বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের

​গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের

ছবি সংগৃহীত

বিজ্ঞাপন
গাজা থেকে ফিলিস্তিনি জনগণকে সরিয়ে দেওয়ার ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিরল এক প্রকাশ্য মতবিরোধে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, গাজার বাসিন্দাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ, বিতাড়ন বা অন্যত্র স্থানান্তরের কোনো পরিকল্পনাকে সমর্থন করে না তারা।

শুক্রবার বার্তাসংস্থা আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা ‘শান্তি পরিকল্পনা’র প্রতিশ্রুতিতেই যুক্তরাষ্ট্র অটল রয়েছে। ওই পরিকল্পনার ১২ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, গাজা থেকে কাউকে জোর করে চলে যেতে বাধ্য করা হবে না। যারা স্বেচ্ছায় চলে যেতে চান, তারা যেতে পারবেন এবং পরে ফিরে আসার অধিকারও থাকবে। একই সঙ্গে গাজার বাসিন্দাদের সেখানে থেকে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হবে এবং উন্নত গাজা পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হবে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আরও বলেছে, ‘গাজার জনগণকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত, বহিষ্কার বা বাধ্যতামূলকভাবে অন্যত্র স্থানান্তরের কোনো পরিকল্পনা বা প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে না।’

যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান এসেছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর। কাৎজ গাজার সংকটের একমাত্র ‘সমাধান’ হিসেবে অঞ্চলটির জনসংখ্যা কমানোর কথা বলেছেন। বুধবার তিনি দাবি করেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ‘অভিবাসন’ ছাড়া এই সংকটের প্রকৃত সমাধান সম্ভব নয়।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিকে ‘অভিবাসন’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। কাৎজ বলেন, ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে ‘সমুদ্রপথে, আকাশপথে এবং যেকোনো উপায়ে’ বের করে দেওয়ার জন্য ইসরায়েল প্রস্তুত। বিষয়টি এখনও নিয়মিত আলোচনায় রয়েছে বলেও জানান তিনি।

পরদিন একই ধরনের বক্তব্য দেন ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। তিনি বলেন, শান্তির ‘ভ্রম’ না করে এখন ফিলিস্তিনিদের ‘অভিবাসনের’ জন্য পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ফিলিস্তিনিদের টানেল খোঁড়ার বদলে ‘ব্যাগ গুছিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের এ ধরনের পরিকল্পনাকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং সম্ভাব্য জাতিগত নিধনের আশঙ্কার সঙ্গে তুলনা করেছে।

তবে কাৎজ দাবি করেছেন, ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান পুরোপুরি বাতিল হয়নি; বরং তিনি তা ‘স্থগিত’ রেখেছেন।

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার যে কোনো উদ্যোগ অবশ্য আরব দেশগুলো শুরু থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত কয়েকটি আরব দেশও নিজেদের ভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করেছে।

এদিকে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার বিষয়ে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা নিয়েও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। গত আগস্টে হামাসকে নিরস্ত্র করার বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজা থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং প্রায় প্রতিদিনের প্রাণঘাতী হামলা বন্ধ হওয়ার কথা ছিল।

তবে ইসরায়েল ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানায়, গাজা পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো ছাড় দেবে না।

গত বছরের অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েল ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় সম্মত হলেও এরপরও গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। সংকট সমাধানে গত মাসে ট্রাম্পের জামাতা ও মার্কিন দূত জ্যারেড কুশনার হামাসের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন।

তবে কুশনারের বক্তব্যে ইসরায়েলি অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বলেন, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা পুনর্গঠন শুরু হবে না। একই সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলেও ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে যুক্তরাষ্ট্র ‘সীমাবদ্ধ করবে না’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

হামাস অস্ত্র ত্যাগে সম্মত হওয়ার পরও ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি চলমান আলোচনা আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, গাজা থেকে কোনো মানুষের স্থানান্তর হলে তা অবশ্যই ‘সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক’ হতে হবে। একই সঙ্গে গাজার বাসিন্দাদের স্বার্থে অঞ্চলটির নিরস্ত্রীকরণ, স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনই যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য।

দপ্তরটি আরও জানিয়েছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনার ২০ নম্বর দফায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সহাবস্থানের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরির লক্ষ্যে সংলাপ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। ফলে ইসরায়েলি নীতির সঙ্গে ওয়াশিংটনের এই প্রকাশ্য মতপার্থক্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ওয়াশিংটনভিত্তিক আরব সেন্টারের প্যালেস্টাইন/ইসরায়েল কর্মসূচির প্রধান ইউসেফ মুনায়্যার বলেন, শান্তি প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো ইসরায়েলিদের একটি অংশ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে এই ভূখণ্ডে সহাবস্থান সম্ভব নয়।

তার মতে, গাজা ছাড়িয়ে পশ্চিম তীর এবং ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার চাপ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সহাবস্থানের পরিবর্তে তাদের সরিয়ে দেওয়াকেই কেউ কেউ সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখছেন।

ফলে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইসরায়েলি সরকারের অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য আপত্তি- দুই মিত্রের মধ্যে নীতিগত দূরত্বের একটি বিরল চিত্র সামনে এনেছে। একই সঙ্গে এই ইস্যু শান্তি ও যুদ্ধবিরতি আলোচনায় নতুন করে বড় বাধা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ঠিকানা/এএস 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz