর
আমেরিকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

মা আমার কাছে এক দূরতম মধুর ডাক

মা আমার কাছে এক দূরতম মধুর ডাক
মা আমার কাছে কল্পনার এক ছায়ার নাম। আবছা ছায়া। মা যে একটি ডাকÑ এটুকুই বুঝি আমি। কিন্তু মাকে বুঝতে পারি না, ধরতেও পারি না। মা আমার স্পর্শে আসে না। অন্যের মুখে ঝাল খাওয়ার মতো। অন্যের মুখে আমার মায়ের গল্প শুনতে শুনতে মাকে যেটুকু চিনতে পারা। মূর্ত কোনো চেহারা নেই আমার। কোনো স্মৃতিও নেই। প্রতিবেশী মানুষদের মুখে মায়ের গল্প শুনতে শুনতে যেটুকু মাকে কাছে পাই, ধরতে পাই।
আমার মায়ের নাম সাকিনা বেগম। গ্রাম শালগড়িয়া। শহরের মধ্যেই। দক্ষিণে সদর থানা। উত্তরে সদর হাসপাতাল। থানা-জেলা সবই পাবনা। তার পশ্চিমপাড়ে ইছামতি নদী। এডওয়ার্ড কলেজ। এ রকম এক স্বচ্ছল পরিবারের, আনন্দমুখর পরিবেশকে ৭ সন্তান নিয়ে ছিল তার বসবাস। ৮ম সন্তান (কন্যা) জন্ম দিতে গিয়ে সেই সুখ-সংসার ঝড়-জলে ভেসে গেছে। ৮ম কন্যাসন্তানকে ২৯ দিনের রেখে আমাদের সবার কোনো আহাজারিকে পাত্তা না দিয়ে চলে গেলেন। তার স্মৃতি ধরে রাখার মতো আমার বয়স তখনও হয়নি। বয়স তখন আমার কেবলই চার। কোনো কিছুই স্মৃতিতে ধরে রাখার মতো বয়স হয়নি।
মা এখন আমার কাছে ভোরের স্বপ্নের মতো আধো আলো আধো ছায়া। ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো। আমার স্মৃতিতে কেবলই দোলনায়। ‘মা পৃথিবীর মধুরতম ডাক’, ‘মা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ’, ‘মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুরক্ষাদাত্রী।’ ‘মায়ের আঁচলের নিচটা সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।’ 
এসব শব্দ আমার কাছে অচেনা, সুদূরের ঢাকের মিষ্টি সুর। ‘খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো’, ‘আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা...’, সোহাগ সোহাগ আদরের এসব ঘুমপাড়ানি গান আমার জীবনে দূরের বাদ্যের মতো মিষ্টি মধুর সুর।
সব সন্তানের কপালেই জননীর আদর ভেজা চুম্বনের মধুর ছোঁয়া আছে। নিশ্চয় আমার কপালেও আছে। কিন্তু স্মৃতিতে নেই। আমার স্নেহময়ী মা কেমন ছিলেন- প্রতিবেশীদের মুখে শোনা গল্পের মতো। আমার কপালেও হয়তো অন্য আর সাতটা মায়ের মতো স্নেহ চুম্বনের স্পর্শ রয়েছে, যা আমার স্মৃতিতে নেই। তার আদরের সেই চুমুর পরশে খিলখিল হেসেছিও হয়তো। তবে সারাজীবন মায়ের আদর-স্নেহে মোড়ানো ‘ছোট বাবু’ হয়ে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়নি। মায়ের সব কিছুই আমার আদিগন্ত আদিগন্ত মরুভূমির অন্যপ্রান্তে আবছা আলোর রূপালী রেখা। দেখা যা, আবার যায় না। মাকে নিয়ে বিশ্বভুবনে কতো কথা, গান, কবিতা মাকে নিয়ে কত আকুতি, কত আহ্লাদ আমার জীবন সেদিক থেকে মা-বঞ্চিত এক হতভাগার জীবন। মা আমার জীবনে কেবল লোনাজলে ভরা এক সরোবর।
একমাত্র মা-ই পারেন সন্তানের জন্য হাসতে হাসতে নিজের জীবন দিয়ে দিতে। সব সংকটে একমাত্র মা-ই পারেন নিজের জীবনের বিনিময়ে সন্তানের জীবন সংকট মুক্ত করতে দেয়ার জন্য প্রার্থনা জানাতে। আমার মাও সন্তানের জীবনের বিনিময়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে গেছেন। আমাদের একটি বোন উপহার দিয়ে করে গেছেন মাতৃহারা। তখন আমার হাতেখড়ি হয়েছে কি. হয়নি। স্কুলে গেলেও হয়। না গেলেও কেউ কিছু বলেন না। শিক্ষকের দিকে থেকে তখনও মারধর খাওয়ায় দেখার পর্ব শুরু হয়নি। ওই বয়সে মা-হারা এক শিশুকে সবাই আদর করার ঝোঁকটাই বেশি। কে একজন যেন সেদিন স্কুলে গিয়ে মায়ের বাড়াবাড়ির কথা বলে আমাকে নিয়ে গেছেন বাড়িতে। কিছুক্ষণ পরেই আমি ঘুমিয়ে যাই। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। কিছুই যেন বুঝতে পারি না। ওরকম সবার কান্না শুনে আমারও কান্না পেয়ে যায়। আমিও কান্না শুরু করে দেই। আর বড়দের মুখের দিকে চেয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাই। এসব কথাই আমার মেঝ বোনের কাছ থেকে জানতে পারি। ঘর ভর্তি মানুষ। সবাই কান্নারত। ওই পরিবেশে শোক কী জিনিস না বুঝলেও, বেশ বুঝে নেই, মা নেই! 
তখন কোনো অবুঝ সন্তানের মায়ের মৃত্যু হলে তাকে সান্তনা দেয়া হতো এ রকম কথা বলে- ‘তোমার মাকে আল্লাহ নিয়ে গেছে।’ ‘তোমার মা আকাশের তারা হয়ে গেছে।’ শিশু মন আকাশভরা তারার মাঝে খুঁজে বেড়াতাম মাকে। এরপর প্রতিবেশী কতজনকে যে মা বলে ডেকেছি! মায়ের স্নেহ-মমতা ভালোবাসার জন্য আমার কাঙালপনার শেষ নেই। আকাশ যখন তারার ভরা থাকতো, আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, সবচেয়ে উজ্জ্বল যে তারাটি, সেই তারাটিই আমার মা হবে। শিশু মনের কত যে খেয়াল! প্রতিবেশী যে কারো মায়ের কোলে উঠলে তাকেই নিজের মা মনে করতাম। নইলে এমন করে কোলে নেবেন কেন? মায়েরাইতো এমন করে শুনেছি।
মায়েদের ঘুমপাড়ানি গান শুনতে শুনতে নাকি শিশুরা ঘুমিয়ে পড়ে। আমার সে সৌভাগ্য ছিল না। আমি জানালা দিয়ে আকাশের তারা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়তাম। ভেবে নিতাম সেই উজ্জ্বল তারাটিই আমাকে ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে ঘুমিয়ে দেয়। এরকম মাকে খুঁজতে খুঁজতেই আমি আরেকটা মাকে পেয়ে গেলাম। আয়েশা নামের একটি মেয়েকে আমার পিতা আমার মা হিসাবে দ্বিতীয়বার বিয়ে করে নিয়ে আসেন। মহল্লার অনেকে আমাদের ভাই-বোন যারা ছোট ছিল, তাদের জিজ্ঞেস করতেন ‘এই তোদের নতুন মা তোদের ভালোবাসে না? আদর করেন? আমি এসব কথার উত্তর জানতাম না। ভাবতাম এসব কথার মানে কি? মাতো ভালোবাসবে, আদর করবেই। আমার এই মাও আমাদের খুব ভালোবাসতেন। এমনকি নিজের সন্তান জন্মলাভের পরও। সৎমা, তাই মানুষের এত সংশয়। সৎমা যে প্রকৃতই সৎ হতে পারে, তা মায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় মনে করেছেন। শুধু মা নন, তার মা- আমার সৎ নানী, তিনিও আমাদের খুব ভালোবাসতেন। সত্যি কথা বলতে গেলে আমার নিজের নানীর     চেয়ে বেশিই ভালোবাসতেন। সৎ সন্তান বলে আমাদের ভেদ করতেন না। সংসারের যে কালিমা তা কখনও আমাদের স্পর্শ করেনি। এখন এ মাও নেই। কিন্তু আমরা সব ভাই-বোনেরা আগের মতই মিলেমিশে আছি। আমাদের কারো মুখে এখনও উচ্চারিত হয়নি ‘এরা আমাদের সৎ বোন, সৎ ভাই।’ আমরা ভাই-বোনেরা প্রকৃত বোন এবং ভাইয়ের মতোই আবদার-আচরণ করি। কোনো কুণ্ঠাবোধ করি না কোন কিছু আবদার করতে। তাই কোনোভাবেই আমার দ্বিতীয় মা’কে বাদ দিয়ে শুধু এক মাকে নিয়ে কথা বলতে এবং দ্বিতীয় মায়ের আদর ভালোবাসার কথাই মনে পড়ে। বরং দ্বিতীয় মায়ের ত্যাগ অনেক বেশি। সব মেয়েরই স্বপ্ন থাকে একলা করে নিজের একটা সংসার পেতে। সে সৌভাগ্য তার হয়নি। অনেকগুলো ছেলে-পুলে নিয়ে তিনি সংসার পেয়েছেন। কিন্তু এ নিয়ে তার মধ্যে কোনো হতাশা বা দুঃখবোধের চিহ্ন চোখে পড়েনি। হাসিমুখেই তাকে তার কর্তব্য সম্পাদন করতে দেখা গেছে। তাঁরা দু’জনের কেউই এখন নেই। প্রার্থনা করি তারা যেখানেই থাকুন, সুখে-শান্তিতে থাকুন। সেখান থেকেই তাদের স্নেহ-ভালোবাসা আমাদের মাথায় বর্ষিত হোক। বিশ্ব মা দিবস সফল হোক, স্বার্থক হোক। প্রার্থনা করি কেউ যেন মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত না হন।

কমেন্ট বক্স